Friday, 26 June 2015

সকল রসের ধারা,,,,বাঙালির দারজিলি


বাঙ্গালী চিরকাল পুরী আর দারজিলিঙ বেড়াতে ভালবেসেছে।এ আর নতুন কথা কি?ইদানীং গ্লোবাল বাঙ্গালী না হয় জুলুক , রিষিখোলা , সিতং কিম্বা কেরল ব্যাক ওয়াটার , কিন্নর ঘোরাঘুরি করছে , তা বলে কি ঘরের কাছের শৈল শহর বাতিল করা যায়? কারশিযং ছাড়িয়ে গেলেই মন চনমন।ঘুম এলো বুঝি! মনের মধ্যে  ছোট্ট  একটা পাখি নাচে ।বুড়ো আংলা ঘুরঘুর করে ।টুং, সোনাদা , ঘুম! !!পাহাড়ি বাঁকে গাড়ি ঘুরলে ভেতর থেকে কে বলে ।।ও হিরিদয।হোলো কি?
কি যে হোলো!পুরোনো শহরের একটা আলাদা মজা আছে।আর সে যদি পাহাড়ের হয়, তবে তার কথাই আলাদা। শীত , গ্রীষ্ম বর্ষা, শরৎ ।।হরেক মৌসমে তার সঙ্গেআমার আষটেপিষটে
সম্পর্ক ।বছরে অন্তত দুবার বাবার  পাহাড় ভ্রমণের নেশা।মা বললেন আগ্রা চলো।নয় হরিদ্বার ।বাবা বললেন যাব তো।একটু দারজিলিঙ হয়ে আসি!! সেই সুন্দরী পাহাড়ের কুয়াশা, ঝিরঝিরেবারিধারা , পাইন বনের ভিজে স্যাঁতস্যাতে মাটি , খসখসে পাতার  শব্দ, মলে ঘোড়ার গায়ের গন্ধ,আপেল গাল  নেপালি শিশু , সূর্যোদয়,সূর্যাস্ত , মায়ের গায়ের পশমী চাদরে নযাপথালিনের বাস , বাবার স্কেচ খাতা , রং-তুলির ঘ্রাণ, গরম থুপকার খোশবু সব মনের খাঁজে খোজে নিবিড়  হয়ে মিশে আছে।বাবা চলে গেলেন।দার্জিলিঙে সঙ্গে সাময়িক বিচ্ছেদ হোল যেন।মা কে নিয়ে  এপাহাড় সে পাহাড় যাই , কাশ্মীর, ডালহৌসি ঘুরে আসি , উটি মহাবালেশর।।কিন্নর ছুটি পুজোয় ।দারজিলিঙ আর যাই না ।যে মানুষ দার্জিলিঙে নামে একঝুরি বাড়তি মাছ কিনে বাড়ি ফিরতেন , তাঁকে  ছেড়ে সেখানে যাই কি করে?তারচে অরুণাচল ঘুরে আসি।কিনতু  যেখানেই যাই মনে হয়  আমার চেনা পাহাড়ের ছবি! আমার হাতে খড়ি র  পাহাড়! ! আস্তে আস্তে  অভিমান গলে।একদিন বাবাকে ছাড়াই উঠে যাই হিলকার্ট রোড দিয়ে ।তারপর একদিন মাকে ছাড়া ।আভা আর্ট গ্যালারি পেরিয়ে গাড়ি ঘোরে, গলা ধরে ,  আসে যেন। সোয়েটার পসারিতে ভরে গেছে শৈলাবাস ।ডাইনে বামে দোকান। এমনকি বিগ বাজার!!পেনাঙ খুঁজে পাই।তেমনি আছে কেভেনটার। অবিকল কেকের দোকান। এমনকি তিব্বতী গয়না র দোকানগুলোও সব সেরকমই রযেছে।


ট সেই পুরোনো শহরের ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা ।কাঠের মেঝেতে ঠান্ডা কার্পেটের আস্তরণ, স্কাইলাইট দিয়ে মেয়েদের আনাগোনা, সকালের ঝকঝকে রোদ্দুরে মোড়া সোনার তবক দেওয়া কানচনজংঘার একগাল হাসি।।।।সবকিছু বড্ড নিজের।অল্পের জন্য সেখানে পাকাপাকি থাকা হল না।বাবা আমার মাধ্যমিকের পর দুম করে দারজিলিঙ বদলি নিয়ে নিলেন।যাওয়ার ব্যাবস্থা পাকা ।বাড়ি ঠিক হয়ে গেল ।তখন গোর্খা আন্দোলন তুঙগে।সব্বাই হা হা করতে লাগলো।যারা শুভাকাঙখী তাদের চোখে ভয়।সারাদিন আলোচনা সভা।দফায় দফায় চা।শেষমেষ বদলি বাতিল।সেই মনখারাপ দিস্তার সঙ্গে জড়িয়ে কত কত রঙ -বেরঙের ঝিলিমিলি।ইউনিভারসিটিতে পড়ার সময় হুজুