Monday, 1 August 2016

পাহাড়ের কাছে গেলে প্রতি নিয়ত কেমন করে ঐশ্বর্যবান হয়ে উঠি ,হয়ে উঠি মহামহিম আর কেমন করে এই সাধারন ক'টি কথা বারবার লিখি বারবার লিখি আর ভাবি এই মুহূর্তে টান মেরে খুলে দেবো সব ছদ্মবেশ আর শেওলাপড়া মেঝে ,উই লাগা দেওয়াল ভেদ করে সবাইকে নিয়ে যাবো পাকদণ্ডী র বাঁকে কারণ মরে মরে ছক কষে বেঁচে থাকার সহজ বৃত্ত গুলি মূলত ফাঁসির দড়ি অথচ কেউ দেখতে পাচ্ছি না কেউ দেখতে পাচ্ছে না যে অদ্ভূত এক নীলচে ভোর অপেক্ষা করছে ,অপেক্ষা করছে শেওলাপড়া দেওয়ালের গায়ে হলুদ পুষ্প রাজি ,তারা কেমন পরাগ ছড়াচ্ছে রোদদূরে আর সব রক্ত পাতের কাহিনী মুছে দিচ্ছে, ধুয়ে দিচ্ছে অন্ধ চোখের গ্লানি, খিটিমিটি করা দম্পতি সহসা লাবণ্য পূর্ণ প্রাণ, একি অলৌকিক বিস্ময় সমস্ত গেরিলা যুদ্ধ থেমে যাচ্ছে, থেমে যাচ্ছে বন্দুকের শব্দ, পেলেটের খোঁচা আর মৃত্যু কে কেউ ভয় পাচ্ছে না,গভীর গিরিখাতের সামনে দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে ,হঠাৎই ঝুপঝুপে বরষণে ভিজে এই দেখো উড়িয়ে দিচ্ছি সব বিমর্ষতা আর অভিধান থেকে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে উড়িয়ে দিচ্ছি বিষন্নতা, এইসব শৌখিন বিষন্নতা ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিতে পারে দুমড়ানো বাড়ি,গাড়ি উলটালে কোথায় যাবে বলো কি করবে আতঙ্ক ধরে নিয়ে গেলে ভূমিকম্প হলে কোথায় পালাবে তার চেয়ে মন দিয়ে বাঁচো দেখো ঠান্ডা বাতাস এসে ভালবেসে গেল বলে গেল উৎকীর্ণ হতে আর ঝলমল করে বেঁচে নাও ঝরণা র হাত ধরে বলো কাব্য কথা গাদোয়ালে সাজো, সাজো বড় টিপে,শুচিবাই দিদিমণি বেঁচে নাও আপ্রাণ কি বা হবে গুঢ় মনস্তাপে আহত কৈশোর বাঁচো নবধারাজলে আহা পুত্র হারা মম্ কেনো পানীয়ের ঘ্রাণ খোঁজে দুধের বোতলে খোঁজে পাহাড়ের মগ্ন ধূপে অমৃত বারিধি, কিছু অনিশ্চিত বেঁচে থাকা কাজলে আতরে বাঁচো গাঢ় বন্দরে আর এইসব চিত্র মালা নিয়ে যাক অরণ্য অন্তরে
পাহাড়ের কাছে গেলে প্রতি নিয়ত কেমন করে ঐশ্বর্যবান হয়ে উঠি ,হয়ে উঠি মহামহিম আর কেমন করে এই সাধারন ক'টি কথা বারবার লিখি বারবার লিখি আর ভাবি এই মুহূর্তে টান মেরে খুলে দেবো সব ছদ্মবেশ আর শেওলাপড়া মেঝে ,উই লাগা দেওয়াল ভেদ করে সবাইকে নিয়ে যাবো পাকদণ্ডী র বাঁকে কারণ মরে মরে ছক কষে বেঁচে থাকার সহজ বৃত্ত গুলি মূলত ফাঁসির দড়ি অথচ কেউ দেখতে পাচ্ছি না কেউ দেখতে পাচ্ছে না যে অদ্ভূত এক নীলচে ভোর অপেক্ষা করছে ,অপেক্ষা করছে শেওলাপড়া দেওয়ালের গায়ে হলুদ পুষ্প রাজি ,তারা কেমন পরাগ ছড়াচ্ছে রোদদূরে আর সব রক্ত পাতের কাহিনী মুছে দিচ্ছে, ধুয়ে দিচ্ছে অন্ধ চোখের গ্লানি, খিটিমিটি করা দম্পতি সহসা লাবণ্য পূর্ণ প্রাণ, একি অলৌকিক বিস্ময় সমস্ত গেরিলা যুদ্ধ থেমে যাচ্ছে, থেমে যাচ্ছে বন্দুকের শব্দ, পেলেটের খোঁচা আর মৃত্যু কে কেউ ভয় পাচ্ছে না,গভীর গিরিখাতের সামনে দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে ,হঠাৎই ঝুপঝুপে বরষণে ভিজে এই দেখো উড়িয়ে দিচ্ছি সব বিমর্ষতা আর অভিধান থেকে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে উড়িয়ে দিচ্ছি বিষন্নতা, এইসব শৌখিন বিষন্নতা ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিতে পারে দুমড়ানো বাড়ি,গাড়ি উলটালে কোথায় যাবে বলো কি করবে আতঙ্ক ধরে নিয়ে গেলে ভূমিকম্প হলে কোথায় পালাবে তার চেয়ে মন দিয়ে বাঁচো দেখো ঠান্ডা বাতাস এসে ভালবেসে গেল বলে গেল উৎকীর্ণ হতে আর ঝলমল করে বেঁচে নাও ঝরণা র হাত ধরে বলো কাব্য কথা গাদোয়ালে সাজো, সাজো বড় টিপে,শুচিবাই দিদিমণি বেঁচে নাও আপ্রাণ কি বা হবে গুঢ় মনস্তাপে আহত কৈশোর বাঁচো নবধারাজলে আহা পুত্র হারা মম্ কেনো পানীয়ের ঘ্রাণ খোঁজে দুধের বোতলে খোঁজে পাহাড়ের মগ্ন ধূপে অমৃত বারিধি, কিছু অনিশ্চিত বেঁচে থাকা কাজলে আতরে বাঁচো গাঢ় বন্দরে আর এইসব চিত্র মালা নিয়ে যাক অরণ্য অন্তরে
চারদিকে এত হিংস্রতা।ভাল লাগছে না কিছু।তোমার হলুদ রঙ ভাল লাগে।আমার হলুদ রং না-পসন্দ ।আমার প্রিয় বেগুনী ।তাই তোমাকে আমি মারবো?আমার লুচি ছোলার ডাল পছন্দের খাবার,তোমার রুচি পিৎজাতে।তোমায় আমি গাল মন্দ করবো? লম্বা চুল আমার ভাল লাগে বলে তোমার ছোট চুল দেখে আমি টিটকিরি দেবো? তুমি আকাশকে পূজো করো।আমি পূজো করি জল।তাই তুমি আমাকে ছুরি মারবে?দেওয়াল তুলেও শান্তি নেই।মুখ দেখাদেখি বন্ধ ।তাতে কি? পুড়িয়ে না মারলে গায়ের জ্বালা মিটছে না।ধর্ষণ না করলে প্রশমিত হচ্ছে না বিকৃতকাম।লোভ।আরো লোভ।পছন্দের র মেয়েটি বুঝি চলে গেল অন্য কোথাও ।প্রতিযোগী ছেলেটির পেটে ঢুকিয়ে দাও ভাঙা বোতল।কুপিয়ে মারো সুখী শান্ত পরিবার।পেলেট গান ছোড়ো কচি কিশোরের চোখে। কেমন পাগল পাগল লাগে ।মেরে ফেলা এত সহজ!পার্টি মানেই নেশাগ্রস্ত হুল্লোড় আর বেয়াদপি।স্বাভাবিক বিনয় আর সৌজন্য হারিয়ে যাচ্ছে ।আমরাই কি খুব সহিষ্ণু সবসময়?প্রযুক্তির ডানায় ভর দিয়ে ভাবছি হাম কি হনু।আসলে প্রতি মুহুর্তে আরো বেশী অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি।আরো বেশী স্পর্ধিত ।আমার বাড়ি তোমার চেয়ে ভালো ।আমার দেশ তোমার দেশের চেয়ে ভালো ।এবং ভাষা এবং ধর্ম ।অসহিষ্ণু স্পর্ধা র অহংকারী ধ্বজাধারী রা হানাদার হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ।খুব ভয় হয়।অস্থির লাগে এত অশান্তি র মধ্যে গোটা জাতি নাকি পোকেমন গো খেলছে।খেলতে খেলতে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলছে।অনেক চেষ্টা করেও খেলাটার মাহাত্ম্য বুঝলাম না।জেনারেশন গ্যাপ বটে।কিন্তু পোকেমনের কথায় আমার একজনের কান্ড মনে পড়ল ।তাকে মনে করে এই বিশ্রী সময়ে একটু শান্তি পাই। সে হল মাকু।লীলা মজুমদারের মাকু।শুনলাম মাকু স্কুলের সিলেবাসে এসেছে।এ আনন্দের খবর রাখি কোথায়?মাকু পড়ে অনাবিল আনন্দে ভেসে গেছিলাম যখন,তখন আমি ক্লাস থ্রী ।পায়ে ব্যান্ডেজ ।খেলতে গিয়ে পা কেটে বিছানায়।জ্বর ।পরেরদিন পরীক্ষা ।এমতাবস্থায় বাবার প্রেসক্রিপশন চিকেন সুরুয়া আর লীলা মজুমদারের ছোটদের অমনিবাস।ছোট ছোট গপ্পো উপন্যাসে ঠাসা।রসে টইটুমবুর।মাকু ঐরকম একটা লেখা ।ছোট্ট দুই বোন সোনা আর টিয়া।মনের দুঃখে বাড়ি ছেড়ে চলল কালিয়ার বনে।কেন?না পিসির ছেলে বোমবা আসছে।এখন সব খাবার আর খেলনা তারই জন্য ।ইসস।কি দুঃখ।পথে দেখা ঘড়িয়ালার সঙগে।তার কলের পুতুল মাকু হারিয়ে গেছে।সে আবার কাঁদে হাসে।সোনা টিয়া কি কালিয়ার বনে মাকু কে খুঁজে দেবে?টিয়া আবার কথায় কথায় দামোদর নদ ।সে হোক।কালিয়ার বন কি যে সে বন?সেখানে কত প্রজাপতি আর খরগোশ।সবুজ পাতার ওপর রোদ ঝিকমিক করে।মাকড়সা জাল বোনে।এইখানে ওদের দেখা মাকুর সঙ্গে ।মাকু কি ভাল।ওদের কোলে করে নদী পার করে দিল পর্যন্ত! !!আর আছে হোটেলওয়ালা আর সার্কাস পার্টি র ছেলেপুলে।তাদের মালিক নিখোঁজ কিনা।তাই হোটেলওয়ালা তাদের মকশ করায়।ট্রাপিজের খেলা হয় বটগাছের ঝুড়িতে।আকাশ থেকে পরীরাণীকে নামায় জাদুকর।খেলাশেষে সবাই গাছের ডালে বসে হাতরুটি আর স্বর্গের সুরুয়া খায়।আমি এখনো কালিয়ার বনে যেতে চাই !!!!শেষে কিন্ত অনেক মজা।বাড়ির সককলে সোনা টিয়া কে খুঁজতে কালিয়ার বনে।পিসির ছেলে ওদের দেখে বলল দিদিয়া! !ব্যস! আর হিংসে নেই! হোটেলওয়ালা ই তো নোটোমাসটার !আর মাকু?সে তো ....আর বলব না।প্লীজ পড়ে নিও।রবিবার ঝলমলে হয়ে যাক!পৃথিবীর সব সোনা টিয়ারা ভালো থাকুক।মাকুরা যেন পোকেমন হয়ে না যায়।মাকুকে দখল করা যায় না।সে ভালোবাসা দিয়ে সবাইকে দখল করে।মানুষ ও তাই করুক না!
ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে কিছু হারিয়ে গেল গেল করাআমার স্বভাব বিরুদ্ধ কোনোরকম হাহাকার তেমন পোষায় না।বাবা বলতেন গেছে গেছে।বাঙাল ভাষায় গেসে গেসে।থোও।রাশি রাশি কলম হারানোর প্রেক্ষিতে এই উক্তি ।আসলে হারানোর গপপোটা কিছু বাকি থেকে গেছে।সেটি সেরে নিতে চাই । মেঘে ঢাকা তারা বা কোমল গান্ধার দেখার অনেক অনেক আগে,প্রায় জ্ঞান হতে হতেই ঠাকুমা,ছোট ঠাকুমা আর তাঁদের সমসাময়িকদের মধ্যে দেখেছি দেশ হারানোর বেদনা। সে যে কি হাহাকার তা অগুন্তি বাঙালি জানেন। অন্য দেশে এসে রিফিউজি হবার যন্ত্রণা ঢক করে গিলে ফেলা যায় না।সারাজীবন সেই শোকেতাপেই কাটিয়ে দিলেন, অন্য রকম করে কিছু ভাববার অবকাশ ই দিলেন না।এ নিয়ে অবশ্য ঘটিমহলে একটা চালু রসিকতা আছে .....বাঙালদের তো সবারই দেশে জমিদারি আসিল!! না।সকলের জমিদারি ছিল না বটে। কিন্তু ভাল করে খেয়ে পড়ে থাকার মত জমিজমা, বাগান পুকুর গাছটা ফল পাকুড়টা ছিল। বর্ষা কালে পদ্মা র ইজারা নেওয়া হত গল্প শুনেছি।যত ইলিশ ধরা পড়ত সব বাড়িতে আসত।বাড়িতে মুরগি উঠত না।বাবার জন্য আলাদা করে উঠোনে উনুন করে মুরগি রান্না হত।বড় ছেলের স্পেশাল খাতির।সেসব হারানো দিনের কথা বাবা আমাকে একটি হাতে লেখা বই আকারে দিয়ে গেছেন।চশমা হারাই,চাবি হারাই।চশমার খাপ আরো বেশী হারাই,পেন ড্রাইভ হারাতে হারাতে জেরবার,পছন্দের শান্তিনিকেতনী রুমালটিও সেমিনারে র দিন কেমন করে হারিয়ে ফেললাম।তবে বাবার লেখা বইটি কিন্ত হারাই নি।তাতে দেশ হারানো ঘর হারানো একটি কিশোরের সুখ দুঃখ আজও ধরা আছে।সে গ্রামের স্কুলে পড়ত, নদীতে সাঁতার কাটত, দস্যিপনা করে বেড়াতো আপনমনে।তার দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন এক লেঠেল।তাঁর নাম মইজুদদিন ভাই।তিনি তাকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন।তিনি সামাল দিতেন ঐ কিশোরের সব দৌরাত্ম্য ।মাঝরাতে নৌকো থেকে ধরে আনা হোক বা গাছের ডাল থেকে নামিয়ে আনা।এমনকি লুকিয়ে কচ্ছপের মাংস খাওয়ার সঙ্গী ও তিনি। দেশভাগের সময় যখন এপারে আসার ভয়ংকর দিন এল,সেই মইজুদদিন ভাই ওই কিশোরকে হাফ প্যান্ট ছাড়িয়ে লুঙ্গি পরিয়ে কুখ্যাত সকরিগলি ঘাট পার করে দিয়েছিলেন।সেই অসময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব সুখদুঃখের সত্যি ঘটনা জড়িয়ে আছে।তাই আমার সাদাত মানতো বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হয়নি।হারিয়ে যাওয়া ঢাকা লাহোর মুম্বই কলকাতা চোখের সামনে ছবির মতো।কর্কশ রক্তাক্ত নিষ্ঠুর দিন। তার মাঝেই লালিত সুকুমার মন।সেসব হারিয়ে গিয়েও ফিরে এল বুঝি!দেশভাগের অভিঘাত বড় সুদূরপ্রসারী।কোথায় কোন কোণে ওত পেতে বসে আছে গোপন প্রতিহিংসা কে জানে।তাদের উদ্দাম হিংসা এখন মহামারী র রূপ নিয়েছে । অস্থিরতার কথা থাক।স্থিরতা র কথা বলি।কৈশোরে হারিয়ে ছিলাম কলকাতাকে।বাবা বদলী হয়ে গেলেন কুচবিহার।অস্থির শহরকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল শান্ত এক দীঘিময় মফস্বলে ।তখন মফস্বলের একটা নিজস্বতা ছিল।এখনকার মতো হাফ টিকিট না।সে ছিল রাজার শহর।ছোট ছোট একতলা বাড়ি ।সামনে বাগান।গাছপালা জড়ানো।কলকাতা, স্কুল, বন্ধু, পাড়া ,গানের স্কুল সব হারিয়ে আমি তখন বেজায় মনভারি ।হায়রে ।এখন অমন জায়গাতে থাকতে পারলে কি ভালো ই না হোতো।রাজার শহরে তখন হাতে গোণা দোতলা বাড়ি ।বেশী র ভাগ বাড়িতে টিনের চালের নীচে ছাউনি দেওয়া । সামনে পেছনে বাগান দেখে বাবা তো আত্মহারা ।পেছনের বাগানে নিজে মাটি ফেলে কপি ,কুমড়ো,টমেটো চাষ শুরু হল।টিনের চালের ওপর বৃষ্টি র শব্দ এখনো কানে আছে।হারায় নি।বারান্দা টি প্রশস্ত ।তাতে বাবা নিজে হাতে বাঁশের জাফরি বানিয়েছিলেন।চমৎকার লাগতো দেখতে।জাগরিত লতানো গাছ।খুব মায়াবী লাগতো টেবিল আলোতে।কিন্তু বারান্দা তে ব্যাং আসে।তাকে ধরতে আসে সাপ।মা আর আমি ভয়ে অস্থির ।ওখানকার লোক হাসে।দূর!ও তো হেলে সাপ।কাটে না।বাচ্চা রা হেলে সাপের লেজ ধরে ছুঁড়ে ফেলে।চেনা পৃথিবী এইভাবে পালটায়।নতুন স্কুল ।নতুন বন্ধু ।একেবারে আলাদা পরিবেশ।মানিয়ে নিতে সময় লাগে।বেশি গজগজ করলে মা বকুনি দেন।এখানেই ভাল রেজাল্ট করে দেখাও না!ফেলে আসা আজনমের শহর ,ফেলে আসা বেড়াল হাতছানি দেয়।তাকে অনেক চেষ্টা করেও আনা যায়নি।গাড়ি থেকে লাফ দিয়েছিল।পরে কত কেঁদে ফিরেছে ভেবে গলার কাছে ব্যথা করত। কিন্তু বাড়ির পিছনে মস্ত দীঘি ।তারপাশে একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ি।সেখানে এক মা থাকেন তার দুই মেয়ে নিয়ে ।ছোটজন রাতুল আমার বন্ধু । ওদের ছোট কাঠের বাড়ি দেখে আমি মুগ্ধ ।বারান্দা য় সারি সারি অর্কিড ঝুলছে।বসার ঘরে বেতের সোফা ঘেঁষে ও অর্কিড ।বারান্দা তে দাঁড়িয়ে একটু পা বাড়ালে দিঘীর জল হাত বুলিয়ে যায়।ঠিক যেন রূপকথা।তারা হারিয়ে যায়।নতুন বন্ধুরা তদদিনে প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে।তাদের সঙ্গে প্রাণের আড্ডা মাঝে অনেকদিন হারিয়ে গেছিল।ফেবু র কল্যাণে ফেরত এসেছে।ফেরত এসেছে আমার হারিয়ে যাওয়া কলকাতা আর পুরনো বন্ধু দের অপার ভালবাসা।হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ এই ফেবু তেই সম্ভব ।এত ফিরে পেয়ে ভাবি এই ঐশ্বর্য রাখব কোথায়?যা গেছে তা স্রোতে মিশে গেছে।যা আছে তা কম কি?ইটানগর বেড়াতে গিয়ে হারিয়েছিলাম খুব সুন্দর একটি flask. এত সুন্দর ছবি সচরাচর থাকে না।আঠারো ঘন্টা ভ্রমণ করে গাড়ি তে ফেলে এলাম ।মন খারাপ?না না! থাকলো না হয় আমার একটি ছোট জিনিস আমার দেশের এক কোণে কোন অচেনা বাড়িতে ।ঐ ভাবে ভাবলেই কিছু হারায় না।
ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে কিছু হারিয়ে গেল গেল করাআমার স্বভাব বিরুদ্ধ কোনোরকম হাহাকার তেমন পোষায় না।বাবা বলতেন গেছে গেছে।বাঙাল ভাষায় গেসে গেসে।থোও।রাশি রাশি কলম হারানোর প্রেক্ষিতে এই উক্তি ।আসলে হারানোর গপপোটা কিছু বাকি থেকে গেছে।সেটি সেরে নিতে চাই । মেঘে ঢাকা তারা বা কোমল গান্ধার দেখার অনেক অনেক আগে,প্রায় জ্ঞান হতে হতেই ঠাকুমা,ছোট ঠাকুমা আর তাঁদের সমসাময়িকদের মধ্যে দেখেছি দেশ হারানোর বেদনা। সে যে কি হাহাকার তা অগুন্তি বাঙালি জানেন। অন্য দেশে এসে রিফিউজি হবার যন্ত্রণা ঢক করে গিলে ফেলা যায় না।সারাজীবন সেই শোকেতাপেই কাটিয়ে দিলেন, অন্য রকম করে কিছু ভাববার অবকাশ ই দিলেন না।এ নিয়ে অবশ্য ঘটিমহলে একটা চালু রসিকতা আছে .....বাঙালদের তো সবারই দেশে জমিদারি আসিল!! না।সকলের জমিদারি ছিল না বটে। কিন্তু ভাল করে খেয়ে পড়ে থাকার মত জমিজমা, বাগান পুকুর গাছটা ফল পাকুড়টা ছিল। বর্ষা কালে পদ্মা র ইজারা নেওয়া হত গল্প শুনেছি।যত ইলিশ ধরা পড়ত সব বাড়িতে আসত।বাড়িতে মুরগি উঠত না।বাবার জন্য আলাদা করে উঠোনে উনুন করে মুরগি রান্না হত।বড় ছেলের স্পেশাল খাতির।সেসব হারানো দিনের কথা বাবা আমাকে একটি হাতে লেখা বই আকারে দিয়ে গেছেন।চশমা হারাই,চাবি হারাই।চশমার খাপ আরো বেশী হারাই,পেন ড্রাইভ হারাতে হারাতে জেরবার,পছন্দের শান্তিনিকেতনী রুমালটিও সেমিনারে র দিন কেমন করে হারিয়ে ফেললাম।তবে বাবার লেখা বইটি কিন্ত হারাই নি।তাতে দেশ হারানো ঘর হারানো একটি কিশোরের সুখ দুঃখ আজও ধরা আছে।সে গ্রামের স্কুলে পড়ত, নদীতে সাঁতার কাটত, দস্যিপনা করে বেড়াতো আপনমনে।তার দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন এক লেঠেল।তাঁর নাম মইজুদদিন ভাই।তিনি তাকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন।তিনি সামাল দিতেন ঐ কিশোরের সব দৌরাত্ম্য ।মাঝরাতে নৌকো থেকে ধরে আনা হোক বা গাছের ডাল থেকে নামিয়ে আনা।এমনকি লুকিয়ে কচ্ছপের মাংস খাওয়ার সঙ্গী ও তিনি। দেশভাগের সময় যখন এপারে আসার ভয়ংকর দিন এল,সেই মইজুদদিন ভাই ওই কিশোরকে হাফ প্যান্ট ছাড়িয়ে লুঙ্গি পরিয়ে কুখ্যাত সকরিগলি ঘাট পার করে দিয়েছিলেন।সেই অসময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব সুখদুঃখের সত্যি ঘটনা জড়িয়ে আছে।তাই আমার সাদাত মানতো বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হয়নি।হারিয়ে যাওয়া ঢাকা লাহোর মুম্বই কলকাতা চোখের সামনে ছবির মতো।কর্কশ রক্তাক্ত নিষ্ঠুর দিন। তার মাঝেই লালিত সুকুমার মন।সেসব হারিয়ে গিয়েও ফিরে এল বুঝি!দেশভাগের অভিঘাত বড় সুদূরপ্রসারী।কোথায় কোন কোণে ওত পেতে বসে আছে গোপন প্রতিহিংসা কে জানে।তাদের উদ্দাম হিংসা এখন মহামারী র রূপ নিয়েছে । অস্থিরতার কথা থাক।স্থিরতা র কথা বলি।কৈশোরে হারিয়ে ছিলাম কলকাতাকে।বাবা বদলী হয়ে গেলেন কুচবিহার।অস্থির শহরকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল শান্ত এক দীঘিময় মফস্বলে ।তখন মফস্বলের একটা নিজস্বতা ছিল।এখনকার মতো হাফ টিকিট না।সে ছিল রাজার শহর।ছোট ছোট একতলা বাড়ি ।সামনে বাগান।গাছপালা জড়ানো।কলকাতা, স্কুল, বন্ধু, পাড়া ,গানের স্কুল সব হারিয়ে আমি তখন বেজায় মনভারি ।হায়রে ।এখন অমন জায়গাতে থাকতে পারলে কি ভালো ই না হোতো।রাজার শহরে তখন হাতে গোণা দোতলা বাড়ি ।বেশী র ভাগ বাড়িতে টিনের চালের নীচে ছাউনি দেওয়া । সামনে পেছনে বাগান দেখে বাবা তো আত্মহারা ।পেছনের বাগানে নিজে মাটি ফেলে কপি ,কুমড়ো,টমেটো চাষ শুরু হল।টিনের চালের ওপর বৃষ্টি র শব্দ এখনো কানে আছে।হারায় নি।বারান্দা টি প্রশস্ত ।তাতে বাবা নিজে হাতে বাঁশের জাফরি বানিয়েছিলেন।চমৎকার লাগতো দেখতে।জাগরিত লতানো গাছ।খুব মায়াবী লাগতো টেবিল আলোতে।কিন্তু বারান্দা তে ব্যাং আসে।তাকে ধরতে আসে সাপ।মা আর আমি ভয়ে অস্থির ।ওখানকার লোক হাসে।দূর!ও তো হেলে সাপ।কাটে না।বাচ্চা রা হেলে সাপের লেজ ধরে ছুঁড়ে ফেলে।চেনা পৃথিবী এইভাবে পালটায়।নতুন স্কুল ।নতুন বন্ধু ।একেবারে আলাদা পরিবেশ।মানিয়ে নিতে সময় লাগে।বেশি গজগজ করলে মা বকুনি দেন।এখানেই ভাল রেজাল্ট করে দেখাও না!ফেলে আসা আজনমের শহর ,ফেলে আসা বেড়াল হাতছানি দেয়।তাকে অনেক চেষ্টা করেও আনা যায়নি।গাড়ি থেকে লাফ দিয়েছিল।পরে কত কেঁদে ফিরেছে ভেবে গলার কাছে ব্যথা করত। কিন্তু বাড়ির পিছনে মস্ত দীঘি ।তারপাশে একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ি।সেখানে এক মা থাকেন তার দুই মেয়ে নিয়ে ।ছোটজন রাতুল আমার বন্ধু । ওদের ছোট কাঠের বাড়ি দেখে আমি মুগ্ধ ।বারান্দা য় সারি সারি অর্কিড ঝুলছে।বসার ঘরে বেতের সোফা ঘেঁষে ও অর্কিড ।বারান্দা তে দাঁড়িয়ে একটু পা বাড়ালে দিঘীর জল হাত বুলিয়ে যায়।ঠিক যেন রূপকথা।তারা হারিয়ে যায়।নতুন বন্ধুরা তদদিনে প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে।তাদের সঙ্গে প্রাণের আড্ডা মাঝে অনেকদিন হারিয়ে গেছিল।ফেবু র কল্যাণে ফেরত এসেছে।ফেরত এসেছে আমার হারিয়ে যাওয়া কলকাতা আর পুরনো বন্ধু দের অপার ভালবাসা।হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ এই ফেবু তেই সম্ভব ।এত ফিরে পেয়ে ভাবি এই ঐশ্বর্য রাখব কোথায়?যা গেছে তা স্রোতে মিশে গেছে।যা আছে তা কম কি?ইটানগর বেড়াতে গিয়ে হারিয়েছিলাম খুব সুন্দর একটি flask. এত সুন্দর ছবি সচরাচর থাকে না।আঠারো ঘন্টা ভ্রমণ করে গাড়ি তে ফেলে এলাম ।মন খারাপ?না না! থাকলো না হয় আমার একটি ছোট জিনিস আমার দেশের এক কোণে কোন অচেনা বাড়িতে ।ঐ ভাবে ভাবলেই কিছু হারায় না।
ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে কিছু হারিয়ে গেল গেল করাআমার স্বভাব বিরুদ্ধ কোনোরকম হাহাকার তেমন পোষায় না।বাবা বলতেন গেছে গেছে।বাঙাল ভাষায় গেসে গেসে।থোও।রাশি রাশি কলম হারানোর প্রেক্ষিতে এই উক্তি ।আসলে হারানোর গপপোটা কিছু বাকি থেকে গেছে।সেটি সেরে নিতে চাই । মেঘে ঢাকা তারা বা কোমল গান্ধার দেখার অনেক অনেক আগে,প্রায় জ্ঞান হতে হতেই ঠাকুমা,ছোট ঠাকুমা আর তাঁদের সমসাময়িকদের মধ্যে দেখেছি দেশ হারানোর বেদনা। সে যে কি হাহাকার তা অগুন্তি বাঙালি জানেন। অন্য দেশে এসে রিফিউজি হবার যন্ত্রণা ঢক করে গিলে ফেলা যায় না।সারাজীবন সেই শোকেতাপেই কাটিয়ে দিলেন, অন্য রকম করে কিছু ভাববার অবকাশ ই দিলেন না।এ নিয়ে অবশ্য ঘটিমহলে একটা চালু রসিকতা আছে .....বাঙালদের তো সবারই দেশে জমিদারি আসিল!! না।সকলের জমিদারি ছিল না বটে। কিন্তু ভাল করে খেয়ে পড়ে থাকার মত জমিজমা, বাগান পুকুর গাছটা ফল পাকুড়টা ছিল। বর্ষা কালে পদ্মা র ইজারা নেওয়া হত গল্প শুনেছি।যত ইলিশ ধরা পড়ত সব বাড়িতে আসত।বাড়িতে মুরগি উঠত না।বাবার জন্য আলাদা করে উঠোনে উনুন করে মুরগি রান্না হত।বড় ছেলের স্পেশাল খাতির।সেসব হারানো দিনের কথা বাবা আমাকে একটি হাতে লেখা বই আকারে দিয়ে গেছেন।চশমা হারাই,চাবি হারাই।চশমার খাপ আরো বেশী হারাই,পেন ড্রাইভ হারাতে হারাতে জেরবার,পছন্দের শান্তিনিকেতনী রুমালটিও সেমিনারে র দিন কেমন করে হারিয়ে ফেললাম।তবে বাবার লেখা বইটি কিন্ত হারাই নি।তাতে দেশ হারানো ঘর হারানো একটি কিশোরের সুখ দুঃখ আজও ধরা আছে।সে গ্রামের স্কুলে পড়ত, নদীতে সাঁতার কাটত, দস্যিপনা করে বেড়াতো আপনমনে।তার দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন এক লেঠেল।তাঁর নাম মইজুদদিন ভাই।তিনি তাকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন।তিনি সামাল দিতেন ঐ কিশোরের সব দৌরাত্ম্য ।মাঝরাতে নৌকো থেকে ধরে আনা হোক বা গাছের ডাল থেকে নামিয়ে আনা।এমনকি লুকিয়ে কচ্ছপের মাংস খাওয়ার সঙ্গী ও তিনি। দেশভাগের সময় যখন এপারে আসার ভয়ংকর দিন এল,সেই মইজুদদিন ভাই ওই কিশোরকে হাফ প্যান্ট ছাড়িয়ে লুঙ্গি পরিয়ে কুখ্যাত সকরিগলি ঘাট পার করে দিয়েছিলেন।সেই অসময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব সুখদুঃখের সত্যি ঘটনা জড়িয়ে আছে।তাই আমার সাদাত মানতো বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হয়নি।হারিয়ে যাওয়া ঢাকা লাহোর মুম্বই কলকাতা চোখের সামনে ছবির মতো।কর্কশ রক্তাক্ত নিষ্ঠুর দিন। তার মাঝেই লালিত সুকুমার মন।সেসব হারিয়ে গিয়েও ফিরে এল বুঝি!দেশভাগের অভিঘাত বড় সুদূরপ্রসারী।কোথায় কোন কোণে ওত পেতে বসে আছে গোপন প্রতিহিংসা কে জানে।তাদের উদ্দাম হিংসা এখন মহামারী র রূপ নিয়েছে । অস্থিরতার কথা থাক।স্থিরতা র কথা বলি।কৈশোরে হারিয়ে ছিলাম কলকাতাকে।বাবা বদলী হয়ে গেলেন কুচবিহার।অস্থির শহরকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল শান্ত এক দীঘিময় মফস্বলে ।তখন মফস্বলের একটা নিজস্বতা ছিল।এখনকার মতো হাফ টিকিট না।সে ছিল রাজার শহর।ছোট ছোট একতলা বাড়ি ।সামনে বাগান।গাছপালা জড়ানো।কলকাতা, স্কুল, বন্ধু, পাড়া ,গানের স্কুল সব হারিয়ে আমি তখন বেজায় মনভারি ।হায়রে ।এখন অমন জায়গাতে থাকতে পারলে কি ভালো ই না হোতো।রাজার শহরে তখন হাতে গোণা দোতলা বাড়ি ।বেশী র ভাগ বাড়িতে টিনের চালের নীচে ছাউনি দেওয়া । সামনে পেছনে বাগান দেখে বাবা তো আত্মহারা ।পেছনের বাগানে নিজে মাটি ফেলে কপি ,কুমড়ো,টমেটো চাষ শুরু হল।টিনের চালের ওপর বৃষ্টি র শব্দ এখনো কানে আছে।হারায় নি।বারান্দা টি প্রশস্ত ।তাতে বাবা নিজে হাতে বাঁশের জাফরি বানিয়েছিলেন।চমৎকার লাগতো দেখতে।জাগরিত লতানো গাছ।খুব মায়াবী লাগতো টেবিল আলোতে।কিন্তু বারান্দা তে ব্যাং আসে।তাকে ধরতে আসে সাপ।মা আর আমি ভয়ে অস্থির ।ওখানকার লোক হাসে।দূর!ও তো হেলে সাপ।কাটে না।বাচ্চা রা হেলে সাপের লেজ ধরে ছুঁড়ে ফেলে।চেনা পৃথিবী এইভাবে পালটায়।নতুন স্কুল ।নতুন বন্ধু ।একেবারে আলাদা পরিবেশ।মানিয়ে নিতে সময় লাগে।বেশি গজগজ করলে মা বকুনি দেন।এখানেই ভাল রেজাল্ট করে দেখাও না!ফেলে আসা আজনমের শহর ,ফেলে আসা বেড়াল হাতছানি দেয়।তাকে অনেক চেষ্টা করেও আনা যায়নি।গাড়ি থেকে লাফ দিয়েছিল।পরে কত কেঁদে ফিরেছে ভেবে গলার কাছে ব্যথা করত। কিন্তু বাড়ির পিছনে মস্ত দীঘি ।তারপাশে একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ি।সেখানে এক মা থাকেন তার দুই মেয়ে নিয়ে ।ছোটজন রাতুল আমার বন্ধু । ওদের ছোট কাঠের বাড়ি দেখে আমি মুগ্ধ ।বারান্দা য় সারি সারি অর্কিড ঝুলছে।বসার ঘরে বেতের সোফা ঘেঁষে ও অর্কিড ।বারান্দা তে দাঁড়িয়ে একটু পা বাড়ালে দিঘীর জল হাত বুলিয়ে যায়।ঠিক যেন রূপকথা।তারা হারিয়ে যায়।নতুন বন্ধুরা তদদিনে প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে।তাদের সঙ্গে প্রাণের আড্ডা মাঝে অনেকদিন হারিয়ে গেছিল।ফেবু র কল্যাণে ফেরত এসেছে।ফেরত এসেছে আমার হারিয়ে যাওয়া কলকাতা আর পুরনো বন্ধু দের অপার ভালবাসা।হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ এই ফেবু তেই সম্ভব ।এত ফিরে পেয়ে ভাবি এই ঐশ্বর্য রাখব কোথায়?যা গেছে তা স্রোতে মিশে গেছে।যা আছে তা কম কি?ইটানগর বেড়াতে গিয়ে হারিয়েছিলাম খুব সুন্দর একটি flask. এত সুন্দর ছবি সচরাচর থাকে না।আঠারো ঘন্টা ভ্রমণ করে গাড়ি তে ফেলে এলাম ।মন খারাপ?না না! থাকলো না হয় আমার একটি ছোট জিনিস আমার দেশের এক কোণে কোন অচেনা বাড়িতে ।ঐ ভাবে ভাবলেই কিছু হারায় না।

Thursday, 21 July 2016

ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে কিছু হারিয়ে গেল গেল করাআমার স্বভাব বিরুদ্ধ কোনোরকম হাহাকার তেমন পোষায় না।বাবা বলতেন গেছে গেছে।বাঙাল ভাষায় গেসে গেসে।থোও।রাশি রাশি কলম হারানোর প্রেক্ষিতে এই উক্তি ।আসলে হারানোর গপপোটা কিছু বাকি থেকে গেছে।সেটি সেরে নিতে চাই । মেঘে ঢাকা তারা বা কোমল গান্ধার দেখার অনেক অনেক আগে,প্রায় জ্ঞান হতে হতেই ঠাকুমা,ছোট ঠাকুমা আর তাঁদের সমসাময়িকদের মধ্যে দেখেছি দেশ হারানোর বেদনা। সে যে কি হাহাকার তা অগুন্তি বাঙালি জানেন। অন্য দেশে এসে রিফিউজি হবার যন্ত্রণা ঢক করে গিলে ফেলা যায় না।সারাজীবন সেই শোকেতাপেই কাটিয়ে দিলেন, অন্য রকম করে কিছু ভাববার অবকাশ ই দিলেন না।এ নিয়ে অবশ্য ঘটিমহলে একটা চালু রসিকতা আছে .....বাঙালদের তো সবারই দেশে জমিদারি আসিল!! না।সকলের জমিদারি ছিল না বটে। কিন্তু ভাল করে খেয়ে পড়ে থাকার মত জমিজমা, বাগান পুকুর গাছটা ফল পাকুড়টা ছিল। বর্ষা কালে পদ্মা র ইজারা নেওয়া হত গল্প শুনেছি।যত ইলিশ ধরা পড়ত সব বাড়িতে আসত।বাড়িতে মুরগি উঠত না।বাবার জন্য আলাদা করে উঠোনে উনুন করে মুরগি রান্না হত।বড় ছেলের স্পেশাল খাতির।সেসব হারানো দিনের কথা বাবা আমাকে একটি হাতে লেখা বই আকারে দিয়ে গেছেন।চশমা হারাই,চাবি হারাই।চশমার খাপ আরো বেশী হারাই,পেন ড্রাইভ হারাতে হারাতে জেরবার,পছন্দের শান্তিনিকেতনী রুমালটিও সেমিনারে র দিন কেমন করে হারিয়ে ফেললাম।তবে বাবার লেখা বইটি কিন্ত হারাই নি।তাতে দেশ হারানো ঘর হারানো একটি কিশোরের সুখ দুঃখ আজও ধরা আছে।সে গ্রামের স্কুলে পড়ত, নদীতে সাঁতার কাটত, দস্যিপনা করে বেড়াতো আপনমনে।তার দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন এক লেঠেল।তাঁর নাম মইজুদদিন ভাই।তিনি তাকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন।তিনি সামাল দিতেন ঐ কিশোরের সব দৌরাত্ম্য ।মাঝরাতে নৌকো থেকে ধরে আনা হোক বা গাছের ডাল থেকে নামিয়ে আনা।এমনকি লুকিয়ে কচ্ছপের মাংস খাওয়ার সঙ্গী ও তিনি। দেশভাগের সময় যখন এপারে আসার ভয়ংকর দিন এল,সেই মইজুদদিন ভাই ওই কিশোরকে হাফ প্যান্ট ছাড়িয়ে লুঙ্গি পরিয়ে কুখ্যাত সকরিগলি ঘাট পার করে দিয়েছিলেন।সেই অসময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব সুখদুঃখের সত্যি ঘটনা জড়িয়ে আছে।তাই আমার সাদাত মানতো বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হয়নি।হারিয়ে যাওয়া ঢাকা লাহোর মুম্বই কলকাতা চোখের সামনে ছবির মতো।কর্কশ রক্তাক্ত নিষ্ঠুর দিন। তার মাঝেই লালিত সুকুমার মন।সেসব হারিয়ে গিয়েও ফিরে এল বুঝি!দেশভাগের অভিঘাত বড় সুদূরপ্রসারী।কোথায় কোন কোণে ওত পেতে বসে আছে গোপন প্রতিহিংসা কে জানে।তাদের উদ্দাম হিংসা এখন মহামারী র রূপ নিয়েছে । অস্থিরতার কথা থাক।স্থিরতা র কথা বলি।কৈশোরে হারিয়ে ছিলাম কলকাতাকে।বাবা বদলী হয়ে গেলেন কুচবিহার।অস্থির শহরকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল শান্ত এক দীঘিময় মফস্বলে ।তখন মফস্বলের একটা নিজস্বতা ছিল।এখনকার মতো হাফ টিকিট না।সে ছিল রাজার শহর।ছোট ছোট একতলা বাড়ি ।সামনে বাগান।গাছপালা জড়ানো।কলকাতা, স্কুল, বন্ধু, পাড়া ,গানের স্কুল সব হারিয়ে আমি তখন বেজায় মনভারি ।হায়রে ।এখন অমন জায়গাতে থাকতে পারলে কি ভালো ই না হোতো।রাজার শহরে তখন হাতে গোণা দোতলা বাড়ি ।বেশী র ভাগ বাড়িতে টিনের চালের নীচে ছাউনি দেওয়া । সামনে পেছনে বাগান দেখে বাবা তো আত্মহারা ।পেছনের বাগানে নিজে মাটি ফেলে কপি ,কুমড়ো,টমেটো চাষ শুরু হল।টিনের চালের ওপর বৃষ্টি র শব্দ এখনো কানে আছে।হারায় নি।বারান্দা টি প্রশস্ত ।তাতে বাবা নিজে হাতে বাঁশের জাফরি বানিয়েছিলেন।চমৎকার লাগতো দেখতে।জাগরিত লতানো গাছ।খুব মায়াবী লাগতো টেবিল আলোতে।কিন্তু বারান্দা তে ব্যাং আসে।তাকে ধরতে আসে সাপ।মা আর আমি ভয়ে অস্থির ।ওখানকার লোক হাসে।দূর!ও তো হেলে সাপ।কাটে না।বাচ্চা রা হেলে সাপের লেজ ধরে ছুঁড়ে ফেলে।চেনা পৃথিবী এইভাবে পালটায়।নতুন স্কুল ।নতুন বন্ধু ।একেবারে আলাদা পরিবেশ।মানিয়ে নিতে সময় লাগে।বেশি গজগজ করলে মা বকুনি দেন।এখানেই ভাল রেজাল্ট করে দেখাও না!ফেলে আসা আজনমের শহর ,ফেলে আসা বেড়াল হাতছানি দেয়।তাকে অনেক চেষ্টা করেও আনা যায়নি।গাড়ি থেকে লাফ দিয়েছিল।পরে কত কেঁদে ফিরেছে ভেবে গলার কাছে ব্যথা করত। কিন্তু বাড়ির পিছনে মস্ত দীঘি ।তারপাশে একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ি।সেখানে এক মা থাকেন তার দুই মেয়ে নিয়ে ।ছোটজন রাতুল আমার বন্ধু । ওদের ছোট কাঠের বাড়ি দেখে আমি মুগ্ধ ।বারান্দা য় সারি সারি অর্কিড ঝুলছে।বসার ঘরে বেতের সোফা ঘেঁষে ও অর্কিড ।বারান্দা তে দাঁড়িয়ে একটু পা বাড়ালে দিঘীর জল হাত বুলিয়ে যায়।ঠিক যেন রূপকথা।তারা হারিয়ে যায়।নতুন বন্ধুরা তদদিনে প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে।তাদের সঙ্গে প্রাণের আড্ডা মাঝে অনেকদিন হারিয়ে গেছিল।ফেবু র কল্যাণে ফেরত এসেছে।ফেরত এসেছে আমার হারিয়ে যাওয়া কলকাতা আর পুরনো বন্ধু দের অপার ভালবাসা।হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ এই ফেবু তেই সম্ভব ।এত ফিরে পেয়ে ভাবি এই ঐশ্বর্য রাখব কোথায়?যা গেছে তা স্রোতে মিশে গেছে।যা আছে তা কম কি?ইটানগর বেড়াতে গিয়ে হারিয়েছিলাম খুব সুন্দর একটি flask. এত সুন্দর ছবি সচরাচর থাকে না।আঠারো ঘন্টা ভ্রমণ করে গাড়ি তে ফেলে এলাম ।মন খারাপ?না না! থাকলো না হয় আমার একটি ছোট জিনিস আমার দেশের এক কোণে কোন অচেনা বাড়িতে ।ঐ ভাবে ভাবলেই কিছু হারায় না।
ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে কিছু হারিয়ে গেল গেল করাআমার স্বভাব বিরুদ্ধ কোনোরকম হাহাকার তেমন পোষায় না।বাবা বলতেন গেছে গেছে।বাঙাল ভাষায় গেসে গেসে।থোও।রাশি রাশি কলম হারানোর প্রেক্ষিতে এই উক্তি ।আসলে হারানোর গপপোটা কিছু বাকি থেকে গেছে।সেটি সেরে নিতে চাই । মেঘে ঢাকা তারা বা কোমল গান্ধার দেখার অনেক অনেক আগে,প্রায় জ্ঞান হতে হতেই ঠাকুমা,ছোট ঠাকুমা আর তাঁদের সমসাময়িকদের মধ্যে দেখেছি দেশ হারানোর বেদনা। সে যে কি হাহাকার তা অগুন্তি বাঙালি জানেন। অন্য দেশে এসে রিফিউজি হবার যন্ত্রণা ঢক করে গিলে ফেলা যায় না।সারাজীবন সেই শোকেতাপেই কাটিয়ে দিলেন, অন্য রকম করে কিছু ভাববার অবকাশ ই দিলেন না।এ নিয়ে অবশ্য ঘটিমহলে একটা চালু রসিকতা আছে .....বাঙালদের তো সবারই দেশে জমিদারি আসিল!! না।সকলের জমিদারি ছিল না বটে। কিন্তু ভাল করে খেয়ে পড়ে থাকার মত জমিজমা, বাগান পুকুর গাছটা ফল পাকুড়টা ছিল। বর্ষা কালে পদ্মা র ইজারা নেওয়া হত গল্প শুনেছি।যত ইলিশ ধরা পড়ত সব বাড়িতে আসত।বাড়িতে মুরগি উঠত না।বাবার জন্য আলাদা করে উঠোনে উনুন করে মুরগি রান্না হত।বড় ছেলের স্পেশাল খাতির।সেসব হারানো দিনের কথা বাবা আমাকে একটি হাতে লেখা বই আকারে দিয়ে গেছেন।চশমা হারাই,চাবি হারাই।চশমার খাপ আরো বেশী হারাই,পেন ড্রাইভ হারাতে হারাতে জেরবার,পছন্দের শান্তিনিকেতনী রুমালটিও সেমিনারে র দিন কেমন করে হারিয়ে ফেললাম।তবে বাবার লেখা বইটি কিন্ত হারাই নি।তাতে দেশ হারানো ঘর হারানো একটি কিশোরের সুখ দুঃখ আজও ধরা আছে।সে গ্রামের স্কুলে পড়ত, নদীতে সাঁতার কাটত, দস্যিপনা করে বেড়াতো আপনমনে।তার দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন এক লেঠেল।তাঁর নাম মইজুদদিন ভাই।তিনি তাকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন।তিনি সামাল দিতেন ঐ কিশোরের সব দৌরাত্ম্য ।মাঝরাতে নৌকো থেকে ধরে আনা হোক বা গাছের ডাল থেকে নামিয়ে আনা।এমনকি লুকিয়ে কচ্ছপের মাংস খাওয়ার সঙ্গী ও তিনি। দেশভাগের সময় যখন এপারে আসার ভয়ংকর দিন এল,সেই মইজুদদিন ভাই ওই কিশোরকে হাফ প্যান্ট ছাড়িয়ে লুঙ্গি পরিয়ে কুখ্যাত সকরিগলি ঘাট পার করে দিয়েছিলেন।সেই অসময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব সুখদুঃখের সত্যি ঘটনা জড়িয়ে আছে।তাই আমার সাদাত মানতো বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হয়নি।হারিয়ে যাওয়া ঢাকা লাহোর মুম্বই কলকাতা চোখের সামনে ছবির মতো।কর্কশ রক্তাক্ত নিষ্ঠুর দিন। তার মাঝেই লালিত সুকুমার মন।সেসব হারিয়ে গিয়েও ফিরে এল বুঝি!দেশভাগের অভিঘাত বড় সুদূরপ্রসারী।কোথায় কোন কোণে ওত পেতে বসে আছে গোপন প্রতিহিংসা কে জানে।তাদের উদ্দাম হিংসা এখন মহামারী র রূপ নিয়েছে । অস্থিরতার কথা থাক।স্থিরতা র কথা বলি।কৈশোরে হারিয়ে ছিলাম কলকাতাকে।বাবা বদলী হয়ে গেলেন কুচবিহার।অস্থির শহরকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল শান্ত এক দীঘিময় মফস্বলে ।তখন মফস্বলের একটা নিজস্বতা ছিল।এখনকার মতো হাফ টিকিট না।সে ছিল রাজার শহর।ছোট ছোট একতলা বাড়ি ।সামনে বাগান।গাছপালা জড়ানো।কলকাতা, স্কুল, বন্ধু, পাড়া ,গানের স্কুল সব হারিয়ে আমি তখন বেজায় মনভারি ।হায়রে ।এখন অমন জায়গাতে থাকতে পারলে কি ভালো ই না হোতো।রাজার শহরে তখন হাতে গোণা দোতলা বাড়ি ।বেশী র ভাগ বাড়িতে টিনের চালের নীচে ছাউনি দেওয়া । সামনে পেছনে বাগান দেখে বাবা তো আত্মহারা ।পেছনের বাগানে নিজে মাটি ফেলে কপি ,কুমড়ো,টমেটো চাষ শুরু হল।টিনের চালের ওপর বৃষ্টি র শব্দ এখনো কানে আছে।হারায় নি।বারান্দা টি প্রশস্ত ।তাতে বাবা নিজে হাতে বাঁশের জাফরি বানিয়েছিলেন।চমৎকার লাগতো দেখতে।জাগরিত লতানো গাছ।খুব মায়াবী লাগতো টেবিল আলোতে।কিন্তু বারান্দা তে ব্যাং আসে।তাকে ধরতে আসে সাপ।মা আর আমি ভয়ে অস্থির ।ওখানকার লোক হাসে।দূর!ও তো হেলে সাপ।কাটে না।বাচ্চা রা হেলে সাপের লেজ ধরে ছুঁড়ে ফেলে।চেনা পৃথিবী এইভাবে পালটায়।নতুন স্কুল ।নতুন বন্ধু ।একেবারে আলাদা পরিবেশ।মানিয়ে নিতে সময় লাগে।বেশি গজগজ করলে মা বকুনি দেন।এখানেই ভাল রেজাল্ট করে দেখাও না!ফেলে আসা আজনমের শহর ,ফেলে আসা বেড়াল হাতছানি দেয়।তাকে অনেক চেষ্টা করেও আনা যায়নি।গাড়ি থেকে লাফ দিয়েছিল।পরে কত কেঁদে ফিরেছে ভেবে গলার কাছে ব্যথা করত। কিন্তু বাড়ির পিছনে মস্ত দীঘি ।তারপাশে একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ি।সেখানে এক মা থাকেন তার দুই মেয়ে নিয়ে ।ছোটজন রাতুল আমার বন্ধু । ওদের ছোট কাঠের বাড়ি দেখে আমি মুগ্ধ ।বারান্দা য় সারি সারি অর্কিড ঝুলছে।বসার ঘরে বেতের সোফা ঘেঁষে ও অর্কিড ।বারান্দা তে দাঁড়িয়ে একটু পা বাড়ালে দিঘীর জল হাত বুলিয়ে যায়।ঠিক যেন রূপকথা।তারা হারিয়ে যায়।নতুন বন্ধুরা তদদিনে প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে।তাদের সঙ্গে প্রাণের আড্ডা মাঝে অনেকদিন হারিয়ে গেছিল।ফেবু র কল্যাণে ফেরত এসেছে।ফেরত এসেছে আমার হারিয়ে যাওয়া কলকাতা আর পুরনো বন্ধু দের অপার ভালবাসা।হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ এই ফেবু তেই সম্ভব ।এত ফিরে পেয়ে ভাবি এই ঐশ্বর্য রাখব কোথায়?যা গেছে তা স্রোতে মিশে গেছে।যা আছে তা কম কি?ইটানগর বেড়াতে গিয়ে হারিয়েছিলাম খুব সুন্দর একটি flask. এত সুন্দর ছবি সচরাচর থাকে না।আঠারো ঘন্টা ভ্রমণ করে গাড়ি তে ফেলে এলাম ।মন খারাপ?না না! থাকলো না হয় আমার একটি ছোট জিনিস আমার দেশের এক কোণে কোন অচেনা বাড়িতে ।ঐ ভাবে ভাবলেই কিছু হারায় না।
ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে কিছু হারিয়ে গেল গেল করাআমার স্বভাব বিরুদ্ধ কোনোরকম হাহাকার তেমন পোষায় না।বাবা বলতেন গেছে গেছে।বাঙাল ভাষায় গেসে গেসে।থোও।রাশি রাশি কলম হারানোর প্রেক্ষিতে এই উক্তি ।আসলে হারানোর গপপোটা কিছু বাকি থেকে গেছে।সেটি সেরে নিতে চাই । মেঘে ঢাকা তারা বা কোমল গান্ধার দেখার অনেক অনেক আগে,প্রায় জ্ঞান হতে হতেই ঠাকুমা,ছোট ঠাকুমা আর তাঁদের সমসাময়িকদের মধ্যে দেখেছি দেশ হারানোর বেদনা। সে যে কি হাহাকার তা অগুন্তি বাঙালি জানেন। অন্য দেশে এসে রিফিউজি হবার যন্ত্রণা ঢক করে গিলে ফেলা যায় না।সারাজীবন সেই শোকেতাপেই কাটিয়ে দিলেন, অন্য রকম করে কিছু ভাববার অবকাশ ই দিলেন না।এ নিয়ে অবশ্য ঘটিমহলে একটা চালু রসিকতা আছে .....বাঙালদের তো সবারই দেশে জমিদারি আসিল!! না।সকলের জমিদারি ছিল না বটে। কিন্তু ভাল করে খেয়ে পড়ে থাকার মত জমিজমা, বাগান পুকুর গাছটা ফল পাকুড়টা ছিল। বর্ষা কালে পদ্মা র ইজারা নেওয়া হত গল্প শুনেছি।যত ইলিশ ধরা পড়ত সব বাড়িতে আসত।বাড়িতে মুরগি উঠত না।বাবার জন্য আলাদা করে উঠোনে উনুন করে মুরগি রান্না হত।বড় ছেলের স্পেশাল খাতির।সেসব হারানো দিনের কথা বাবা আমাকে একটি হাতে লেখা বই আকারে দিয়ে গেছেন।চশমা হারাই,চাবি হারাই।চশমার খাপ আরো বেশী হারাই,পেন ড্রাইভ হারাতে হারাতে জেরবার,পছন্দের শান্তিনিকেতনী রুমালটিও সেমিনারে র দিন কেমন করে হারিয়ে ফেললাম।তবে বাবার লেখা বইটি কিন্ত হারাই নি।তাতে দেশ হারানো ঘর হারানো একটি কিশোরের সুখ দুঃখ আজও ধরা আছে।সে গ্রামের স্কুলে পড়ত, নদীতে সাঁতার কাটত, দস্যিপনা করে বেড়াতো আপনমনে।তার দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন এক লেঠেল।তাঁর নাম মইজুদদিন ভাই।তিনি তাকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন।তিনি সামাল দিতেন ঐ কিশোরের সব দৌরাত্ম্য ।মাঝরাতে নৌকো থেকে ধরে আনা হোক বা গাছের ডাল থেকে নামিয়ে আনা।এমনকি লুকিয়ে কচ্ছপের মাংস খাওয়ার সঙ্গী ও তিনি। দেশভাগের সময় যখন এপারে আসার ভয়ংকর দিন এল,সেই মইজুদদিন ভাই ওই কিশোরকে হাফ প্যান্ট ছাড়িয়ে লুঙ্গি পরিয়ে কুখ্যাত সকরিগলি ঘাট পার করে দিয়েছিলেন।সেই অসময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব সুখদুঃখের সত্যি ঘটনা জড়িয়ে আছে।তাই আমার সাদাত মানতো বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হয়নি।হারিয়ে যাওয়া ঢাকা লাহোর মুম্বই কলকাতা চোখের সামনে ছবির মতো।কর্কশ রক্তাক্ত নিষ্ঠুর দিন। তার মাঝেই লালিত সুকুমার মন।সেসব হারিয়ে গিয়েও ফিরে এল বুঝি!দেশভাগের অভিঘাত বড় সুদূরপ্রসারী।কোথায় কোন কোণে ওত পেতে বসে আছে গোপন প্রতিহিংসা কে জানে।তাদের উদ্দাম হিংসা এখন মহামারী র রূপ নিয়েছে । অস্থিরতার কথা থাক।স্থিরতা র কথা বলি।কৈশোরে হারিয়ে ছিলাম কলকাতাকে।বাবা বদলী হয়ে গেলেন কুচবিহার।অস্থির শহরকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল শান্ত এক দীঘিময় মফস্বলে ।তখন মফস্বলের একটা নিজস্বতা ছিল।এখনকার মতো হাফ টিকিট না।সে ছিল রাজার শহর।ছোট ছোট একতলা বাড়ি ।সামনে বাগান।গাছপালা জড়ানো।কলকাতা, স্কুল, বন্ধু, পাড়া ,গানের স্কুল সব হারিয়ে আমি তখন বেজায় মনভারি ।হায়রে ।এখন অমন জায়গাতে থাকতে পারলে কি ভালো ই না হোতো।রাজার শহরে তখন হাতে গোণা দোতলা বাড়ি ।বেশী র ভাগ বাড়িতে টিনের চালের নীচে ছাউনি দেওয়া । সামনে পেছনে বাগান দেখে বাবা তো আত্মহারা ।পেছনের বাগানে নিজে মাটি ফেলে কপি ,কুমড়ো,টমেটো চাষ শুরু হল।টিনের চালের ওপর বৃষ্টি র শব্দ এখনো কানে আছে।হারায় নি।বারান্দা টি প্রশস্ত ।তাতে বাবা নিজে হাতে বাঁশের জাফরি বানিয়েছিলেন।চমৎকার লাগতো দেখতে।জাগরিত লতানো গাছ।খুব মায়াবী লাগতো টেবিল আলোতে।কিন্তু বারান্দা তে ব্যাং আসে।তাকে ধরতে আসে সাপ।মা আর আমি ভয়ে অস্থির ।ওখানকার লোক হাসে।দূর!ও তো হেলে সাপ।কাটে না।বাচ্চা রা হেলে সাপের লেজ ধরে ছুঁড়ে ফেলে।চেনা পৃথিবী এইভাবে পালটায়।নতুন স্কুল ।নতুন বন্ধু ।একেবারে আলাদা পরিবেশ।মানিয়ে নিতে সময় লাগে।বেশি গজগজ করলে মা বকুনি দেন।এখানেই ভাল রেজাল্ট করে দেখাও না!ফেলে আসা আজনমের শহর ,ফেলে আসা বেড়াল হাতছানি দেয়।তাকে অনেক চেষ্টা করেও আনা যায়নি।গাড়ি থেকে লাফ দিয়েছিল।পরে কত কেঁদে ফিরেছে ভেবে গলার কাছে ব্যথা করত। কিন্তু বাড়ির পিছনে মস্ত দীঘি ।তারপাশে একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ি।সেখানে এক মা থাকেন তার দুই মেয়ে নিয়ে ।ছোটজন রাতুল আমার বন্ধু । ওদের ছোট কাঠের বাড়ি দেখে আমি মুগ্ধ ।বারান্দা য় সারি সারি অর্কিড ঝুলছে।বসার ঘরে বেতের সোফা ঘেঁষে ও অর্কিড ।বারান্দা তে দাঁড়িয়ে একটু পা বাড়ালে দিঘীর জল হাত বুলিয়ে যায়।ঠিক যেন রূপকথা।তারা হারিয়ে যায়।নতুন বন্ধুরা তদদিনে প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে।তাদের সঙ্গে প্রাণের আড্ডা মাঝে অনেকদিন হারিয়ে গেছিল।ফেবু র কল্যাণে ফেরত এসেছে।ফেরত এসেছে আমার হারিয়ে যাওয়া কলকাতা আর পুরনো বন্ধু দের অপার ভালবাসা।হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ এই ফেবু তেই সম্ভব ।এত ফিরে পেয়ে ভাবি এই ঐশ্বর্য রাখব কোথায়?যা গেছে তা স্রোতে মিশে গেছে।যা আছে তা কম কি?ইটানগর বেড়াতে গিয়ে হারিয়েছিলাম খুব সুন্দর একটি flask. এত সুন্দর ছবি সচরাচর থাকে না।আঠারো ঘন্টা ভ্রমণ করে গাড়ি তে ফেলে এলাম ।মন খারাপ?না না! থাকলো না হয় আমার একটি ছোট জিনিস আমার দেশের এক কোণে কোন অচেনা বাড়িতে ।ঐ ভাবে ভাবলেই কিছু হারায় না।

যা হারিয়ে যায়
জীবনের দৌলতে জানতে পারছি মানুষ বড়ো অভিমানী হয়ে যাচ্ছে ।একা একা বোধ করছে আর কষ্ট পাচ্ছে ।বোধহয় কিছু হারিয়ে ফেলছে বলে ভয় পেয়ে ঠোঁট ফোলাচছে প্রতি নিয়ত ।কত ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দুঃখ পেয়ে পোষ্ট দিচ্ছে হারানো বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে।আহা।তারা হোয়াট স আপ খুলে দেখেন হারানো বন্ধু কিছু লিখলো কিনা।না পেয়ে মন ভারী করে ফেবু তে বিরহের বা বিদ্বেষের রাগী পোষ্ট জারি করেন।সে সব জ্বালাময় লিখন স্রোতের মত ফেবুতে ভাসে।কেউ  মনে রাখে না।হারিয়ে যাবার খেলা না বুঝতে পারলে জীবনে বিস্তর দুঃখু ।
এই তো যেমন পুরনো আজন্ম  চেনা পাড়াতে ঢুকতে গিয়ে চমকে গেলাম।গড়িয়াহাটের বাম হাতি গলিতে পাও চেন চীনে রেঁসতরা কে বাঁয়ে রেখে সোজা তাকালে দেখতাম একটা  মস্ত  লম্বা বাড়ি।সাদা।তার দুদিক থেকে  উঠে গেছে লম্বা ক্রিপার।ওপরে গিয়ে চূড়া বেঁধেছে।ও বাড়ি দেখে ছোটবেলা তে জেঠুর বাড়ির রাস্তা চিনতাম ।তার ডাইনে গেলে আচার্য সুনীতি কুমারের বাড়ি সুধর্মা যা কিনা   বেশ কয়েকটি বছর ধরে  fab India হয়েছে।লম্বা অভিজাত চেহারার সাদা বাড়িটা যার জানলা দরজা খোলা দেখিনি কখোনো ইদানিং একটি  take away food joint এর সাইন বোর্ড ঝুলিয়েছিল বটে।সেকি তার আভিজাত্য হারাচছিল না অর্থ কৌলীন্য? নিশ্চয়ই দরকার পড়েছে।তাই ভেঙে পড়েছে বাড়ি।কাটা পড়েছে নীচ থেকে উঠে যাওয়া দুধারে দুটি লতানো গাছ।হারিয়ে গেল আমার ছোটবেলার  পথচেনার স্মারক গৃহটি।  অবশ্য এখন পথচেনার জন্য আমার তাকে দরকার হত না।অভ্যস্ত চোখে তাকাতাম।সেই তাকানোর মধ্যে  একটু মেদুরতা থাকতো।হারিয়ে গেল।আবার এই চেহারা চেনা হয়ে  যাবে কিছুদিনে।কিন্তু পুরোনো বাড়িটি বুকের মধ্যে ডানা ঝাপটাবে চিরকাল।
দক্ষিণাপণে ঢুকে দেখি ওমা।উঠে গেছে একদম সামনে গানের আর ছায়াছবি র সিডির চেনা দোকানখানা।কত সিডি কিনেছি সেখান থেকে! ক্লান্ত শরীরে এসে গানের কাছে আশ্রয় খুঁজেছি।পাশ্চাত্য ধ্রুপদী বাজনার ভাল সংগ্রহ ছিল ওঁদের।হারিয়ে গেল।দেখলাম সেখানে বাচ্চা দের পোষাকের দোকান হয়েছে।ওই গানের স্টলের কর্মচারীরা গেলেন কোথা?যেন নতুন কাজকর্মে ভাল থাকেন।
এই হারানো আর খুঁজে পাওয়া র খেলা তে কত পুরোনো বন্ধু দের ফিরে পেলাম! কখনো ভাবিনি এদের আবার ফিরে পাবো!আর যা ফিরে পাওয়া যাবে না কোনমতে? স্টেশনে আমি এখন দেরী করে ঢুকি।ট্রেন ছাড়ার সামান্য আগে।বেশ কয়েকটি বছর আগে এক মা তাঁর মেয়েটিকে নিয়ে স্টেশনে আসতেন ট্রেন ছাড়ার অন্তত দু ঘন্টা আগে।খুব টেনশন হত তাঁর।যদি ট্রেন ছেড়ে যায়? অনেক বুঝিয়ে ও পারা যেত না।আগে গিয়ে বসে থাকো।সে চেন্নাই যাও বা চাঁদিপুর।মায়ের শরীর তেমন ভাল না।তাই তাঁর কথাই ধার্য ।স্টেশনে এসে বসে থাকো।লোক দেখো।পত্রিকা পড়ো।সেইসব অনন্ত বসে থাকার দিন আর নেই।হারিয়ে গেছে মায়ের জন্য চিন্তা, তাকে নিয়ে ধরে ধরে ট্রেনে তোলা,কুলিকে হেঁকে বলা আস্তে চলো ভাই!মাজী ধীরে সে যায়েঙগে।হারিয়ে গেছে মনে করে সবার আগে ইনসুলিন আর ওষুধ গোছানোর  তোড়জোর।শেষবার তিনি কলকাতা গেছিলেন হুইল চেয়ারে ।এবার স্টেশনে অমনি এক হুইল চেয়ার আরোহিণী কে দেখলাম।অমনি ঘাড় এলিয়ে বসে আছেন।পরনে ঢিলে পোষাক।রোগা শরীর।মনে হল এই তো আছেন!
 মোটের ওপর দেখি হারিয়ে যাওয়ার খেলাটা অতি স্বাভাবিক ।তার জন্যে দুঃখ আসাও স্বাভাবিক ।কেন তাকে অকারণে সরিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা?  সবটাই মনের মত হবে আর চিদানন্দ হয়ে চিরানন্দে থাকবো, এমন ভাবলেই যত গন্ডগোল ।থাক না চিনচিনে দুঃখের বর্ষণ ।হারিয়ে যাওয়া র কষ্ট না থাকলে ফিরে পাবার আনন্দ নেই।আর যেসব হারিয়ে যাওয়া ফেরে না,তাদের ধরে রাখতে নেই।তারা আলো হয়ে,বাতাস হয়ে, ধূলিকণা হয়ে আমাদের সঙ্গেই থাকে।শুধু খুঁজে নিতে জানতে হয়।
হংসধবনি
হাঁসের ডাক কি ভালো? না।সব হাঁসের ডাক শ্রুতিমধুর তো নয় বটে।বনলক্ষীর চীনে হাঁস দের দেখলে তো রীতিমত ভয় করে।তারা লাল লাল চোখে কড়া করে তাকিয়ে বুঝিয়ে দেয়.... তফাত যাও ।হাঁস মাত্র মোটেই মিষ্টি নরমসরম হেলদুলুনি নয়।তারা রাগতে জানে।ঠোকরাতে জানে।চাই কি ভয় দেখাতেও জানে। হাঁস বললেই যে তারা অবন ঠাকুরের বই থেকে উঠে আসা শান্ত সুবচনী হাঁস হবে বা ভদ্র সভ্য খোঁড়া হাঁস হবে,মিষ্টি মিষ্টি ডাকাডাকি করবেএমন ভাবার কোনও দরকার নেই।চকা নিকোবর রাও রয়েছেন। সাতসকালে হাঁস নিয়ে পড়লাম কেন রে বাবা?আমি যেখানে থাকি তার ত্রিসীমানা য় তো হাঁস নেই!সে না থাকুক।হংসধবনি তো আছে। রাগ হংসধবনি ।তার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ মেঘে ঢাকা তারা ছবিতে।মনোমুগ্ধ।ছবি দেখে আর এ।টি।কাননের গানে ভিজে একেবারে বিমোহিত ।সখী লাগি লগন।কেমন নেশা ধরে গেল।তখন সদ্য ফার্স্ট ইয়ার ।  হাঁসের ডাক হোক না কর্কশ ।হংসধবনি যেন জলভরা মেঘের মত অবনতনেত্র মাধুর্য ।সে এমন নেশা হল যে যেখানে পাই হংসধবনি খুঁজে বেড়াই।আহা।ভীমসেন যোশী,বা কিশোরী আমোনকর।আমির খান।তখন তো ইউ টিউব ছিল না।তাই আঁতিপাতি করে খুঁজি।আমি কোথায় পাবো তারে।এই তো রশিদ খান গেয়েছেন।হৃদয় উল্লসিত ।পরে  কৌশিকী গাইলেন।এবং আরো অনেকে।
আজকে মেঘলা দিনে হংসধবনি আমাকে পেয়ে বসেছে।মাঝে মাঝেই পায়।বাড়িতে মিস্ত্রি রা কাজ করছেন।চলাফেরা সীমায়িত।জিনিস পত্র জায়গা বদল করেছেন।এরকম অদলবদল বাড়ির সব সদস্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে খাবি খাচ্ছেন ।প্রথম দিন আমিও কিছু ধন্দে পড়ি।পরের দিন থেকে একটা ছন্দ আনার চেষ্টা থাকে।রান্না ঘরের যাবতীয় এখন বসার ঘর,পড়ার ঘর,শোবার ঘরে ঠাঁই নিয়েছেন।তাদের একটু গুছিয়ে নিয়েছি যাতে হাত বাড়ালে সাঁড়াশি টা বা খুন্তি টা পাওয়া যায়।নইলে বড় ঝামেলা ।ছোট যখন ছিলাম বাড়ি রং করার সময় খুব মজা লাগত।খাটের ওপর টেবিল ।তার ওপর ফুলের টব।টেবিলের নিচে মোড়া।মাথার কাছে সার দেওয়া সুটকেস।তারওপর বই রেখে চলছে আমার পড়া।যেন একটা অন্য দুনিয়া ।খাট থেকে নামা বারন।কারণ হাতে পায়ে দরজার রং লেগেছে এরমধ্যেই।সে এক বিতিকিচছিরি অবস্থা ।তারপিন তেল দিয়ে ঘষে ঘষে রং তুলেএ মা খাটে উঠিয়ে দিয়েছেন ।মিস্ত্রি শিরীষ কাগজ দিয়ে দেওয়াল ঘষছে।বাবা গান চালিয়ে দিয়েছেন বেশ মৃদুস্বরে ।সব অগোছালো র মধ্যে সুর লাগছে।সাবান পাওয়া গেল না,বড়ির শিশি গেল কোথায়?বেলন চাকি খাটের নীচে রাখা হল।গেল কোথায়?ইসস।নীল ফুলদানী টা ভেঙ্গে গেল!!!জলের জাগটাই বা হাতের কাছে নেই কেন....এইসব হাজার তুচ্ছ বেরিয়ে সুর লাগছে।কখনো মারু বেহাগ।কখনো মালকোষ বা পূর্বী।এমন নয় যে ভীষণ বুঝে উল্টে দিচ্ছি।কিন্তু সুর জাল বুনছে চারদিকে ।সব বেনিয়ম কেমন মায়াবী আলোতে ভরে যাচছে।বেরিয়ে পড়ছে পুরোন বই।ছেঁড়া ছবি।পোস্ট কার্ড ।দিদুর চিঠি।ইতি আশীর্বাদিকা তোমার মা ... পোস্টকার্ড খুঁজে পেয়ে আনমনা   হয়ে যাচ্ছে মা ...গান চলেছে সুরের পথ ধরে ...মোরি নইহার ছুট যায়ে।নতুন রঙের গন্ধে সুর মিশে যাচছে ।
এখন আমার পায়ের ওপর পা তুলে খাটে বসে থাকার দিন নেই।মিস্ত্রি কাজ করলে কান খাড়া করে থাকি কখন কি হুকুম হবে।তাঁরা খুব সদাশয় ।নিজেদের মত করে কাজ করেন।আমি শুধু সুরটুকু ধরে রাখার চেষ্টা করি।হংসধবনি আজ তাতে সঙ্গ দিয়েছেন।মেঘলা আকাশ দেখছি সেলফোনে।তাতে হংসপাখা।পাখা কি খসে পড়ল?এই যে খবরের কাগজ।
এত রক্তপাতের  খবরে সুর তাল সবি কেটে যায়।সন্ত্রাস গিলে নিচ্ছে সব সুর।বিদেশ থেকে ছুটি কাটাতে আসা মেয়েটি হত হয়ে পড়ে থাকলেন।যেমন হত হলেন আরো অনেকে।রক্তাক্ত হচ্ছেন প্রতি দিন এত মানুষ ।কি ভয়ংকর!সন্ত্রাস আর নতুন খবর নয়!!!! নিরাপত্তাহীনতা কে সঙ্গী করে বেঁচে আছি, নরম হাঁসেরা, জীবনানন্দের হাঁসেরা  তাদের সব সুর নিয়ে কোথায় লুকালো! এ বুঝি সেই ঘন নিকষ মেঘ যার তল নেই।ঝরে যাওয়া নেই।আছে শুধু আগ্রাসন! বাঁশি হারিয়ে যাচ্ছে ।আমি কোন সুরে খুঁজি তোমারে? ????

Tuesday, 31 May 2016

আঁধারময়ী

আবার আজকে ও?

গতকাল বলছিলাম রাত্রির নিভৃতির কথা।কিছু কথা বাকি ছিল ....তাই তাদের ভাগ করে নেওয়া বন্ধুদের সঙ্গে ।
রাত যদি মানুষ হত, তবে তার নাম দিতাম আঁধারময়ী ।খুব ছোট্ট বেলা থেকে তার সঙ্গে আমার আদান প্রদান ।বাবা ফিরতেন অনেক দেরী তে।যতক্ষণ বাবা না আসতেন , পড়াশোনা, গানের পাট সেরে একটা ছোট্ট মেয়ে কোলাপসেবল গেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকত।সেটা আমাদের বালিগঞ্জের বাড়ি।তখন কিন্তু সে রাত কে ভয় পেত।যদি বাবা হারিয়ে যায়!যেই বাবা দোড়গোড়ায়,ওমনি সব ভয় হাওয়া! তারপরও তাদের শুতে অনেক রাত হত।খাওয়ার পর বাবা তুলি হাতে ইজেলের সামনে।মেয়ে টা দেখতে পেতো একটু দূরে হাতে টানা রিকশা চালকরা জড়ো হয়েছে ।কোমরে বাঁধা পোটলা থেকে ছাতু বেরোচ্ছে ।বেরোচ্ছে লঙ্কা ।ছেদিলালের দোকান থেকে কেউ নিয়ে গেল একটি পলা সর্ষের তেল।ছাতু মাখা হত জম্পেশ করে।মেয়েটা ঘাড় উঁচু করে সেই খাবারের  গন্ধ নিতে চাইত।পেতো না।তারপর শুরু হত দেহাতী গানা।রাত গভীর হতে তারা গামছা বিছিয়ে রিকশার নীচেই ঘুমিয়ে যেত! তখন আর রাত্রি বেলাটা ভয়ের কিছু নয়!রাস্তার ওপর কয়েকজন মানুষ কি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে! গেটের এপাশ থেকে মেয়েটা অবাক হয়ে দেখত।আর একটু গলা বাড়ালে দেখা যেত রামকুমারের ইস্তিরি ঘর।রাশি রাশি জামাকাপড় দিনরাত ইস্তিরি হয়ে চলেছে।তার স্কুলের জামাও ওখানে ইস্তিরি হয়।এরপর মা এসে ওকে টেনে নিয়ে যেতে শোয়াতে।
বাসে করে যে রাত ভ্রমণের কথা বলেছিলাম, তাতে মেয়ে টা সবচে মজা পেত নদী নালার পাশে ছোটছোট ঘর দেখে।অন্ধকারে মিটমিট করতো আলো।কারা থাকে ওখানে?জলের পাশে জেলেরা থাকে?বাড়ি ফেরার সময়ে ছোট মাছ ধরে নিয়ে আসে?এইসব প্রশ্ন করতো বাবাকে ।ওদের তেল নেই।তাই মাছ পুড়িয়ে শুকনো লঙ্কা ডলে পান্তা খায়।সামান্য তেলটুকু কুপি তে জ্বলে। ও মনে মনে দেখতে পেতো কুপির টিমটিমে আলোতে বসে জেলে বউ,ছেলে,মেয়ে নিয়ে মাছপোড়া খাচ্ছে ।কি নিশ্চিন্তি ।
রাত কি তা বলে দুঃখ হয়ে আসে নি?বাবা যখন হঠাৎই চলে গেলেন,মায়ের হাতে হাত রেখে রাত কাটত।একরাততিরে খুব ঝড় হয়েছিলো ।ঘুলঘুলি দিয়ে জল এসে ভিজিয়ে দিয়েছিল ঘরদোর।সারারাত মা কে নিয়ে বসেছিল সে।মোমের আলোয় চেনা বাড়ি অচেনা।টানা লোডশেডিং।সেসব দুঃখরাত পার হয়ে অনেকদূর চলেছিল দুজনে।
তারপর যখন দূরপাল্লার বেড়ানোর নেশা ফের চাপলো মাথায়,মস্ত মস্ত রাত ভ্রমণ করেছে তারা।মুম্বাই থেকে গোয়া যাবার রাতের বাস ভারি ভালো ।আধশোওয়া হয়ে দিব্যি আরামে যাওয়া যায়।বাসে মার দাঙ্গা মার্কা হিন্দি ছবি চলে।তাও একরকম চলমান জীবনের ছবিই তো।সেরকম ভ্রমণ কালে রাতে ডিনার হয়তো হত কোনো পেট্রল পাম্পে ।মানে ট্রাভেল এজেন্সি সেইরকম একটা ব্যাবস্থা করেছেন।রাত এগারোটা র সময় পেট্রল পাম্পের পাঁচিলে বসে পা দোলাতে দোলাতে গলা খিচুড়ি আর আলুভাজা, বেগুনভাজা খাচ্ছি ।উফফ! এই না হলে বেড়ানো!বাসে সবাই তখন চেনা হয়ে যায়।প্রায় একটা পরিবার ঝগড়া ঝাটি বা বাদ কেন!!!!কিন্তু সব মিলিয়ে জমজমাট মজা।রাতের বাসে অন্তাক্ষরী খেলোনি?  করেছো কি?আমি তো পারলে এখোনো......।হঠাত পাতানো মাসি,মেসো,দিদি,দাদারা রাতকে পাহারা দিয়ে রাখেন।নো চিন্তা ।নো ভাবনা।
বেড়াতে গিয়ে নৈশাহারের পরে পায়ে হেঁটে ঘোরা আমার বাই।একটা জায়গা কে চিনতে গেলে তাকে সকালে দেখবো,দুপুরে দেখবো,রাতে দেখবো না?সে সব লিখতে গেলে মহাভারত হবে।এটুকু না লিখে পারছি না,রাতের পাহাড়ে হাঁটার মজাই আলাদা।শনশন হাওয়া ।কনকনে ঠান্ডা তে হাত পা জমে বরফ।আপাদমস্তক ঢেকে খাদের পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে দেখছি হিমালয়ের গলায় হীরের নেকলেস! !!বন্ধুদের সঙ্গে এ আনন্দ ভাগ না করে যাই কোথায়!সে এক অন্য কবিতা।আজএই পর্যন্ত! !!ভালো থেকো আঁধারময়ী!
আবার আজকে ও?

গতকাল বলছিলাম রাত্রির নিভৃতির কথা।কিছু কথা বাকি ছিল ....তাই তাদের ভাগ করে নেওয়া বন্ধুদের সঙ্গে ।
রাত যদি মানুষ হত, তবে তার নাম দিতাম আঁধারময়ী ।খুব ছোট্ট বেলা থেকে তার সঙ্গে আমার আদান প্রদান ।বাবা ফিরতেন অনেক দেরী তে।যতক্ষণ বাবা না আসতেন , পড়াশোনা, গানের পাট সেরে একটা ছোট্ট মেয়ে কোলাপসেবল গেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকত।সেটা আমাদের বালিগঞ্জের বাড়ি।তখন কিন্তু সে রাত কে ভয় পেত।যদি বাবা হারিয়ে যায়!যেই বাবা দোড়গোড়ায়,ওমনি সব ভয় হাওয়া! তারপরও তাদের শুতে অনেক রাত হত।খাওয়ার পর বাবা তুলি হাতে ইজেলের সামনে।মেয়ে টা দেখতে পেতো একটু দূরে হাতে টানা রিকশা চালকরা জড়ো হয়েছে ।কোমরে বাঁধা পোটলা থেকে ছাতু বেরোচ্ছে ।বেরোচ্ছে লঙ্কা ।ছেদিলালের দোকান থেকে কেউ নিয়ে গেল একটি পলা সর্ষের তেল।ছাতু মাখা হত জম্পেশ করে।মেয়েটা ঘাড় উঁচু করে সেই খাবারের  গন্ধ নিতে চাইত।পেতো না।তারপর শুরু হত দেহাতী গানা।রাত গভীর হতে তারা গামছা বিছিয়ে রিকশার নীচেই ঘুমিয়ে যেত! তখন আর রাত্রি বেলাটা ভয়ের কিছু নয়!রাস্তার ওপর কয়েকজন মানুষ কি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে! গেটের এপাশ থেকে মেয়েটা অবাক হয়ে দেখত।আর একটু গলা বাড়ালে দেখা যেত রামকুমারের ইস্তিরি ঘর।রাশি রাশি জামাকাপড় দিনরাত ইস্তিরি হয়ে চলেছে।তার স্কুলের জামাও ওখানে ইস্তিরি হয়।এরপর মা এসে ওকে টেনে নিয়ে যেতে শোয়াতে।
বাসে করে যে রাত ভ্রমণের কথা বলেছিলাম, তাতে মেয়ে টা সবচে মজা পেত নদী নালার পাশে ছোটছোট ঘর দেখে।অন্ধকারে মিটমিট করতো আলো।কারা থাকে ওখানে?জলের পাশে জেলেরা থাকে?বাড়ি ফেরার সময়ে ছোট মাছ ধরে নিয়ে আসে?এইসব প্রশ্ন করতো বাবাকে ।ওদের তেল নেই।তাই মাছ পুড়িয়ে শুকনো লঙ্কা ডলে পান্তা খায়।সামান্য তেলটুকু কুপি তে জ্বলে। ও মনে মনে দেখতে পেতো কুপির টিমটিমে আলোতে বসে জেলে বউ,ছেলে,মেয়ে নিয়ে মাছপোড়া খাচ্ছে ।কি নিশ্চিন্তি ।
রাত কি তা বলে দুঃখ হয়ে আসে নি?বাবা যখন হঠাৎই চলে গেলেন,মায়ের হাতে হাত রেখে রাত কাটত।একরাততিরে খুব ঝড় হয়েছিলো ।ঘুলঘুলি দিয়ে জল এসে ভিজিয়ে দিয়েছিল ঘরদোর।সারারাত মা কে নিয়ে বসেছিল সে।মোমের আলোয় চেনা বাড়ি অচেনা।টানা লোডশেডিং।সেসব দুঃখরাত পার হয়ে অনেকদূর চলেছিল দুজনে।
তারপর যখন দূরপাল্লার বেড়ানোর নেশা ফের চাপলো মাথায়,মস্ত মস্ত রাত ভ্রমণ করেছে তারা।মুম্বাই থেকে গোয়া যাবার রাতের বাস ভারি ভালো ।আধশোওয়া হয়ে দিব্যি আরামে যাওয়া যায়।বাসে মার দাঙ্গা মার্কা হিন্দি ছবি চলে।তাও একরকম চলমান জীবনের ছবিই তো।সেরকম ভ্রমণ কালে রাতে ডিনার হয়তো হত কোনো পেট্রল পাম্পে ।মানে ট্রাভেল এজেন্সি সেইরকম একটা ব্যাবস্থা করেছেন।রাত এগারোটা র সময় পেট্রল পাম্পের পাঁচিলে বসে পা দোলাতে দোলাতে গলা খিচুড়ি আর আলুভাজা, বেগুনভাজা খাচ্ছি ।উফফ! এই না হলে বেড়ানো!বাসে সবাই তখন চেনা হয়ে যায়।প্রায় একটা পরিবার ঝগড়া ঝাটি বা বাদ কেন!!!!কিন্তু সব মিলিয়ে জমজমাট মজা।রাতের বাসে অন্তাক্ষরী খেলোনি?  করেছো কি?আমি তো পারলে এখোনো......।হঠাত পাতানো মাসি,মেসো,দিদি,দাদারা রাতকে পাহারা দিয়ে রাখেন।নো চিন্তা ।নো ভাবনা।
বেড়াতে গিয়ে নৈশাহারের পরে পায়ে হেঁটে ঘোরা আমার বাই।একটা জায়গা কে চিনতে গেলে তাকে সকালে দেখবো,দুপুরে দেখবো,রাতে দেখবো না?সে সব লিখতে গেলে মহাভারত হবে।এটুকু না লিখে পারছি না,রাতের পাহাড়ে হাঁটার মজাই আলাদা।শনশন হাওয়া ।কনকনে ঠান্ডা তে হাত পা জমে বরফ।আপাদমস্তক ঢেকে খাদের পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে দেখছি হিমালয়ের গলায় হীরের নেকলেস! !!বন্ধুদের সঙ্গে এ আনন্দ ভাগ না করে যাই কোথায়!সে এক অন্য কবিতা।আজএই পর্যন্ত! !!ভালো থেকো আঁধারময়ী!

রাতের কথা

আবার আজকে ও?

গতকাল বলছিলাম রাত্রির নিভৃতির কথা।কিছু কথা বাকি ছিল ....তাই তাদের ভাগ করে নেওয়া বন্ধুদের সঙ্গে ।
রাত যদি মানুষ হত, তবে তার নাম দিতাম আঁধারময়ী ।খুব ছোট্ট বেলা থেকে তার সঙ্গে আমার আদান প্রদান ।বাবা ফিরতেন অনেক দেরী তে।যতক্ষণ বাবা না আসতেন , পড়াশোনা, গানের পাট সেরে একটা ছোট্ট মেয়ে কোলাপসেবল গেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকত।সেটা আমাদের বালিগঞ্জের বাড়ি।তখন কিন্তু সে রাত কে ভয় পেত।যদি বাবা হারিয়ে যায়!যেই বাবা দোড়গোড়ায়,ওমনি সব ভয় হাওয়া! তারপরও তাদের শুতে অনেক রাত হত।খাওয়ার পর বাবা তুলি হাতে ইজেলের সামনে।মেয়ে টা দেখতে পেতো একটু দূরে হাতে টানা রিকশা চালকরা জড়ো হয়েছে ।কোমরে বাঁধা পোটলা থেকে ছাতু বেরোচ্ছে ।বেরোচ্ছে লঙ্কা ।ছেদিলালের দোকান থেকে কেউ নিয়ে গেল একটি পলা সর্ষের তেল।ছাতু মাখা হত জম্পেশ করে।মেয়েটা ঘাড় উঁচু করে সেই খাবারের  গন্ধ নিতে চাইত।পেতো না।তারপর শুরু হত দেহাতী গানা।রাত গভীর হতে তারা গামছা বিছিয়ে রিকশার নীচেই ঘুমিয়ে যেত! তখন আর রাত্রি বেলাটা ভয়ের কিছু নয়!রাস্তার ওপর কয়েকজন মানুষ কি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে! গেটের এপাশ থেকে মেয়েটা অবাক হয়ে দেখত।আর একটু গলা বাড়ালে দেখা যেত রামকুমারের ইস্তিরি ঘর।রাশি রাশি জামাকাপড় দিনরাত ইস্তিরি হয়ে চলেছে।তার স্কুলের জামাও ওখানে ইস্তিরি হয়।এরপর মা এসে ওকে টেনে নিয়ে যেতে শোয়াতে।
বাসে করে যে রাত ভ্রমণের কথা বলেছিলাম, তাতে মেয়ে টা সবচে মজা পেত নদী নালার পাশে ছোটছোট ঘর দেখে।অন্ধকারে মিটমিট করতো আলো।কারা থাকে ওখানে?জলের পাশে জেলেরা থাকে?বাড়ি ফেরার সময়ে ছোট মাছ ধরে নিয়ে আসে?এইসব প্রশ্ন করতো বাবাকে ।ওদের তেল নেই।তাই মাছ পুড়িয়ে শুকনো লঙ্কা ডলে পান্তা খায়।সামান্য তেলটুকু কুপি তে জ্বলে। ও মনে মনে দেখতে পেতো কুপির টিমটিমে আলোতে বসে জেলে বউ,ছেলে,মেয়ে নিয়ে মাছপোড়া খাচ্ছে ।কি নিশ্চিন্তি ।
রাত কি তা বলে দুঃখ হয়ে আসে নি?বাবা যখন হঠাৎই চলে গেলেন,মায়ের হাতে হাত রেখে রাত কাটত।একরাততিরে খুব ঝড় হয়েছিলো ।ঘুলঘুলি দিয়ে জল এসে ভিজিয়ে দিয়েছিল ঘরদোর।সারারাত মা কে নিয়ে বসেছিল সে।মোমের আলোয় চেনা বাড়ি অচেনা।টানা লোডশেডিং।সেসব দুঃখরাত পার হয়ে অনেকদূর চলেছিল দুজনে।
তারপর যখন দূরপাল্লার বেড়ানোর নেশা ফের চাপলো মাথায়,মস্ত মস্ত রাত ভ্রমণ করেছে তারা।মুম্বাই থেকে গোয়া যাবার রাতের বাস ভারি ভালো ।আধশোওয়া হয়ে দিব্যি আরামে যাওয়া যায়।বাসে মার দাঙ্গা মার্কা হিন্দি ছবি চলে।তাও একরকম চলমান জীবনের ছবিই তো।সেরকম ভ্রমণ কালে রাতে ডিনার হয়তো হত কোনো পেট্রল পাম্পে ।মানে ট্রাভেল এজেন্সি সেইরকম একটা ব্যাবস্থা করেছেন।রাত এগারোটা র সময় পেট্রল পাম্পের পাঁচিলে বসে পা দোলাতে দোলাতে গলা খিচুড়ি আর আলুভাজা, বেগুনভাজা খাচ্ছি ।উফফ! এই না হলে বেড়ানো!বাসে সবাই তখন চেনা হয়ে যায়।প্রায় একটা পরিবার ঝগড়া ঝাটি বা বাদ কেন!!!!কিন্তু সব মিলিয়ে জমজমাট মজা।রাতের বাসে অন্তাক্ষরী খেলোনি?  করেছো কি?আমি তো পারলে এখোনো......।হঠাত পাতানো মাসি,মেসো,দিদি,দাদারা রাতকে পাহারা দিয়ে রাখেন।নো চিন্তা ।নো ভাবনা।
বেড়াতে গিয়ে নৈশাহারের পরে পায়ে হেঁটে ঘোরা আমার বাই।একটা জায়গা কে চিনতে গেলে তাকে সকালে দেখবো,দুপুরে দেখবো,রাতে দেখবো না?সে সব লিখতে গেলে মহাভারত হবে।এটুকু না লিখে পারছি না,রাতের পাহাড়ে হাঁটার মজাই আলাদা।শনশন হাওয়া ।কনকনে ঠান্ডা তে হাত পা জমে বরফ।আপাদমস্তক ঢেকে খাদের পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে দেখছি হিমালয়ের গলায় হীরের নেকলেস! !!বন্ধুদের সঙ্গে এ আনন্দ ভাগ না করে যাই কোথায়!সে এক অন্য কবিতা।আজএই পর্যন্ত! !!ভালো থেকো আঁধারময়ী!

রাত বিরেতে

রাত খুব প্রিয় আমার।একটা বই নিয়ে বসা বা গান নিয়ে বসা হোক,অথবা লেখালেখি, ছবি দেখা.... রাত হচ্ছে সবচেয়ে নিশ্চিন্ত আর নিরাপদ।কলিং বেল বাজবে না যখন তখন,ফোন বেজে উঠবে না।চোদ্দ বার উঠতে হবে না ....এই সবজিওয়ালা এল,পটল আর বেগুন নিতে হবে, এই ডিমওয়ালা ডিম দিতে এল,নয়ত কেউ দেখা করতে এলেন।ছাত্র ছাত্রী এল,  কেবল টিভির লোক বেল দিল.... সে সব যে আমার খুব খারাপ লাগে তা তো নয়।কিন্তু নিরিবিলি কাজ করার জন্য বা আলসেমি র জন্য রাত হল প্রশস্ত সময়।চাঁদ দেখার সৌভাগ্য হয় না ফ্ল্যাট বাড়ি তে।কিন্তু চাঁদ থাক আর না থাক, সখী রাত আমার ভালো লাগে ।বইয়ের আলমারি গোছানো বা জামাকাপড়ের আলমারি  ...রাত আমার শ্রেষ্ঠ সময়।আর গোছাতে গোছাতে যদি হারানো সোয়েটার বা পুরোনো বই খুঁজে পেয়ে যাই তবে আর দেখে কে।কি আনন্দের ঘুম যে আসে তখন!
রাতদুপুরে রান্নাঘর গোছানোর দুঃসাহসিক কাজটি করে থাকি আমি।দিনে সেখানে সন্ধ্যা মাসির রাজ্যপাট।আমি পাত্তা পাই না।আরশোলা নিধন বা মেথির কৌটো খুঁজে রাখা, নতুন চায়ের কাপ নামানো ইত্যাদি কাজ এইসময় ভাল হয়।এইসব সেরে পায়ের ওপর আলগোছে একটি পাতলা চাদর ফেলে বইটি হাতে নিয়ে বসা আর গান চালিয়ে দেওয়া হল পরম আদরের চরম বিলাসিতা ।গাছের পাতায় তখন আলোআঁধারি।সন্ধ্যা বেলা দেওয়া জলের দুএক ফোঁটা চিকচিক করছে।পাখিরা সবুজ হলুদ নীল বদরি পালক ফুলিয়ে ঘুমপি করছে।এরিকা পামের ছায়া   মাথা নাড়ে এদিক ওদিক ।মস্ত লম্বা পোড়া মাটির ঘোড়া ঘাড় বাঁকিয়ে ডান দিকে চেয়ে থাকে।
ঘর জুড়ে টেবিল আলোর নরম মায়া।খরগোশি পুশকিনের দস্যিপনা এখন ঠান্ডা ।ওদের নরম গায়ে হেলান দিলে যাকে বলে সগ্গসুখ।এর মধ্যে ফরিদা খানুম যখন গেয়ে ওঠেন আজ যানে কি জিদ না করো ....তখন সারাদিনের সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়।
রাত জাগার হাতে খড়ি হয়েছিল হসটেলে গিয়ে ।সেখানে ডিনারের পর একপ্রস্থ আড্ডা ।চুলবাঁধা।মুখ পালিশ।পা পালিশ।পেছনে লাগা,পরচর্চা ।তারপর বারোটা বাজলে যে যার টেবিলে পড়তে বসা।সেই পড়তে বসে সোমাতে আমাতে কত রাত গভীর আড্ডা য় কেটে গেছে।মেহেদী হাসান রনজিশি শাহি গেয়ে গেয়ে থেমে গেছেন,দেবব্রত বিশ্বাস তুমি রবে নীরবে গাইলেন,দুয়ার ঝড়ে ভাঙলো ...কনিকার বুলবুল কন্ঠে আজি যে রজনীর সুর ছড়িয়ে গেল করিডোরে।পাশের ঘর থেকে উর্মি পড়া ছেড়ে গান শুনে আরেক পর্ব গপপ করে গেল।পরভীন সুলতানা যখন সোনার ঝিলিক ছড়িয়ে মালকোষ আলাপ ধরলেন, আমরা আরেকবার হরলিকস খেয়ে শুতে যাই।বাড়ি গেলে রাত জাগার বহর দেখে মা বাবা টের পেলেন মেয়ে ভীষণ পড়ছে!আর গান শুনে পড়লে পড়া নাকি বডড  ভালো হয়!!!
একসময়ে রাতে বাস জার্নি করতাম খুব।বিশেষ করে কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ বা উল্টোটাও।চৌরঙগী তে বাস থামতো।তিনজনের সিটে মা বাবা আর আমি।তখন এমন বয়স যে মা বাবা সঙ্গে থাকা মানে গোটা পৃথিবী হাতের মুঠোয়।বাসের সিটের নিচে সুটকেস ছোটোটা।বইটা বাসের মাথাতে।পাশে ঝুড়িতে নানারকম খাবার।মানের বানিয়ে নিতেন।পুডিং অবশ্যই থাকত।রুটি,আলুর দম,মাংস।যাতে রাস্তার খাবার খেতে না হয়।কৃষ্ণনগর এলে কিন্তু সরপুরিয়া আর সরভাজা কেনা হবেই।নিজেদের জন্য ।পাড়া প্রতিবেশী দের জন্য ও।মাঝ রাতে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ত।চা সিগারেটের দোকানে ভীড়।দেখতাম হোটেলে খুব লোক সমাগম ।সবাই হুড়াহুড়ি করে খাচ্ছে ।তখন ভোজনবিলাসী ছিলাম না মোটে।তাও লোভ হতো ঐ হোটেলে হুসহাস করে ডাল দিয়ে ভাত আর আলুভাজা খাবার।কিন্তু উপায় ছিল না। আলুচচচড়ি তো মা করেই এনেছে!গভীর রাতে অন্ধকার ভেদ করে বাস চলেছে।দুপাশে ছায়া ছায়া গাছ।সে যে কি রোমাঞ্চ! কল্পনা র আবছায়া গতিশীল রাস্তা তে ভূত,ডাকাত কতকিছু ভয়!!!তখন থেকে বুঝেছি মানুষ ভয় পেতে ভালবাসে!আর বাবা মার মাঝখানে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মাঝে আমি।আকাশে চাঁদ এই আছে এই নেই।দুপাশে ছুটছে আঁধারময় নদীনালা আর মাঠঘাট ।হাওয়া আসছে বলে মা রুমাল বেঁধে দিচ্ছে মাথায়।    নিকষ কালো গাছেরা  ছবি তৈরি করছে প্রান্তরে! !!
আমি এখন আর রাততিরের বাসে চলাচল করিনা।এখন ট্রেনে ।আর তাতে উঠলেই মনে পড়ে কিশোর ভারতীতে পড়া ডিটটেকটিভ উপন্যাসের কথা।যদ্দূর মনে আছে ডিটেকটিভের নাম ইন্দ্রজিৎ রায়।আর ভিলেনের শাগরেদ হল কানা বলরাম।খোদ ভিলেনের নামটি কিছুতে মনে পড়ছে না।কিন্তু সেই  ভিলেন মশাই একবার পুরী যেতে গিয়ে রাতের ট্রেনে আবৃত্তি করছিলেন .....এ প্রাণ রাতের রেলগাড়ি ।দিল পাড়ি.....ইসসস।কেউ দেখেছে এমনটি!!! তবে আমার প্রাণ রেলগাড়ি হয় মাঝেমাঝেই।কোথাও যেতে না পারলে হাঁসফাঁস ।আর গন্তব্যের চেয়ে রাস্তা টি আমার বেশি আহ্লাদে র।সে যদি রাতের রাস্তা হয় তার মেজাজ ই আলাদা।মাঝরাততিরে স্টেশনে নেমে চা খেয়ে ফুরফুরে হয়ে ভূতের গপপ করে ট্রেনে রাখা বাকি যাত্রী দের জাগিয়ে রাখার মজা কি চাট্টিখানি? আমরা তাও করি।আর রাত বলেই কিনা এতখানি টানা সময় পেলাম মনের কথা লেখার।কাজেই নাইট সদা সর্বদা গুড! !!!

Monday, 16 May 2016

বাবাকে আমি কোনোদিন পূজো দিতে,অঞ্জলি দিতে দেখিনি।।কিন্তু মা যখন পূজো করতেন ,তাতে বাবার বেশ উৎসাহ দেখতাম।জিজ্ঞাসা করলে বলতেন পূজোর মাধ্যমে বাড়িতে একটি সুন্দর শ্রী আসে আর তার যেমনএকটি নান্দনিক দিক আছে,তেমনি শৃংখলার দিকটিও আছে।মনঃসংযোগ হয়। কাজেই মা-তে আমাতে মিলে খুব জোড়তোড় করে সরস্বতীপূজো করতাম। তাতে একটা বড় জায়গা ছিল ঠাকুর সাজানোর।
সাদা মূর্তি পছন্দ হোতো।দুজনেরি।অনেকসময় মূর্তি পছন্দ না হলে,মা বলতেন।।তুই এঁকে দে না।আমিও কাগজ-কলম রং নিয়ে বসে পড়তাম।দেবীর মুখ নিয়ে মা’র খুব খঁতখুতুনি ছিল। দেবী ভাব থাকা চাই। তারপর তাকে শোলা দিয়ে সাজানো।  মা আমাকে চমকে দেবার জন্য কলকাতার ফ্ল্যাট-বাড়ীতে মাটি দিয়ে একবার ছোট্টো পুকুর বানিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে আবার পদ্মফুল ভাসানো হোলো,বাবা সাদা কাগজ দিয়ে হাঁস বানিয়ে দিলেন... আমি রঙ্গীন কাগজ কেটে ফুল,পাতা বানাতাম।আমাদের ব্যাল্কনির টবের গাছেরা সে দুদিন মূর্তির চারপাশে শোভা পেত। মূর্তির মাথার ওপর দিয়ে আমরা টাঙ্গাতাম জরির ঝিলমিল। তারপর প্রতি বছরই আমার পুকুরের আবদার রাখতে হত।
আনন্দের দিন বড় তাড়াতাড়ি চলে যায়।২০০৮এর সরস্বতী পূজোর পরপর মা’র চলে যাওয়া। তারপর সাজানোর তোড়জোর নেই অত। অন্যদিকে মন দেই...।মনঃসংযোগের নানা উপায় আছে ।তারা সময় নিয়ে নেয়। ঠাকুর দেখার দিন নেই আর।
তবু কোথোও সুন্দর করে সাজিয়ে পূজো হচ্ছে দেখলে মনটা ভারী স্নিগ্ধ হয়।

Sunday, 15 May 2016

সফর

ট্রেনযাত্রার অনেক মজার অভিজ্ঞতার একটির গপ্পো রইলো...।আমি আছি এক নীচের আসনে...। সামনের সাইড-লোয়ারে এক দম্পপ্তি,সঙ্গে  মাস-ছয়েকের শিশু-পুত্র।ভদ্রলোক প্রবল গপ্পে...।তৎসহ পত্নি-সেবাতে অতি-তৎপর ।বেশ লাগছিলো।বুঝতে পারলাম তরুণী বধূটি প্রথম ট্রেনে চড়েছে।গায়ে দামী সিল্কের শাড়ি,সোয়েটার,চাদর,তদুপরি তার পতিদেবটি তাকে কম্বলে মুড়ে রেখেছেন।‘বোঝলেন কিনা,জীবনে সাক্সেস পাইসি,বউরে সিড়িয়াখানা দ্যাখাইয়া লইয়া আসি...’ ।যত্ন করে বউকে রুটি তরকারী খাওয়ালেন,নিজেই ব্যাগপ্ত্র গোছালেন,কে বলে ছেলেরা গৃহকাজ করে না! ‘হাত ধুমু কই?’ প্রশ্ন করে মেয়েটি—‘অইনে তাকাও।।বেসিন আসে’,বধূটি মুগ্ধ।‘বাথরুম-ও আসে”।।মেয়েটি কিংকর্তব্য-বিমূড়!”তাই!!! কিন্তু সাহস করে সে বেসিন বা বাথরুম কোথাও-ই যায় না। কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে।
এরপর শিশুর প্রবল কান্না।।তিনপ্রস্থ টুপি সোয়েটার সহ তাকে কম্বল চাপা দিচ্ছে তার বাবা। মা ঘোর নিদ্রা মগ্ন। বাধ্য হয়ে বলি,টুপি গুলো খুলে দিন না।
পিতাটি অতঃপর তাকে কোলে নিয়ে পায়চারি করেন।দার্জ্জিলিং মেল ছুটছে নিজের গতিতে। বই থেকে মুখ তুলে দেখি সামনে শিশু কোলে পিতা...একগাল হেসে বললেন...। “আমার ছেলেটা না,বোঝলেন দারুণ ইন্টেলিজেন্ট!’ ‘তাই বুঝি?’
বিগলিত পিতা আরো গদগদ ‘হ্যাঁ...।জানেন  ,এ্যাতো ইন্টলিজেন্ট কি কমু..।।অয় না ... বকা দিলে্ ‌ভ্যাঁ কইরা কান্দে!”
 আমার  ট্রেনযাত্রা সার্থক! জয়তু অপত্য স্নেহ!

এবার ট্রেনভ্রমণের আরেক গপ্পো।সেবার জম্মু থেকে মা আর আমি ফিরছি কলকাতা। দীর্ঘ যাত্রা ।দিব্যি আলসেমি করে ,বই পড়ে সময় কাটছে।  দিল্লি থেকে সহযাত্রী হলেন ...হ্যাঁ।।এবার ও ওই শিশু সহ দম্পতি।এঁরা বেজায় খাদ্যরসিক।সঙ্গে প্রচুর খাদ্যসম্ভার, তদুপরি স্টেশন এলে প্রবল বেগে খাদ্য সংগ্রহ করছেন।পরোটা,আলুর দম, কেক,সিংগারা,কেলা,আপেল,ঝালমুড়ি,চাট...মুখ আর থামে না।ক্ষতি নেই,কিন্ত্যবছর দেড়েকের শিশুটিকেও তাঁরা বিরামহীন খাইয়ে চললেন। সে ও দিব্যি বাপ-মা-কা বেটা। খেয়েই চলল। এবং তারপর যা হবার তাই হল।।অবিশ্রান্ত বমি আর পটি। অকুতোভয় পিতা-মাতা বললেন।।‘কুছ নহি,ঠিক হো জায়েগা!’অতএব আহার বন্ধ হল না  । অক্লান্ত আপেল সিংগারা র সঙ্গে চলল অক্লান্ত বমি ইত্যাদি। ট্রেনের কামরার মধ্যেই।
বহুক্ষণ সহ্য করে বলি।।‘বহেনজি,ইসে থোড়া বাহার লে যাকে ,টয়লেট লে যাকে ধুলাইয়ে না!
আশ্চর্য হয়ে তাকান তার মা-জননী,এবং নিষ্কম্প উত্তর...। “ইয়ে মেরা রাজা বেটা হ্যায়।
এবং যা চলছিল চলতে থাকে!
সত্য সেলুকাস!

Friday, 6 May 2016

হস্টেল

হস্টেল -২
 ‘শোন,তোর হলুদ চুড়িদার সেট টা আজ আমি পড়ছি,তুই আমার ব্লু শার্ট টা পড়বি?’
জনা বারো সদ্য উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করা মেয়ে একইসঙ্গে দু-দশ দিনের তফাতে সেই হস্টেলে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে কারো বাড়ি দুর্গাপুর,কেউ এসেছে দিল্লি থেকে,কারু বা বাড়ি গৌহাটি,কেউ জামশেদপুরের ,আবার কেউ মালদা থেকে গেছে তো কেউ গেছে নাগপুর থেকে। কেউ কাউকে চেনে না,সব্বাই মা-বাবাকে ছেড়ে একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়চত্বরে ঢুকে পড়েছে...। ঠাঁই হয়েছে মেয়ে হস্টেলের একতলার ঘরগুলোতে।প্রত্যেকের বরাদ্দ একটি করে তক্তপোষ,একটি চেয়ার,দেরাজয়ালা টেবিল,একটি দেওয়াল আলমারি,আর টেবল-ল্যাম্প। তক্তপোষের নীচে স্যুটকেস-ব্যাগের অধিষ্ঠান। কিন্তু হপ্তা-খানেকের মধ্যেই দেখা গেল সুমিতার সাদা ওড়না রুমার গায়ে,পর্ণার সবুজ কুর্তা মৌরির এত পছন্দ যে সাত দিন ও ওটা পড়েই ক্লাসে গেল আর পর্ণা পরল রীতার চেক শার্ট। একা একা বড় হয়েছি।হস্টেলে গিয়ে নিমেষে সব নিজের হয়ে গেল। তক্তপোষে নতুন তোষকের ওপর নতুন চাদর,ঝকঝকে টেবল-ক্লথ,তার ওপর ফুলদানি,পাশে নতুন বইয়ের ভীড়।।দেওয়ালে সুন্দর পোস্টার ।ছবি,জানলায় হরলিক্স।কমপ্ল্যান। মাগে সাবান,টুথপেস্ট,ব্রাশ... আলনায় তিনজনের পোষাক-আশাক, মেয়েহসটেলের রূপ খুলে যায় বাসিন্দাদের গুণে।  সামনে করিডোরে সবেধন নীলমণি কালো টেলিফোন...।।যার ফোন আসে সেই ভাগ্যবানের নাম ধরে চিৎকার করার জন্য একজন অ্যাটেডেণ্ট আছেন...।রুম নাম্বার তেইশ...অদিতি ঘোষ।।ফোন আছে...।অদিতি দুরদুর করে দৌড়ে এল।।বাবা-মা ফোন করে নিশ্চিন্তি...মেয়ে ভাল আছে। তা বলে কি বাবা-মা-মাসি-পিসি ছাড়া ইস্পেশাল ফোন আসতনা কারু কারু? এতো মোবাইল ফোন না যে তথ্য গোপনীয় থাকবে! ল্যান্ডফোনে সবই ওপনীয়!!! ছ –নম্বর ঘরে সান্ধ্যকালীন আড্ডা হচ্ছে। সুমিতা ক্লাস শেষে কেলান্ত,পায়ের ওপর চাদর ফেলে শুয়ে।ওর পায়ের কাছে হেলান দিয়ে পাঞ্চালী যাকে পাঁচ বছর পাঁচু বলেই ডাকলাম,কাকলির সেমেস্টার সামনে।।ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে।। তাও আড্ডার গন্ধে চলে এসেছে বোর্ডে ফার্স্ট হওয়া মেয়ে।। সায়ন্তনীর লম্বা চুল আঁচড়াচ্ছে রূপা। টেপে পঙ্কজ উদাস মন  উ্দাস করা গান গাইছেন।। রত্নামালা র্যা কেট বাজিয়ে তাল দিচ্ছে।। মৈত্রেয়ী বকবক করতে করতে স্যুটকেস গোছাছছে...।বাইরে ঘোষণা হল ।।রুম নাম্বার নীপা চ্যাটার্জি...।ফোন!
আমরা চুপ হয়ে গেলাম।সবাই জানি এ ফোন যে সে ফোন নয়...বিশেষ ফোন।নীপা আমাদের সিনিয়ার।ইকনমিক্স পড়ে।মিলিটারি ব্যাকগ্রাউন্ড। প্রচন্ড স্পীডে,জোরে কথা বলে।।ওর প্রেমটাও খোলামেলা। রোজ চেঁচামেচি করে ঘন্টাখানেক বিএফ এর সঙ্গে ফোনালাপ করে..।।তারপর একহয় পড়তে বসে নাহয় ঘুরতে যায়।  মিলিটারি স্মার্ট মেয়ে। আমরা সতর্ক ।ফোনে কথা হইতেছে...আমরা শুধু এপারের কথা শুনিতেছি।
নীপাঃ‘আজ আর যাচ্ছি না’
এই ঘর থেকে পাঁচু জোরে জোরে বলল ‘কাল ঠিক যাবো’
নীপা ফোনেঃ হাউ সুইট!!!কি মিষ্টি!!!
রুমা আওয়াজ তুললো-  দুলালের তালমিছরি!  ভীমনাগের সন্দেশ, গাঙ্গুরামের রসগুল্লা...
নীপা ফোনেঃ ডোন্ট বি সিলি!
সুমিতা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে  চেঁচালো,বললোঃ  সিলি, ইডিয়ট,রাস্কাল,জোকার,ডাইনোসোরাস...
এত জোরে যে ফোনের অইপ্রান্তেও বোধহয় শোনা গেল... প্রেমিকযুগল এবার বিরক্ত হয়ে ক্ষান্ত দিল,আমরা ডিনার বেল পড়েছে।।খেতে চ...। বলে  নাচতে নাচতে ডাইনিং হলে  চল্লাম! সেখানে আর এক প্রস্থ কিছু হবে!সেইসব সুগন্ধ একদিনের জন্যও একলা হতে দেয়নি,দেয়ও না।
 সেই এক বিঘত জমি যা তারার মত জ্বলে...।পাখির পালক হয়ে সারাজীবন  উষ্ণতায় মুড়ে রাখে।

পাহাড়ের গপপো

পাহাড়ের গপ্পো
একরাশ মেঘ পরতে পরতে নেমে আসছে মাথার ওপর।ছড়িয়ে পড়ছে এই পাহাড় থেকে ওই পাহাড়।ঘন সবুজ বন ঢেকে যাচ্ছে মেঘে আর কুয়াশাতে।নাকের ডগা কনকনে ঠান্ডা ।মাথায় টুপি,গায়ে সোয়েটার, হাতমোজা,পায় উলের মোজার ওপর ভোসকা কেডস,  চলেছি তো চলেইছি।পাক বেয়ে বেয়ে ছ'সাত জনের টগবগে দল গান গেয়ে, নেচে কুঁদে ক্লান্ত হয়ে পড়ল।রাস্তা যেন ফুরায় না!পাহাড়ের এই মজা।কাউকে জিজ্ঞেস করলে বলে,থোড়া দূর।সামনে হায়।কোথায় থোড়া দূর?হাঁটতে হাঁটতে পা খুলে এল তবু তাহার দেখা নাই।দুপাশে পাইন আর সেডারের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ।ঠান্ডা নামছে আরো জমিয়ে।সোয়েটার কোটে ঠান্ডা বাগ মানছে না আর!যেমন বুদ্ধি তোদের!গাইড না নিয়ে কেউ আসে নতুন রাস্তায়? তারপর আবার পাহাড়।প্রায় কাঁদো কাঁদো শাওন বলল আমাকে এখানেই রেখে যা।ঠান্ডায় জমে পাথর হয়ে থাকি।ওমনি দূরে দেখি মিটমিট করে আলো জ্বলছে! চল চল পা চালা! ওমা।ছোট্ট কাঠের বাড়ি টি।সারা গায়ে আইভি লতা জড়ানো ।কাঠগোলাপ   জড়িয়ে উঠেছে টিনের চালায়।কাঠের বারান্দায় ছোট টেবিলে সাদা ডোমের আলোতে ছবির মতো বাড়ি।এই বুঝি আইভি কটেজ! সৃজার ছোড়দাদুর পুরোনো বাড়ি! যার খোঁজ করে এতদূর আসা!এখন আইভি কটেজ রেঁসতরা হয়েছে।তাও ভেতরে ছোড়দাদুর ছবি আছে তো!আমরা গোল হয়ে বসি টেবিল ঘিরে ।লাল টুকটুকে  টেবিলঢাকা।সোনালি নুন-মরিচ দান।চারদিকে রংবেরংয়ের থাংকা।চমৎকার সব চিনেমাটির কারুকাজ করা বাসন।দেখেই খিদে পায়।পাশেই রান্না ঘর।বেজায় ভালো সুরুয়া র গন্ধ ছড়াচ্ছে ।কম্বলের কোট পরে রাঁধুনী বসে আছেন সামোভারের পাশে।মনে মনে তার নাম দিলাম মোং।শরদিন্দু বাবু জিন্দাবাদ ।খানা মিলবে?মোং বললেন মিলবে।তিনি আর তাঁর বছর পনেরোর নাতি এই আইভি কটেজের রাঁধুনি কাম কেয়ারটেকার।বাইরে শীতের দাপট বাড়ছে।তারপর শুরু হল টুপুর টুপুর বৃষ্টি ।  আমরা গুটিশুটি হয়ে বসি।কি খাওয়াবে?আইভির স্পেশ্যাল চিকেন মোমো।সুরুয়া ।আলুকা পরাঠা।শুখা চিকেন।শেষপাতে মূলোর চাটনি।কাজুর হালুয়া।বড় বড় কাঠের বাটিতে গরম সুরুয়া এলে হাপুস হাপুস করে খেয়ে বাঁচি।মাথার ওপর টিনের ছাদে পাহাড়ি বৃষ্টি র শব্দ ।মোং বলল বড়া সাহেবের পিরেত আশেপাশেই থাকে ।মাঝেমাঝে দরজাতে টোকা মেরে যায়।কেন ?টোকা মারেন কেন?মোং খুব সিরিয়াস ।জানান দিয়ে যান উনি আছেন।সৃজা, মিতুল ভয়ে কাঠ।কাঁচের জানালায় ড্রাগন ছাপ পর্দা ।তার ফাঁকে বিদুৎ চমকানি দেখা যায়।সবাই আরো ঘেঁষাঘেঁষি করে বসি।মোং চা দিয়েছে।বলেছে রাততিরে এখানেই থেকে যেতে।দুটো ঘরে দিব্যি হয়ে যাবে।এই ঝড়জলের রাতে হোটেলে ফেরার গপ্পো ই নেই কোনো।তা বলে এই পিরেতের বাড়ি থুরি রেঁসতরা তে? কিন্তু উপায় নেই।কাজেই আমরা গোলগোল চোখে এদিক ওদিক দেখি।এখানে রুম হিটার নেই।মোং কাংড়ি জ্বেলে দেয়।বৃষ্টি কি বাড়লো?রূপা একা বাথরুমে যাবে না।আমি আর  নয়না দাঁড়িয়ে থাকি কাঠের বারান্দায়।বারান্দা র চারদিকে ছোট ছোট রঙিন বাটিতে সাদা হলুদ অর্কিড ।যেমন বৃষ্টি তেমন হাওয়া ।আধবোজা চোখে মোং বলে বড়া সাহেবের পিরেত বৃষ্টির রাতে সুরুয়া খেতে আসে।বলে দরজা খুলে একগামলা চিকেন সুরুয়া বারান্দা তে রেখে আসে।    তাতে বড় বড় চিকেনের টুকরো।আমরা কাঠ।সত্যি পিরেত আসবে?মোং নির্বিকার ।বড়াসাহেব সুরুয়া খেতে বহুত ভালোবাসতেন।আইভির সুরুয়া কত নাম করা।দূর দূর থেকে লোক আসে এখানে খেতে।সৃজার ছোড়দাদু মোং য়ের বড়াসাহেব পেশায় ডাক্তার বাবু ছিলেন।আর ছিলেন রান্না র শৌকিন ।যদদিন বেঁচে ছিলেন এই বাড়িতেই কাটিয়েছেন।এইরকম বৃষ্টির রাতে রোগী দেখতে গিয়ে তাঁর গাড়ি খাদে পড়ে যায়।
হঠাৎই দরজায় শব্দ হল।টুকটুক ।আমরা চমকে উঠি।কে?মোং মাথা নাড়ে ।ওই এলেন সাব।আমরা চোখ ঢাকি।অত ঠান্ডায় ঘেমে কুলকুল।রাতটা কাটলে হয়।কাংড়ি নিভে এল ।যে এসেছিল সে কে?সে কি গেল?কনকনে বিছানা ।পাশ ফিরতে ভয় হয়।নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকি।পিরেত যেন শুনতে না পায়।
সকাল হল জানলার ফাঁক দিয়ে ।একরাশ আলো বিছানা জুড়ে।হালকা রোদে গা মুড়মুড়ি দিচ্ছে মিঠে কুয়াশা।মোং য়ের নাতি চা করে এনেছে সাদার ওপর নীল ছবি আঁকা কাপে।একে কাল দেখিনি ।ঘুমাচ্ছিল বোধহয়।বৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই।আকাশ পরিষ্কার ।তুমুল নীল।সবুজ পাহাড় চারদিকে ।মিষ্টি ঠান্ডা ।লতা আর ফুলে ঢাকা ভারি মায়াবী কটেজটি।এতক্ষণে তাকে চোখ ভরে দেখি।মস আর ফারণে ঢাকা সবুজ গালিচা জেরেনিয়াম আর গাঁদায় ভরা বারানদা।মাথার ওপর রঙিন পতাকার সারি।হাওয়া য় দুলছে।পাশেই ছোট ঝোরা।তাতে বেশ নাদুসনুদুস এক পাহাড়ি মা ভৌভৌ দুটি গোলগাল ছানাপানা নিয়ে জল খাচ্ছে ।দেখে মনে হল আইভির সুরুয়া খেয়ে ই এত গোলগাল ।বৃষ্টির রাতে দরজা খুটখুট করবে না তো কি করবে?ভয় কোথায় পালিয়ে গেল।
মোং য়ের নাতি গরম রুটি ভেজে দিল। আলুর ছোকা দিয়ে খেতে যেন অমৃত।এবার ফিরবো।মোং কোথায়?তাকে দেখছি ন?
নাতিবাবু একগাল হেসে বললে দাদুর তো কবে ই ইনতেকাল হয়ে গেছে।তবে কিনা মাঝেমধ্যে ঝড়জলের রাতে এসে রান্না করে যায়।রাঁধতে বড় ভালবাসতো কিনা!

Monday, 18 April 2016

বসন্ত বিদেয়

বসন্ত বিদেয় হয়ে বোশেখের দিন আসতে চলল।হিসেব মত এখন উদাসী হাওয়া বওয়ার কথা।বদ্ধ বহুতলের চৌহদ্দি মধ্যে না টের পাই উদাসী হাওয়া, না টের পাই উতল হাওয়া ।ঝোড়ো হাওয়া বইলে অবশ্য আলাদা।তার দাপট উপেক্ষা করে কার সাধ্যি।
বাইরে উতল হাওয়া না বইলে কি হবে, ভিতর ঘরে হরেক কিসিমের হাওয়া পর্দা এলোমেলো করে ,ধূলো উড়িয়ে জিনিষপত্র ছড়িয়ে নিজের মত বয়েই চলে।বসন্ত র আগমন টের পেলাম না।যাওয়ার খবরও মিলল না।তবু নিয়মরক্ষে দোল,বসন্তোৎসব, রকমারি সেলফি, মালপো, সবই ফেবুর কল্যানে দেখা দিয়ে গেল।
ঋতুবদলের সবচেয়ে ভাল প্রমান মেলে হোর্ডিং এ।বরাবর চলে গেলে একটা না একটা তো চোখে পড়বেই।  শীত আসছে।অমুক ক্রিম গালে মাখো।বসন্ত আসছে?কোম্পানি নতুন লোশন নামিয়েছে।মাখলে বয়স বোঝা যাবে না।কিনে ফেলুন। রাস্তার মোড়ে করিনা কাপুর গাল ভেঙে ছুঁচলো মুখে মসৃণ ত্বকের বিজ্ঞাপন করছেন।আমার ঠাকুমা দেখলে বলতেন অরে দুগা ভাত দেওন লাগে।খাইতে পায় না নাকি! বোশেখের সূচনায় সে হোর্ডিং বদলে গেল।গরমের লোশন আলাদা।একি আমাদের মা কাকিমা দের যুগ যে সারা বছর বসন্তমালতী মেখে চলে যাবে?অথবা তুহিনা ? নাম গুলো মনে পড়লে মায়ের গায়ের গন্ধ পাই।শহরময় শপিং মল।চকচকে ঝকঝকে যক্ষপুরী যেন।নতুন নতুন ভোগবস্তুর বিপুল সম্ভার নিয়ে প্রলোভনের ডানা ছড়িয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে আলোঝলমলে অন্ধকারের দিকে।কেমন গা শিউরে ওঠে।সব চেয়ে বেশি আনন্দ নাকি হল শপিং মল হপিংএই।এত চকমকি তে নন্দিনী রা কোথায় হারিয়ে গেল।রাজাদের গলাটুকুও পাই না।বিশুপাগল গিটার কাঁধে মাচায় গান জুড়েছে।ওদিকে ছাত্র মার খাচ্ছে, মেয়ে পাচার হচ্ছে আর নাচার মুখে কেলাসে জেন্ডার স্টাডিজ পড়িয়ে নিজের কাঁধ নিজে চাপড়াচছি।নির্ভয়া বা তনু বা তাঁদের আগে পরে যে হাজার লক্ষ মেয়ে ধর্ষিত হলেন,হচ্ছেন,নারী শরীরসমূহকে কেন্দ্র করে যে নিগ্রহের প্রতিবাদ ঘটে চলে প্রতি নিয়ত, তাঁদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শরীর নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের আদিখ্যেতা টিভি সিরিয়াল, বিজ্ঞাপনে,সিনেমায়।অশালীন ভণ্ডামি । প্রকারান্তরে নির্যাতনে মদত যোগানো।তাও নির্বিবাদে ।একটি মেয়ে কে শাস্তি দিতে হবে?তাকে ধর্ষন করো।সব শেষ।তারপর সিরিয়ালের নায়িকা যার মাথা ভরতি সিঁদুর তাকে দেখিয়ে বুঝিয়ে দাও সতীত্ব কারে কয় ।সব মেয়ে ভয় পেয়ে যাবে।ছাত্র কে  জাতপাত নিয়ে ঠুকে দিও।ইমোশনাল অত্যাচারে আত্মহত্যা করবে।ফেবু তে কষ্ট পাওয়া কুকুরছানা দেখে মানবিক আচরণ বিধি নিয়ে নতুন করে আতংক  হয়।ঘেউ ঘেউ করেছে?ন তলার জানলা দিয়ে ফেলে দাও।কুকুর ছানা হয়েছে?বিষ খাইয়ে মেরে দাও।ছেলেটি তার নিজের কথা নিজের মতো করে বলেছে?মেরে কপাল ফাটিয়ে গারদে পোড়ো।তারপর ভীষণ ইন্ডিয়ান হয়ে খেলা দেখে পটকা ফাটিয়ে মলে যাবো সেলিব্রেট করতে।কানে ফোন ঝুলিয়ে ঘুরবো।আশেপাশে তাকাবো না।
না চাইলেও কথা কানে আসে।বসন্ত চলে যাচ্ছে ।ফোন কানে তরুণী  কাকে বলছে  আমার পোষাচ্ছে না।তুমি রাস্তা দেখো।বাহনচালক  ফোনে তার বউকে ধমকাচছে বেশী বাড়াবাড়ি করলে পিটিয়ে বার করে দেব।তরুন পথচারী ফোনে কাউকে বলছে আমার পক্ষে তোমার সঙ্গে চলা সম্ভব না।বৃদ্ধ বলছেন এবারও আসবি না?তোর মা র শরীর ভালো নেই।অফিসার বলছেন আমার প্রতিটি মিনিট দামী! !!এত রুক্ষতা ছড়িয়ে আছে সভ্যতার পরতে পরতে,বসন্ত এলেই কি গেলেই কি?শপিং মল তো থাকবে!সত্যি বলছি।ভাবতে ভয় হয়।

Sunday, 17 April 2016

প্রথম পাঠ

আমি তোমার গান তো গাই নি...
প্রথম যখন হস্টেলে যাবার কথা হল তখন সদ্য আঠেরো ।বিশাল ক্যাম্পাস ।নতুন ক্লাসে নামী অধ্যাপক ।প্রথম বাবা মা কে ছেড়ে থাকার ধুকপুকানি ।হস্টেল পেতে চার পাঁচ মাস লেগে গেল।জেঠূর বাড়ি তে থেকে সদ্য স্বাবলম্বী হচ্ছি ।ছেড়ে যাওয়া শহর টিকে নতুন করে চিনছি।বাইরে অনেকে ভয় দেখাচ্ছে ।।ঐ হস্টেলে থাকবি?ওখানে মেয়েরা সিগারেট খায় ।তরল ও চলে।ভীষণ খারাপ।থাকতে পারবি না।র‍্যাগিং হবে সাংঘাতিক।মেয়েদের খারাপ হওয়ার সংজ্ঞা তো ওরকমই ।
নানা ভয় নিয়ে হসটেলে ঢুকে পাঁচটি বছর যাদের সংগে হেসে খেলে কাটিয়েছি তারা কেউ সিগারেট খেত না।তরল ও নয় ।আমার প্রথম রুম-মেট রত্নামালা রাও পদার্থ বিজ্ঞান এর ছাত্রী ।দারুণ ব্যাডমিনটন খেলোয়াড় । একদম নিরামিষাশী ।রীতা র সংগে পরিচয়ে জানলাম ওর বাবা আর আমার জ্যাঠতুতো দাদা ভারতীয়-বিমানবাহিনীতে একসাথে কাজ করেন।সকালে এক সংগে চা খাই ।পড়তে বসি।বাথরুমে লাইনে র ভয়ে সকালে স্নান।  ।স্নান ঘরে গান আমার হবি।পাশের স্নানঘর থেকে বিশেষ বিশেষ গানের ফরমাশ আসে।বিকেলে টিটি খেলা।সন্ধ্যা হলে আডডা।রুম সরগরম চুল বাঁধা,ক্রিম ঘষার সঙ্গে হিহিহাহা।পড়তে বসতে রাত দশটা ।একটা-দুটোয়,ঘুম।হস্টেল ও আর একটা বাড়ি হয়ে গেল । সে সময় টা বড় অনাবিল ছিল।গানে আর গল্পে ,পেছনে লাগায় জমজমাট ।মেহেদী হাসান।জগজিৎ-চিত্রা সিং এ ,রবীন্দ্রসঙ্গীতে,লতাজিআশাজীতে ভরপুর ।বাইরের লোক না জেনে যে কত বাজে বকে!হ্যাঁ,দুচারজন এদিক ওদিক তো ছিল বটেই,তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাতাম না।সব্বাই মিলে টিভি-রুমে চিত্রহার দেখার মজাই ছিল আলাদা।।মন্তব্য আর ফোড়নে সরস।বাড়ির জন্য মন কেমন? বন্ধুরা সব ভুলিয়ে দিত।হস্টেল নিয়ে প্রায় একটা বই লিখে ফেলা যায়।রত্নামালাকে একদিন না বলে মাংসের চপ খাইয়ে দেওয়া হয়েছিল।জানতে পেরে তার কি বমি!আমরাই ডাক্তারের কাছে ছুটি তখন। আমাদের সেই একতলার সারি সারি ঘরে এখন যারা থাকে তারাও বুঝি ওমনি মজা করে! সোমা গৌহাটির মেয়ে।উড়োজাহাজে আসত। সে আমার পরবর্তীর রুম-মেট।বস্তুত তার দৌলতেই আমার গজল প্রীতি তৈরী হল। কত সন্ধ্যে যে কেটে গেছে মেহেদী হাসান ,তালাত আজিজ,ফরিদা খানুম্‌, গুলাম আলি, পিনাজ মাসানি শুনে শুনে!সোমার পিসতুতো দিদি বিখ্যাত গায়িকা।তিনি তখন মুম্বাইতে ।জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ।‘সোমা,আমরা দেখবো। কি আবদার!! যেন গান নয়,দেখাটাই দরকারি!চলো দেখতে।সেই মৃদুভাষিনী ,সুকন্ঠী,গায়িকাকে দেখে আমরা মুগ্ধ! !একজন তো বলেই ফেললো ‘ইস দিদি!আপনি কি ভালো টানেন!’ গায়িকা চমতকৃত! ‘এ কি টুলে! তোমার বন্ধু কি বলছে? আমি কি গাঁজা সেবন করি?’বলেই মিষ্টি হাসি! সোমার সঙ্গে হস্টেল-জীবনের পাঁচ বছর তরতর করে কেটেছে...এক সঙ্গে বি।সি।এল।,ন্যাশনাল লাইব্রেরি,ইউসিজ...ফিল্ম,নাটক।।তখন বুঝিনি ওর অভিজাত মনের পেছনে কি ভয়ানক অসুখ দানা বাঁধছে!  হস্টেলের পাট সেরে চাকরিতে ঢুকে মাকে নিয়ে গৌহাটিতে গিয়ে খুঁজে পেতে তার বাড়ি আবিষ্কার করি...সোমা তখন স্কিজোফ্রিনিয়ায় আক্রান্ত...মারাত্মক মোটা হয়ে গেছে ওর ছিমছাম শরীর।মন সম্পূর্ণ ভার সাম্যহীণ। আমাকে দেখে কি হাসি!।।হাসি যে  কত বেদনার হয় তাও জানা হয়ে গেল। সোমার সেই দিদি।।আরতি মুখার্জি।।আজও তাঁর কন্ঠ শুনলে আরো অনেকগান মনের মধ্যে তোলপাড় করে।

হস্টেল বালিকারা

হস্টেল -২
 ‘শোন,তোর হলুদ চুড়িদার সেট টা আজ আমি পড়ছি,তুই আমার ব্লু শার্ট টা পড়বি?’
জনা বারো সদ্য উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করা মেয়ে একইসঙ্গে দু-দশ দিনের তফাতে সেই হস্টেলে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে কারো বাড়ি দুর্গাপুর,কেউ এসেছে দিল্লি থেকে,কারু বা বাড়ি গৌহাটি,কেউ জামশেদপুরের ,আবার কেউ মালদা থেকে গেছে তো কেউ গেছে নাগপুর থেকে। কেউ কাউকে চেনে না,সব্বাই মা-বাবাকে ছেড়ে একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়চত্বরে ঢুকে পড়েছে...। ঠাঁই হয়েছে মেয়ে হস্টেলের একতলার ঘরগুলোতে।প্রত্যেকের বরাদ্দ একটি করে তক্তপোষ,একটি চেয়ার,দেরাজয়ালা টেবিল,একটি দেওয়াল আলমারি,আর টেবল-ল্যাম্প। তক্তপোষের নীচে স্যুটকেস-ব্যাগের অধিষ্ঠান। কিন্তু হপ্তা-খানেকের মধ্যেই দেখা গেল সুমিতার সাদা ওড়না রুমার গায়ে,পর্ণার সবুজ কুর্তা মৌরির এত পছন্দ যে সাত দিন ও ওটা পড়েই ক্লাসে গেল আর পর্ণা পরল রীতার চেক শার্ট। একা একা বড় হয়েছি।হস্টেলে গিয়ে নিমেষে সব নিজের হয়ে গেল। তক্তপোষে নতুন তোষকের ওপর নতুন চাদর,ঝকঝকে টেবল-ক্লথ,তার ওপর ফুলদানি,পাশে নতুন বইয়ের ভীড়।।দেওয়ালে সুন্দর পোস্টার ।ছবি,জানলায় হরলিক্স।কমপ্ল্যান। মাগে সাবান,টুথপেস্ট,ব্রাশ... আলনায় তিনজনের পোষাক-আশাক, মেয়েহসটেলের রূপ খুলে যায় বাসিন্দাদের গুণে।  সামনে করিডোরে সবেধন নীলমণি কালো টেলিফোন...।।যার ফোন আসে সেই ভাগ্যবানের নাম ধরে চিৎকার করার জন্য একজন অ্যাটেডেণ্ট আছেন...।রুম নাম্বার তেইশ...অদিতি ঘোষ।।ফোন আছে...।অদিতি দুরদুর করে দৌড়ে এল।।বাবা-মা ফোন করে নিশ্চিন্তি...মেয়ে ভাল আছে। তা বলে কি বাবা-মা-মাসি-পিসি ছাড়া ইস্পেশাল ফোন আসতনা কারু কারু? এতো মোবাইল ফোন না যে তথ্য গোপনীয় থাকবে! ল্যান্ডফোনে সবই ওপনীয়!!! ছ –নম্বর ঘরে সান্ধ্যকালীন আড্ডা হচ্ছে। সুমিতা ক্লাস শেষে কেলান্ত,পায়ের ওপর চাদর ফেলে শুয়ে।ওর পায়ের কাছে হেলান দিয়ে পাঞ্চালী যাকে পাঁচ বছর পাঁচু বলেই ডাকলাম,কাকলির সেমেস্টার সামনে।।ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে।। তাও আড্ডার গন্ধে চলে এসেছে বোর্ডে ফার্স্ট হওয়া মেয়ে।। সায়ন্তনীর লম্বা চুল আঁচড়াচ্ছে রূপা। টেপে পঙ্কজ উদাস মন  উ্দাস করা গান গাইছেন।। রত্নামালা র্যা কেট বাজিয়ে তাল দিচ্ছে।। মৈত্রেয়ী বকবক করতে করতে স্যুটকেস গোছাছছে...।বাইরে ঘোষণা হল ।।রুম নাম্বার নীপা চ্যাটার্জি...।ফোন!
আমরা চুপ হয়ে গেলাম।সবাই জানি এ ফোন যে সে ফোন নয়...বিশেষ ফোন।নীপা আমাদের সিনিয়ার।ইকনমিক্স পড়ে।মিলিটারি ব্যাকগ্রাউন্ড। প্রচন্ড স্পীডে,জোরে কথা বলে।।ওর প্রেমটাও খোলামেলা। রোজ চেঁচামেচি করে ঘন্টাখানেক বিএফ এর সঙ্গে ফোনালাপ করে..।।তারপর একহয় পড়তে বসে নাহয় ঘুরতে যায়।  মিলিটারি স্মার্ট মেয়ে। আমরা সতর্ক ।ফোনে কথা হইতেছে...আমরা শুধু এপারের কথা শুনিতেছি।
নীপাঃ‘আজ আর যাচ্ছি না’
এই ঘর থেকে পাঁচু জোরে জোরে বলল ‘কাল ঠিক যাবো’
নীপা ফোনেঃ হাউ সুইট!!!কি মিষ্টি!!!
রুমা আওয়াজ তুললো-  দুলালের তালমিছরি!  ভীমনাগের সন্দেশ, গাঙ্গুরামের রসগুল্লা...
নীপা ফোনেঃ ডোন্ট বি সিলি!
সুমিতা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে  চেঁচালো,বললোঃ  সিলি, ইডিয়ট,রাস্কাল,জোকার,ডাইনোসোরাস...
এত জোরে যে ফোনের অইপ্রান্তেও বোধহয় শোনা গেল... প্রেমিকযুগল এবার বিরক্ত হয়ে ক্ষান্ত দিল,আমরা ডিনার বেল পড়েছে।।খেতে চ...। বলে  নাচতে নাচতে ডাইনিং হলে  চল্লাম! সেখানে আর এক প্রস্থ কিছু হবে!সেইসব সুগন্ধ একদিনের জন্যও একলা হতে দেয়নি,দেয়ও না।
 সেই এক বিঘত জমি যা তারার মত জ্বলে...।পাখির পালক হয়ে সারাজীবন  উষ্ণতায় মুড়ে রাখে।

হস্টেলের গান

হস্টেল-৩।।গান তুমি হও মেঘলাদিনে।।
ডাইনিং হলে খাবার পরিবেশনের দায়িত্বে ছিল বিমলদা আর কমলদা।না,এরা দুই ভাই নয়।সহকর্মী।পরিবেশনে বিমলদা বেশ কিপ্টে ছিল।মাছের ঠিকঠাক টুকরো তার হাত থেকে পাওয়া খুব কঠিন।কমলদা সে তুলনায় ভাল।কখোনো কখোনো পেটিটা দিয়ে দেয় বা একটু বেশী আলুভাজা। বিমলদার কাছে চাইলে বলে।।নেই ,কখন ফুরিয়ে গেছে!!! একবার প্রেপ-লিভে দেরী করে খেতে গিয়ে দেখি মাছ নেই।কি খেয়াল হল আমার আর সোমার...।চল তো কিচেনে গিয়ে দেখি!!পেছনের দরজা দিয়ে কিচেনে গিয়ে দেখি ধামাচাপা দেওয়া খাদ্যবস্তু।।ইলিশ মাছের দশ বারোটি পেটি আলাদা করে রাখা,কাদের জন্য বলা বাহুল্য।আমি আর সোমা চুপচাপ দুটোবাটি নিয়ে খেতে বসলাম।স্নান করে এসে বিমলদার কি রাগ!!কেন তোমরা কিচেনে গেছিলে??? কি মুশকিল,ইলিশ মাছ খাবার সময় কেউ কথা বলে? তারপর থেকে ইচ্ছে করে দেরিতে খেতে যেতাম আর কিচেনে হানা দিতাম।
সেই হস্টেলবাসিণী হয়ে প্রথম বাজার করতে শেখা।প্রতিমাসে দুজন মেস ম্যানেজার।আগের রাতে মেট্রন শোভাদির কাছে গিয়ে মেনু ঠিক করা। শোভাদির ঘরটি বিশাল বড়।বিধবা।রোগা...।সাদা কাপড়।সুন্দর গুছিয়ে মেনু ঠিক করে দিতেন।ঘরে ভারি মিষ্টি একটা ধূপের গন্ধ পেতাম।পরিষ্কার,ঝকঝকে কিছু পিতলের বাসন উপুর করে রাখা থাকত। আমার খুব পছন্দ ছিল এই অ্যাম্বিয়েন্স। মেস-ম্যানেজার হয়ে আমরা কই-মাছ থেকে শুরু করে পাবদা-মাছ পর্যন্ত খাইয়ে ছিলাম।নতুন বাজার করতে শেখা!!! না,না,মাথায় করে বাজার করতে হত না। শুধু বাজারে গিয়ে দেখে-শুনে বলতে হত।কমলদারা সঙ্গে যেত। আমরা হিসেব রাখতাম আর তাতেই নিজেদের বেশ বড়-বড় মনে করতাম।দিনের শেষে শোভাদিকে হিসেব দিতে হত...একমাস করে  সবার এই দায়িত্ব পড়ত।
সোমা একটু দেরিতে হস্টেলে এসেছিল। ছিপছিপে লম্বা।। ফরসা।ছোটো করে কাটা চুল।আমার সঙ্গে প্রথমেই ভাব হয়ে গেল গানের দৌলতে। তারপর একসঙ্গে অতদিন...কত তর্ক, ভাব-অভাব। বস্তুত সোমা আমাকে বাঙ্গালীয়ানার বাইরে অনেকটা টেনে বার করেছে। বহু হিন্দি-উর্দু বন্দিশ শুনেছি ওর কাছে।।বাংলা-ইংরিজি গানের বাইরের গান হহু করে ভাসিয়ে নিয়ে যেত। আমি ওকে বাংলা গানের জায়গাটা দেখাতাম,সেটাতে ও দুর্বল ছিল। ও গাইত যত ভাল,তার চেয়ে ও ভাল সমঝদার ছিল গানের...এটা খুব দুর্লভ ব্যাপার। হস্টেলের ঘরের পেছনে একচিলতে জমিতে পাতাবাহার গাছে বৃষ্টির ফোঁটা ,সবুজ-হলুদ-সোঁদা গন্ধে মেশানো অনেক সন্ধে কেটে গেছে ।।ভূপিন্দরের গলা গম গম করছে স্টিরিওতে্‌, হ্যাঁ,আমরা বলে-কয়ে স্টিরিও এনেছিলাম হস্টেলে...জানে ইয়ে মুঝকো ক্যা হো রাহা হ্যায়! পাখার বাতাসে মৃদু আলস্য...দমকা রুম-ফ্রেশ্নারের হাওয়া...ঘরের এক কোনে হিটারে কফির জল গরম হচ্ছে।।কে বানাবে? তুই না আমি? কেন,রোজ কেন আমি/আজ তুই।সোমা কিছুতেইকাজ করবে না।বাড়িতে ওকে কেউ কাজ করতে বলে না। খুব রেগে গিয়ে আমি বল্লাম –এটা বাড়ি না,আর আমরা কেউ কাপূরথালার রাজকন্যে না। আজ তুই ই বানাবি।ব্যস ।মুখ গোমড়া।গান শেষ।। কথা নেই।  কাটল কিছুক্ষন...তারপর ডিনার।।সেও নির্বাক গেল...দাঁত মাজা হল...কমপ্লান ঘোটা হল.. বই নিয়ে বসলাম ।তারপর গুটিগুটি তিনি এসে দাঁড়ালেন...।।নীল ডায়মন্ডের রেকর্ডটা শুনবি?ব্যস...।তোলা থাকল কোলরিজের কাব্য...আবার সুর ভর করল ঘাড়ে। গান শুনতে শুনতে ঘুম। ঘুম ভাঙ্গল এক ঝাঁকুনিতে... আরেক রুম-মেটের মা এসেছেন। ঘরে তিন খানা মশারিতে তিনজন তখোনো নিদ্রামগ্ন। তিনি ভুল করে শর্মি ভেবে আমাকে হ্যাঁচকা টান মেরে উঠিয়ে বললেন... টিউটোরিয়ালে কত পেয়েছিস? আমি হতভম্ব...কিন্তু মনে পড়ল ...হ্যাঁ,টিউটোরিয়াল আছে তো! থ্যাঙ্কিউ মাসিমণি!!!

হস্টেল আর আডডা


টুপটাপ জল পড়ছে মাথার ওপর বিশাল গাছটা থেকে,দুটো ক্লাস অফ,বৃষ্টি ধরেছে কিন্তু টুপ্টুপানি থামেনি।সোমা আর অনুরাধা হস্টেলের রাস্তা দিয়ে ফিরছে...হঠাত সোমা বললো।।চল,বাবলুদা’র কাছে যাবি? তিনি আবার কিনি? সোমার বাড়ির অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে...।সোমার দিদি দোলাদি।।অসম্ভব সুন্দরী।সাধারণ বাঙ্গালী ঘরে অমন সুন্দরী দেখা যায় না।মোম পালিশ গাত্রবর্ণ।লম্বা ৫’৫,দেখেই সবাই ফ্ল্যাট।সমস্বরে  বললাম...তোর দিদির পাশে দাঁড়াব না,আমাদের কাজের লোক মনে হবে ।তাকে চিনি। আরতিদি এসেছেন মুম্বাই থেকে।তাঁকে গিয়ে বলে এসেছি...আপনি লতা-আশাকে চেনেন? দেখেছেন?আর মিছরির মতো ধমক খেয়েছি।।‘ছি ছি।।বলো লতাজি-আশাজি...ওঁরা কি তোমাদের ক্লাসমেট যে লতা-আশা বলছো?’ আরতিদির ঠিক পরের বোন এবং তাঁর বর মাঝে মাঝে হস্টেলে আসতেন ওঁদের গাড়ি নিয়ে আর আমাদের গুটি কয়েকজনকে নিয়ে বেড়াতে যেতেন,প্রভূত ভালো ভালো খাওয়াতেন মোকাম্বো,ওয়ার্লডর্ফ, জিমি’স কিচেন এমনকি গঙ্গার ধারে গে-তেও। দিদি আর দিলীপদাকে ও তো চিনি।বাবলুদাটি আবার কে?  সোমা হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল।কোথায় যাচ্ছিস? সোজা লিফটে নিয়ে তুলল আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের চারতলায়।।এইছ।ও।ডি।।সমরেশ মুখোপাধ্যায়...।সোমার বাবলুদা এবং আমদেরও। আড্ডা খুব জমে গেল কারন বাবলুদার মতো রসিক পণ্ডিত সংসারে বিরল,অরণ্যেও।
আডডা আমার মতে বেশ কয়েক প্রকার এক হোলো অলস আড্ডা। গান চলবে।শুনব কিন্তু শুনব না। কথা হবে কিন্তু হবে না,প্রচুর বাজে বকা হবে, অবান্তর আলাপ-প্রলাপ হবে..এ হল নার্ভ ঠান্ডা করার আড্ডা।  নার্ভ চাঙ্গা করার জন্য চাই বৈঠকি আড্ডা,তাকে মজলিশি আড্ডাও বলা যায়।।সেখানে মূল উপজীব্য হল গান।।।এছাড়া আছে ডেস্ট্রাকটিভ আড্ডা...চূড়ান্ত পি।এন পিসি,মানুষজনকে ছারখার করে দেওয়া আড্ডা।আছে আরো। তাকে কেউ কেউ ইন্টেলেকচুয়াল আড্ডা বলে বটে কিন্তু আমি বলি কন্সট্রাকটিভ আড্ডা।এটা হল প্রাণদায়িণী আড্ডা...কত নতুন নতুন চিন্তাভাবনা! এরও  পর আছে ডি-কন্সট্রাকটিভ আড্ডা। বাবলুদা আমাদের সেই আড্ডার অংশীদার হলেন...গান্ধী থেকে মার্ক্সবাদী,নারীবাদ থেকে সাম্যবাদ,সবক্ষেত্রে অবাধ বিচরণ।। আমরা সদ্য কামু-কাফকা-সার্ত্র-সিমোন পড়ুয়ারা তর্ক করার দুরন্ত প্ল্যাটফর্ম পেলাম। সাহিত্য,গান,নাচ,ফিলিম,নাটক...বাবলুদা,ছোটখাট মানুষটি বিধ্বংসী কথা বলে লড়িয়ে দিতেন। অচিরেই তাঁর বাড়িতে নেমন্তন্ন পেলাম।ভবানীপুরে ইন্দিরা সিনেমাহলের পাশের গলিতে ছোট্টো বাড়িতে   থাকতেন বাবলুদা আর সুমিতাবৌদি। সুমিতাবৌদি নীলতরতন সরকারের নাতনী,ঈশান স্কলার,পেশায় সার্জন, চমতকার গানের গলা। ইন্দিরা তে ছবি দেখা মানেই ওদের বাড়িতে আড্ডা আর ভোজন। বাবলুদা ইউনিভার্সিটিতে দুটো ক্লাস নিয়ে বাড়ি ফিরে পায়ের ওপর পা তুলে গপ্পো করছেন,আর সুমিতা বৌদি অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে রেশন তুলে,আমাদের জন্য ফুলকপির সিঙ্গারা ভাজছেন...।সঙ্গে চা,কফি।। তারপর টিকিট কেটে আমাদের হলে বসিয়ে আসাও তাঁর ই কাজ,বাবলুদার বক্তব্য ওরা ডিনার করে যাবে... বৌদি ফুলকপি দিয়ে পাব্দা মাছে ঝোল রেঁধে রেডি!সেই অতি ছোট বাড়িটির ,সত্যি একচিলতে বারান্দার মতো সরু ,সুসজ্জিত বসার ঘরটিতে কত গল্প আর গানের স্রোত বয়েছে! একবার তো কয়েকজন থেকেই গেলাম রাতে।ফোন করে বাড়িতে,হস্টেলে জানাবার দায়িত্ব ওঁদের।ঢালা বিছানা হল মাটিতে। সারা রাত গপ্পো।সকালে লুচি-কালোজিরে দেওয়া আলুর ছেঁচকি খাইয়ে বৌদি ছাড়লেন। ইদানীং যে সব বিষয় নিয়ে দেওয়াল লিখন,ভিডিও পাঠ হয়,আমরা সেসব নিয়ে তখনো আলোচনা করতাম।কোনো অসুবিধে হয়নি।শুধু মা শুনে ফোনে বলেছিলেন ‘তোরা পড়িস  কখন?’
বাবলুদা প্রবল প্যাট্রিয়ার্ক।।বাড়ির কোনো কাজ করেন না।আমরা সদ্য অর্থ,পরমা ,আঙ্কুশ দেখার দল বিস্তর ঝগড়া করি। বৌদি অসীম দক্ষতায় মেডিকাল কলেজ,রোগী, সংসার,ছেলে মেয়ে সামলান। বাবলুদা বেতের চেয়ারে বসে সব নস্যাৎ করেন। এরকম অনেক দিনের গপ্পো জমা হয়ে আছে...।ভবানীপুরের সেই ছোটো বাড়ির একচিলতে খাবার ঘরের।।
অনেকদিন পর, তখন মালদায় চাকরি করছি...সংসারটিতে বিচ্ছেদের খবর পেলাম।মন খারাপ না। অনেক ছবি যেন ফালা ফালা হয়ে ছিঁড়ে গেল। প্রখর, তীব্র কোনো তরবারি টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে নরম পালক...একটা ছবি রয়ে গেছে। বসার ঘরে প্রবল গল্প করছি আমরা। বৌদি মাঝে মাঝে খাদ্য সরবরাহ করে চলেছেন। ওঁদের মেয়ে ডোনা আসছে যাচ্ছে। ছেলে ঋজু অর্ধেক বইতে,অর্ধেক আমাদের গল্পে। সে তখোনো হাফ-প্যান্ট। আসার সময় হাত নাড়ছে সবাই... বাবলুদা,বৌদি,ডোনা,ঋজু...।বৌদি বলছেন ‘বাসে তুলে দেব?’
সেসব ছবি মোছে না কখোনো।
ভালো কথা...।ঋজুর ছবি ‘চতুষ্কোণ’ এবার জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছে।

হস্টেল এবং তিনি

হস্টেল৫......মেয়েরা এবং তিনি।।
একদিকে একটা চারতলা ইমারত,মাঝখানে ছোট্ট চাতাল, তার ওপাশে নতুন বাড়ি।ছোট একফালি বাগানও আছে। আর সারা জায়গাটাই মেয়েদের দখলে,রান্নাবান্নার দাদারা ছাড়া।দোতলা,তিনতলা ইত্যাদিতে সিনিয়ার মেয়েদের জায়গা,ফার্স্টিয়ারের জন্যে একতলা।এতগুলো মেয়ে একসঙ্গে থাকলে কতকিছু হতে পারে! এমনকি হস্টেলে জায়গা কম পড়লে পাশের গেস্টহাউস দখল করার মত বীরাঙ্গনারাও ছিল। তাদের দৌলতে অতিথি-আবাসে গিয়ে দেখি ।।ওরে বাবা,এ তো স্বপ্ন...মখমলী বিছানা,তেমনি পর্দা,ঢাঊশ নরম সোফা,মনোহর বাথরুম...।সেখানে আড্ডা মারাটাও বেশ স্বপ্ন স্বপ্ন।।কারণ সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় নি,মাস কয়েক বাদেই নতুন বাড়ি বানিয়ে বীরাঙ্গনাদের স্থানচ্যুত করা হয়েছিল।।কিন্তু গেস্ট-হাউসে একটা ভারী ভালো বয়েল্ড স্যালাড পাওয়া যেত...।আলু,বিণস,গাজর,মটরশুঁটি,বীট,সেদ্ধ,কিছু চিকেন সেদ্ধ...গোল-মরিচ ছড়ানো।যেদিন আমাদের একটু স্বাস্থ্যকর খানার ঝোঁক হত...বা অসময়ে খিদে পেত।।এই খাদ্যটি খুব কাজে দিত।
যা বলছিলাম...।।এই এত্ত মেয়ে...কেউ লম্বাচুল,কেউ বয়েজকাট ,কেউ শান্ত,কেউ দুর্দান্ত,কেউ চরম লাজুক কেউ চরম ফাজিল।।কেউ ভোর পাঁচটা তো কেউ সকাল নটা...। কেউ নরম তো কেঊ গরম...রুমা যা কেনে সব ডজন হারে...।গরিয়াহাট থেকে একডজন রুমাল,একডজন নাইটি,একডজন কলা,একডজন ক্লিপ, এক ডজন সাবান...।উর্মিলা জামাকাপড় কাচে না...ঘেমো জামার ওপর পার্ফ্যুম স্প্রে করে দুমদাম বেরিয়ে যায়,গন্ধে তিষ্ঠোতে পারি না। সে আরেক কাহিনী।শর্মি খুব পড়ুয়া,সকালে উঠে আগে স্টেটসম্যানের এডিটোরিয়াল পড়ে...উর্মিলার তখন মাঝরাত।।রত্না খেলা পাগল...। রীতা এয়ার-ফোর্স নিয়ে অবসেসড।কুমকুমদি মাথার দুপাশে ক্লিপ দিয়ে বেগুনী হাউসকোট পরে বনলতা সেনের মত চোখ তুলে তাকায় ...রুপাদি ভীষণ ভালো দিদি... স্বাগতা জামশেদপুরে প্রেমিক কে ছেড়ে এসে মনখারাপ।।সুমিতা অতি শান্ত,জয়শ্রী ছটফটে...সোমা রাত জাগে,অত্রি ভোরে হাঁটতে যায়...।এত রাশি রাশি অমিলের মধ্যে এক টা হাইয়েস্ট কমন ফ্যাক্টর ছিল...।তাঁর ব্যাপারে সমস্ত হস্টেল-বাসিণী এক হয়ে যেত।।তাঁর সুখে সবাই আনন্দিত,দুঃখে দুঃখিত,...।তাঁর সাফল্যে সবাই উচ্ছসিত।।তাঁর পরাজয়ে সবাই ম্লান... তাঁকে দেখলে সবাই মুগ্ধ, দুই বিল্ডিং মিলিয়ে এমন কেউ নেই যে তাঁর খবর রাখে না...তিনি শ্রীল শ্রীযুক্ত বাবু .........।।খেয়াল করলে দেখেছি এই ভদ্রলোকের একটা জাদুকরী প্রভাব কাজ করতো হস্টেলে ,যেমন আরো পাঁচজায়গাতে করে আর কি। এটা টের পাওয়া যেত চিত্রহার দেখার সময় বা রবিবারের হিন্দি ছবির প্রদর্শণীর তুমুল আনন্দকালে কারন তখনো চ্যানেলের বারোয়ারীক্ষেত্র খুলে যায় নি। বুধবার আটটায় যদি একবার ও তাঁর লম্বাপানা মুখ টিভিতে আসত...আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।টিনের সারি সারি চেয়ার টিভি-রুমে। বুধবার আটটায় তিল ধারনের জায়গা নেই...শাড়ি,হাউস-কোট,চুড়িদার,সালোয়ার,স্কার্ট।।জিন্স,হাতে বই,
মুখে ক্রীম,সবাই হাজির।  চিত্রহার শুরু
বিজ্ঞাপন..উফফফফ,আবার!অসহ্য!!
শশি কাপুর-জিণৎ আমণ ,সত্যম শিবম সুন্দরম।।চলো দেখে নিচ্ছি
মিঠুন চক্রবর্তি এলেন ডিস্কো ডান্সার হয়ে...এ মাগো!ছি!!!
শ্মমীকাপুর-শর্মিলা...।আবার বেবুন টা এসেছে!!
শেষের দিকের রাজেশ খান্না এলেন।কাকু বাড়ি যাও’!!
হঠাত অপার নৈঃশব্দ...
সম্মিলিত আওয়াজ......।উউউউউউউউউউউউউ
তিনি এসেছেন...দেখেন নি,তাও জয় করেছেন...
ইয়েসসসস। তিনি জয়,তিনিই বিজয়।।তিনি বাবু অমিতাভ বচ্চন।তাঁর নামে সব অমিল ,শক হুণ,পাঠান,মোগল এসে টিভি রুমে মিলে গেছে...কি কপাল ভদ্রলোকের!!!যখন পেটে চোট পেয়েছেন তখন কেউ কেউ পূজোও দিয়েছিল,উপোষ করেছিল কি না জানিনা। তবে ইন্টেগ্রেটিং ফ্যাক্ট্রর হিসেবে হস্টেলে তিনি অব্যর্থ!!!যখন বিস্তর আজে বাজে ছবি করছেন,চেহারা অস্তমিত ,তখন মনে মনে বলছি।। ‘দাড়ি রাখুন স্যর,দাড়িটা রাখুন,ছক পালটে যাবে’। কালে কালে তাই ই হল তো!!এখনো কেমন দাপিয়ে ব্যাটিং করছেন!
কিন্তু চিত্রহার বা অই জাতীয় কিছু আর দেখি না। বাড়ির এল ইডি তে হস্টেলের উউউউউউউউউউউউউউউউউউউউউউ টা শুনতে পাইনা যে!

হোসটেল দিন আবার

হস্টেলদিন আর ম্যাগির মায়া
দিন কয়েকের ভ্যাপসা গরমে নাজেহাল হতে হতে ভাবছিলাম একটু বৃষ্টি পেলে কেমন আহ্লাদে গলে জল হয়ে যাই আমরা। মন ভালো হয়।শরীর ঝরঝরে লাগে,বেশ নতুন নতুন গপ্পো তৈরি হয়...গুনগুন করে গান... কিন্তু তেমন করে বৃষ্টিতে ভেজা হয় না আর।  ক্লাস থেকে হস্টেলে ফিরতে যেমন চুপড়ি হয়ে ভিজে আসতাম...,। ক্যাম্পাসের মধ্যেই তো হস্টেল...কি হবে ছাতা নিয়ে! তাই বৃষ্টিতে অপলক ভেজা... দীঘির পাশের রাস্তা,যেটাকে আমরা বলতাম সিলসিলার রাস্তা...তেমনি দুধারে লম্বা গাছেদের সারি।।ভিজে রাস্তা।।যেন এই মাত্র মেঘমন্দ্রিত কণ্ঠে কেউ গেয়ে উঠবেন।।নীলা আসমান খো গয়া!! তিন চারজন বই খাতার ব্যাগ পিঠে বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছে।।।।ঘরে ফিরে বাথরুমে হাপুসহুপুস স্নান।।হিটারে জল ফুটছে...গরম গরম কফি তৈরি হবে...আর চটজলদি ম্যাগি!সোমা জল বসালে।অনুরাধা কফি ঘুঁটছে।।রিতা টম্যাটো পেঁয়াজ কুটছে ম্যাগিতে এক্সট্রা আনন্দ আনার জন্য।রত্নামালার জন্য নিরিমিষ ম্যাগি।।এরকম কত বর্ষা বিধৌত বিকেল দিয়ে একেকটা জমকালো কাঁথা কাজের শাড়ির মত নিখাঁদ বন্ধুত্বর বুনোট । আহা,সেই হস্টেল যেমন দলবেঁধে কজনে মিলে ম্যাগিরন্ধন শিখিয়েছিল,তেমনি শিখিয়েছিল দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে যেতে। সারাটা দিন তাদের এক সঙ্গে ...হস্টেল-তরুণীরা দলবেঁধে গান গায়,পড়তে বসে।।ছবি।।ফোটোগ্রাফি ক্লাব।।কনভোকেশনে।। ছবি তোলার পালা আসে যায়...। রবীন্দ্রজয়ন্তীতে মেনু হয় পোলাও –মাংস, হস্টেল জীবন না থাকলে  এমন চিকেনময় রবিজন্মোৎসব হত কি? না না, বেলের পানা,ঠান্ডা মিষ্টি।।তালশাঁষের শিষ্ট আপ্যায়ণ হস্টেলের দুরন্ত তরুণিদের জন্য না।তোর-আমার জন্মদিনে মাংস-পোলাও।। রবি ঠাকুরের জন্মদিনে নয় কেন? তিনি তো আমাদেরি লোক!
তা বলে কি একলা চলা নেই? রত্নার সেমেস্টার হয়ে গেছে,বৃষ্টি মাথায় করে সে চলে গেল দুর্গাপুরে তার বাড়ি।।রিতা চললো দিল্লি তার বাবা-মায়ের কাছে। তৃতীয় জনের সেমেস্টার নেই।বছর শেষে পরীক্ষা।।সে করে কি? দিনের শেষে ফাঁকা ঘর যেন হাঁ করে গিলতে আসে! পাশের বিছানা দুটো খালি,গতরাত্তিরেও তিন বন্ধুতে কত জমজমাট আড্ডা।।রত্নার নিরিমিষ ম্যাগিতে পেঁয়াজ পড়ে গেছে বলে চেঁচামেচি।।রাত দুটো পর্যন্ত গভীর আড্ডা।।নিরবিচ্ছিন্ন...আজ কোথায় তারা? ফাঁকা দেয়ালে তাদের জামা কাপড় শুকুচ্ছে।।টেবিল শূন্য।। মনখারাপ করে পড়ে  আছে বাটার স্যান্ডাল।। হাঊস কোট ঝুলছে ,হাওয়ায় দুলছে তিনবন্ধুর একটি ক্যালেন্ডার! মনে পড়ছে মায়ের কথা।। বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে! গুটি গুটি পায়ে পাশের ঘরে যাই।। সুমিতা জেগে।মৈত্রেয়ীও।পাঞ্চালী বাড়ি গেছে। একটা বিছানা ফাঁকা এঘরে। গপ্পো শুরু হলে মনখারাপের তিস্তার স্রোত ব্যাহত হয়...। সেখানেই ঘুমে চোখ বুঁজে আসে। পরের দিন ও তাই।তার পরের দিন ও ঘরে যাবার আগে বই বগলে স্বাগতা চলে আসে ...তোর ঘরে দুটো বেড ফাঁকা রে? আমি শোবো? আমার রুম মেট গুলো বাড়ি গেছে! ফার্স্টইয়ারের এই পার্মুটেশন –কম্বিনেশন চলতেই থাকে...। রত্না-রিতা-অনুরাধা বা সোমা-অনুরাধা-স্বাগতা বা উর্মি-অনুরাধা...।গ্রীষ্ম-বর্ষা পার হয়ে যায়।।আমরা বড় হই।।তখন আর সেমেস্টার শেষে ফাঁকা ঘরে একা ঘুমাতে মনখারাপ করে না।।আড্ডা হয় না,পড়া হয় । বন্ধু কাল সকালেই আসবে। তার জন্য ম্যাগি এনে রাখি ঘরে।   বন্ধুবিচ্ছেদে আর কাতর না কেউ।। বড় হবার পাঠ দিয়েছে হস্টেলের একলা থাকার দিন রাত।।বৃষ্টির অঝোর ধারা ঝরেছে সারা সন্ধ্যে ,একা একা ম্যাগি করে খেতে গলার কাছে ব্যথা করার কৈশোর ,বাড়ির জন্য হঠাৎ মন মুচড়ে ওঠা গোধুলিবেলা হারিয়ে গেছে সপ্রতিভ হয়ে ওঠার অদম্য বাসনায়... সেই বন্ধুদের অনেকের  সঙ্গে যোগ আছে।। অনেকে হারিয়ে গেছে জুঁইফুলের গন্ধের মতো। ম্যাগি ও হারিয়ে গেল।

বনলক্ষী

শীত পড়ল না তেমন করে।অথচ দিব্যি যাই যাই করছে।শ্রীনিকেতনে এখনই হাওয়ায় শুকনো পাতারা ওড়াউড়ি করছে।আমাকে বোল এসেছে।সকাল সন্ধ্যা একটু শীতশীত ভাব আছে বটে,রাততিরেও কম্বল লাগছে কিন্তু দিনে রোদের  তাপে হাত পা শুকনো।ছোটবেলায় এদিকে যখন আসতাম বড়দের হাত ধরে তখন সবটাই আলাদা ছিল।পৌষমেলায় তুমুল হৈহৈ,মাটির পুতুল,ডোরা, কাঁথারকাজ,পোড়ামাটি,সুতোর গয়না সবই কালক্রমে বেশীবেশী চেনাশোনা হয়ে গেছে।তাছাড়া সবকিছুই এখন সর্বত্র পাওয়া যায়।ইসপেশাল বলে কিছুটা রইল না।তারপর সারাক্ষণ এই ভালো না,সেই ভালো না শুনতে শুনতে মন খারাপ  হয়।ওদিকে গেলে কি যে খুঁজি নিজেই বুঝি না।ওদিকে কাজকমমের চাপে দম বন্ধ ।ভাল করে কাজ করতে চাইলে কাজের ফাঁকি চাই শ্বাস নেবার জন্যে ।তখন ভীড় চাই না।চাই সরু মাটির পথ।দুয়ারে আলপনা।পথের ধারে গাছের নিজেদের মত করে বড় হয়েছে।সবুজ ছড়িয়েছে ।এখানে সকালে শিশির পড়ে।রাততিরে হিম।কান পাতলে শেয়ালের ডাক শোনা যায়।অথচ ভয় লাগে না।বাগানে হাঁটতে গিয়ে দেখি সরসর করে লম্বা একজন চিত্রল শরীর নিয়ে চলে যাচ্ছেন ।আশ্রম বাসী বললেন "ও কিছু না।সবাই মিলে মিশে থাকি।"লেবুফুলে ভরে আছে চারদিক।মিষ্টি গন্ধে ম'ম' করছে।মিলেমিশে না থাকলে হয়?কতকিছু শেখার আছে!ভাবলেই মন তরতাজা!খেতে বসলে মেঝেন ছোট্ট বাটিতে পোষা গরুর দুধের ঘি দেন।ঝরঝরে আলুভাজা।চমৎকার সুক্তো।পাটালি পাটিসাপটা।
না।বাইরে যাব না।একটি বই নিয়ে খসে ঢাকা বারান্দায় বসে থাকবো।সারাদিন আঁখি মেলে।ভাববো---কি গান গাব যে ভেবে না পাই।

শান্ত মেয়ে

যাকে বলে শান্ত মেয়ে,আমার মা একেবারে তাই।বাবা আর আমার ওপর যেটুকু রাগারাগি।সেও খানিকের।কারণ আমরা দুজনেই খেয়ালি।যখন যেটা মাথায় চাপে তখন সেই নিয়ে লেগে থাকি।নাওয়া খাওয়া ভুলে।দুজন খ্যাপা কে নিয়ে সংসার করার হ্যাপা সামলাতে আমার শান্ত মা জেরবার।রান্নাবাননা শেষ।বাবা একগাদা কুচোমাছ এনেছেন ।সেইটুকু যা রাগ।বা আমি পড়াশোনা না করে ছবি আঁকছি।সেই শান্ত স্বভাবের রেশ শেষ সময়েও যায় নি।নার্সিংহোমে আচ্ছন্ন অবস্থাতেও যখন কানের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করছি "কষ্ট হচ্ছে? কি কষ্ট মা?"--ক্ষীণ উত্তর আসে-"আমার কোন কষ্ট হচ্ছে না।"ওদিকে ডাক্তার হিমশীতল কন্ঠে জবাব দিয়েছেন মাল্টিপল অরগান ফেইলিওর শুরু হয়ে গেছে।চেতনা লুপ্ত হয়ে আসছে ক্রমশ ।
তাই ভাবি এই এক প্রজন্ম ছিলেন।নিজেদের অসুবিধার কথা ভাবতে শেখেন নি।সদা সর্বদা বাবার শরীর নিয়ে তার চিন্তা ।বাবার ওষুধ ।বাবার ডাক্তার ।চিন্তা করতে করতে নিজের না আছে খাওয়ার ঠিক ,না আছে ঘুম।কাজেই শরীর ভাঙে।রক্তে শর্করা পল্লবিত ।ডাক্তার বলেন টেনশন করবেন না।বাবা চলে গেলেন বিপুল থরমবোসিসে।মা কি অসহায় ডিপরেশনে তলিয়ে যাচ্ছে ।সেই আমার মস্তিষ্কে আসছে মেয়েদের কথা।তাকে পোষাকি ভাষাতে নারীবাদ বলে।একা আমাকে নিয়ে দূরে কোথাও যেতে কি ভয় তার!সে ভয় কাটাতে অনেক সময় লেগেছে।চলো না মা যাই।ঠিক পারবো।এক হাতে শক্ত করে ধরা সেই শান্ত হাত।অন্য হাতে ঝোলাতে ইনসুলিন  আর চিনি।বাড়লে ইনসুলিন।কমলে চিনি।কম কি ঘুরে বেড়ালাম!
বাইরের কাজ বেড়ে চলে।শান্ত মানুষটি একা থাকেন অনেকটা সময়।শর্করা ছড়ায়।চোখের জোতি কমে।বই পড়া মানুষটি বিষন্ন ।অপারেশন হয়।ভীষন খুশী ।আবার বই পড়তে পারছেন!আমি ভাবি এমন অনেক অনেক মায়েদের কথা ।কত একা।অসহায়,উন্মুখ ।যদি বাইরের জগত টি এঁদের কাছে খোলা থাকত ,এত দুর্বলতা  হয়তো গ্রাস করত না।নিজের মত করে ভাবতে পারতেন।দিন ভাল যায় না।ডেমেনসিয়া আসে।সব তলিয়ে যাচছে বিস্মৃতিতে।চোখে বিহ্বল দৃষ্টি ।সংসার সামলাতে হিমশিম খাই।শান্ত মানুষটি খেয়াল রাখতেন সব যে!চাল লাগবে না তেল সেসব হিসেব মাথায় পড়ল হুড়মুড় করে।নাজেহালের একশেষ।শান্ত মা তখন অবোধ শিশু।
এতদিনে বুঝি পড়াশোনার মত সংসারের ও একটি হোম ওয়ার্ক আছে।মা হাতে ধরে স্কুলের হোম ওয়ার্ক করাতেন।ঠেকতে ঠেকতে সংসারের হোম ওয়ার্ক টা শিখে গেছি।কাল সকালে কি হবে আজ রাতেই ভাবি।চাই কি মেপে বের করে রেখে দেই চাল ডাল।আনাজপাতি র কম্বিনেশন ছক করে রাখি।
মা বলতেন-আগের দিন রাতে ই হোম ওয়ার্ক শেষ করা চাই।সকালে শুধু রিভিশন।
সেই ফর্মূলা দিব্যি চালাচ্ছি ।
মা'র চলে যাওয়া আজ সাত বছর হল।একেই বোধহয় বলে----দিন যায়।

রবিবারের বারান্দা


কলকাতায় আমাদের ফ্লাটের সামনে একটা লম্বা টানা বারান্দা ছিল কোলাপসিবল গেট দেওয়া ।সেটা আমার ছোটবেলার খেলার মাঠ,পড়ার জায়গা,ছবি আঁকার কোণ।লোডশেডিং হলে বাবা আমি বসে ঐ বারান্দায় গলা ছেড়ে গান গাইতাম ।কোলাপসিবল এর ফোঁকর দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরতাম আর উল্টো দিকে ধোপাবাড়ির কাজ দেখতাম কিংবা ছেদীলালের দোকানের কেনাবেচা।রবিবার এলে আমাদের বারান্দা আনন্দে থৈথৈ করতো।বারান্দার দুই প্রান্তে দুটো বেতের চেয়ার ছিল।একটা বাবার একটা মার।একটা ছোটো চেয়ার আমার।রবিবার বাবা অনেকসময় ধরে কাগজ পড়তেন।আমাকে পড়ানো ও চলত তার মধ্যে ।আর অসংখ্য বারবার চা।বাবার নিজের হাতে তৈরি ফোলডিং টেবল  ছিল বারান্দা তে ।তার গায়ে ছবি সেট করা।তলায় কাগজ রাখার জায়গা ।সেখানে আমাদের জলখাবার খাবারের পালা।লুচি আলুচচচড়ি ।বাবার ইজেল ঐ বারান্দার এককোণে।সারারাত ছবি আঁকার জন্য ওটি বড় ভাল জায়গা ছিল। রবিবার আমাকে বসিয়ে ছবি আঁকা।পোর্টেইট এর মাহাত্ম্য বুঝতাম না তখন।ছটফট করতাম।বাবার হাতে তুলি আর মুখে গল্প ।একমাত্র গল্পের লোভে বসে থাকতাম।ছবি আঁকা হয়ে গেলে কি আনন্দ কি আনন্দ!  রবিবার এর দুপুর ঝলমল করতো ছবিতে গানে দুপুরবেলা গল্পের বই য়ে।মুসুরডালে  গন্ধ লেবু, মৌরলামাছের চচ্চড়ি, কৈ মাছের সরষেপাতুড়ি।আমি অবশ্য তখন একেবারে মাছ ভক্ত ছিলাম না।জোর করে গেলানো হতো।
ঐ বারান্দা তে সারাদুপুর উপুর হয়ে আমার ছবি আঁকা আর বইপড়া।আলমারি খুলি আর বারান্দায় এসে বেতের চেয়ারে বসি।ভেতরে গান বাজে।রবিবার দুপুরে রেডিও চলে।হাতে টানা রিকশা চলে ঠুনঠুনি বাজিয়ে ।জয় নগরের মোয়া হেঁকে যায়।কালো বাক্সে কেক পেস্টরি ওয়ালা  চলে।তার বাক্সে থাকে থাকে লোভনীয় খাদ্য বস্তু ।বিস্কুট জেঠু  আসেন আড্ডা দিতে।লম্বা টানা বারান্দা যেন লিভিংরুম।হাসি গল্পে জমজমাট।বাবার হাতের কচ্ছপের মাংস।রবিবার আলোকিত।বাবা বই পড়ে শোনাচ্ছেন জোরে জোরে ।আরণ্যক ।নানারকম আলো ছিল বাবার নিজের হাতে বানানো ঐ বারান্দাতে।তারই একটি আলোতে আবছায়া ।যেন আলোআঁধারির অরণ্য সত্যি নেমে এসেছে বইয়ের পিতা থেকে  ।ওরকম একটা রবিবার বাবার হাত ধরে দেখতে যাই ডেনমার্ক এর রাজপুত্রের জীবনছবি।কোজিনতসেভ।বাবা বলেন বাড়ি গিয়ে বইটি পড়ার চেষ্টা করবে।আমি তো কিশোর ভারতীতে অনুবাদ আগেই পড়ে ফেলেছি!
রবিবার আমার এখনো ঐ আলোতে রোদ্দুরে জমজমাট।সারাসকাল গান ভাসাভাসি করে।খবরের কাগজ লুটোপুটি খায় কফির গন্ধ মেখে।সন্ধা মাসির পছন্দ কচুশাক দিয়ে ইলিশ মাছের মাথা।  মিস্ত্রি কাজ করছে খটমট শব্দে ।ভৌভৌ রা বকছে তাদের।মাসি তাদের চা জলখাবার দিতে দিতে বকবক করে।স্নানের দেরি হচ্ছে না!।আমার এখনকার বারান্দা অনেক ছোট।কটা টব রেখে ই ভরতি।
বাবা মা রা বেতের চেয়ার দুটো আজ ও আছে।খরগোশি পুশকিন তাতে বসে থাকে।ফাঁকা থাকে না কিছুই।শুধু ছোটো চেয়ার টি নেই। তার মালিক  নেই যে!

জ্বরের হাওয়ায় লাগলো নাচন



একসময় ইচ্ছে গুলো আকাশে মেঘ হয়ে ভাসতো।মাঝে মাঝে ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি হত ইচ্ছে পূরণের।টইটম্বুর ভিজে আমরা হোস্টেল বালিকারা রংবেরং এর ফুল হয়ে ফুটতাম।সারা মাঠে আমাদের সবুজ দৌড়াদৌড়ি ।সারা সন্ধা ভিজে রাতে তুমুল জ্বর এল স্বাগতার।আমরা জলপটি দেই।থারমোমিটার লাগাই ।জ্বর কথা শোনে না।খুব ভয় করে আমাদের।আমরা দৌড়ে যাই সুপারের ঘরে। "দিদি দিদি স্বাগতার খুব জ্বর। কি সব বলছে জ্বরের ঘোরে।ওষুধ দিয়েছি।কমছে না। সুপার দুটি কন্যার জননী।তিনি তাদের নিয়ে ডিনারে বসেছেন সাজিয়ে গুছিয়ে।মাছের কাঁটা চুষতে চুষতে বললেন "তো আমি কি করব?লোকাল গার্জেন কে  ফোন করো"
আমরা হতবাক।এঁরই অফিসিয়াল দায়িত্বে মা বাবা রেখে গেছেন সদ্য তরুণীদের দলকে।
বুঝলাম এখানে আমাদের কোনও অভিভাবক নেই।আমরা সবাই একা একা।বর্ষা যদি জ্বর হয়ে আসে ,আমরা নিজেরাই হয়ে যাব নিজেদের ছাতা।হোক পলকা।হোক ফুটো।ডাঁটি উলটে যাক।তবু তো মাথা বাঁচবে।তাই বর্ষা মাথায় করে চললাম ডাক্তারের খোঁজে।ভাগ্যিস এখানে কড়াকড়ি কম।সে নিয়ে নিন্দা করার শুভাকাঙখীদেরো অভাব নেই।তবে ঠেকা বেঠেকায় নিয়ম আলগা না হলে যে বিপদে পড়তে হয় তাও সেই হোসটেল-পাঠ।ডাকতারবাবু ওষুধ লিখে দিলেন।আসবেন পরেরদিন সকালে।ওষুধ নিয়ে ফিরি।পালা করে রাত জাগা চলে।জ্বরের ঘোরে স্বাগতা ,কম্পিউটার সায়েন্স প্রলাপ বকছে"দিদি,আমাকে জেঠুর বাড়ি পাঠাবেন না প্লীজ । ওরা বিরক্ত হবে।"আমরা কেউ কেউ চমকে উঠি।ভাবি তাও আবার হয় নাকি?মনের গভীর কোণে কেউ আমলকী  পাতা বুলিয়ে দেয়।সদ্য কৈশোর পার হওয়া মেয়েরা তখন জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকা মেয়েটির দিদি বোন মা হয়ে ওঠে সহজেই।মাঝরাতে ঘরের কোণে হিটারে জল গরম হয়। সুপ্রিয়া পড়ছে।রীতা আর সুমিতা স্বাগতার বিছানায় ওর মাথার কাছে পায়ের কাছে।জলপটি চলছে।রাত জাগুনিদের জন্যে কফি হবে। জ্বর একটু কমলো? এই বার রিতা শুতে যা।রুমা উঠে গেছে।হোস্টেল ঘরের নিষ্প্রভ ফ্যাকাশে দেয়াল,রাশিরাশি জামাকাপড় চড়ানো আলনা,বইপত্র ভর্তি বিছানা টেবিল, ঘড়ির টিকটিক ।রাত বাড়ে।মৃদু গপ্প হয়।রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়তার বাইরে এক গভীরতর আত্মীয়তা জন্ম হয়।তার নাম বন্ধুত্ব ।
মনের কথা আদানপ্রদান চলে।একটু আধটু পি এন পি  সি।তার মধ্যে বন্ধু কে ধরে টয়লেটে নিয়ে যাওয়া।থারমোমিটার।এই একটু কমেছে।হালকা করে হরলিকস খাবি?ভোর হল বুঝি! স্বাগতা ঘুমাল।টেপে খুব আস্তে গান চালিয়ে দেয় সোমা।আমির খান।পরদা ওড়ে পাখার বাতাসে।ভোরের নরম আলোতে হোসটলের বিষন্ন ঘরটি কেমন মায়াময় হয়ে ওঠে।অলৌকিক ভালবাসারা জন্ম নেয়।  আমির গানের বিষন্ন ভারি কন্ঠে আলাপ ঘরের মধ্যে বাতাসের সঙ্গে ঘুরপাক খায়।বন্ধুর জ্বরো কপালে আদরের হাত রাখে।
আরো একটু আলো ফুটলে সিনিয়র দিদিরা এসে খোঁজ নেয়।।।।।"ইস!!!রাতে বলিস নি কেন?ডাকতে পারতিস!"এই সেই সিনিয়র না,যে রয়াগিং করার সময় ভীষন আওয়াজ দিয়েছিল?সেই রাগি দিদি ,যার চোখ আশ্চর্য রকম সুন্দর, সে কতবার এসে খোঁজ নিয়ে গেল।রূপাদি ,যাকে দেখতাম মত টিপ আর কানে ঝুমকো,ব্লক প্রিন্ট ঝলমল করে ক্লাসে যাচ্ছে, সে স্পনজ করে দিচ্ছে আমাদের অসুস্থ বন্ধুকে ।"তোরা রেস্ট নে।ক্লাসে যা।"রূপাদি একদম মায়ের মত ভালো ।সিগারেট ফোঁকা ঢুলুঢুলু চোখ রুমি, যাকে প্রথম প্রথম ভয় পেতাম খুব,সেও তো এসে দিব্যি খোঁজখবর করে গেল,স্বাগতা আর ভুল বকছে না।
 আস্তে আস্তে সম্পর্ক গুলো দানা বাঁধে, বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়।নাদুশনুদুশ সুপার খেয়ে দেয়ে পান চিবিয়ে দুলকি চালে ঘরে আসেন  "কেমন আছে?এখনও লোকাল গার্জেন কে  খবর দেওয়া হয়নি?"
আমরা অন্য দিকে তাকাই।অগ্রাহ্য করার বিদ্যে রপ্ত হচ্ছে তখন।দুপুরবেলা সুমি থেকে যায় ক্লাস বাদ দিয়ে।রেফারেন্স লিখছে বন্ধুর পায়ের কাছে বসে।দরকার মত এগিয়ে দিচ্ছে জল,ওষুধ খাইয়ে দিচ্ছে ।কোনো বিরক্তি নেই।
সে মেয়ে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠে।সেরে ওঠার আনন্দে ঘরে আড্ডার আসর আবার দানা বাঁধে।হোসটেলের সকাল খুব নিজস্ব। কেউ  প্রগাঢ় ঘুম,কেউ বই মুখে।সময় নেই কারো।সন্ধা বেলা হালকা আডডা।জমজমাট আড্ডা বসে ডিনারের পর।অদিতি,রুমা,উর্মি, রত্না কেশ চর্চা করছে।একশ স্ট্রোক গুণে গুণে।মৈত্রী, পাঁচু, সোমা মুখে ক্রিম ঘষছে।শর্মিলা মাস্ক লাগিয়ে টানটান।স্বাগতার পিঠে দুটো বালিশ দিয়ে বসিয়ে দেই।ওর বাড়ি থেকে ফোন এলে বলি "চিন্তা কোরো না কাকিমা।একটু জ্বর ।"গানে গপপে ইয়ারকি ফাজলামি তে ঘর ঝলমল করে।শর্মিলা চোখ খুলছে না।মাস্ক  নষ্ট হবে। তার মাথার চুলে কাগের বাসা ।রোজ পাফ করে চুল আঁচড়ায়।জামাকাপড় কাচে না।ঘেমো জামায় পারফিউমের গন্ধ ।তার আবার বয়ফ্রেন্ড আছে।উঁহু ।প্রেমিক নয়।প্রেম তো করে দেখাচ্ছে শুভা।সুমিদি।কমিটেড প্রেমিক প্রেমিকা ।চোখে হারাচ্ছে এ ওকে।বন্ধু দের হুকুম ।এপ্রিল  লিস্টে ছড়া লিখি "সৌম্যলোকে সুমি তুমি নারায়ণের নারায়ণী/কেঁদো না পড়ুয়া মাগো বড়ুয়া হবেই তুমি।"সৌম্যদা গুড বয়।সৌম্যনারায়ণ বড়ুয়া।এদের নিয়ে চিন্তা নেই।এরা সিরিয়াস জোড়ি।শর্মিলা কে নিয়ে আমাদের ভীষণ চিন্তা ।সে দুর্ধর্ষ খেলোয়াড়।ফি সপ্তাহে বয়ফ্রেন্ড পাল্টাচ্ছে।আমরা চিন্তায় মরি।কোনদিন কি বিপদে পড়ে!"ওরে,ওরকম যাস না।"সে নির্বিকার ।কিন্তু সে সাহসিনীর কথা পরে একদিন হবে।ঘরকুনোরা হোসটেলের ঘরে ফুল রাখি কাঁচের গেলাসে।আমাদেরবন্ধুর জ্বর  অনাবিল আনন্দের কাছে হেরে  কোথায় উধাও!!তার অনারে আমরা মুড়ি মাখি বাদাম লংকা পেঁয়াজ কুচি দিয়ে।আজ তোর মুখে মুড়ি।   সেই সেরে ওঠার সুগন্ধ আজও অমলিন ।সেইসব মায়াবী রাত,জ্বর তপ্ত দুপুর  মনের মধ্যে যে উষ্ণ কোণ তৈরী করেছিল,এখনও তার ওম মনকে মুড়ে রাখে প্রবল অস্তিবোধে।এত নাস্তি র মধ্যেও।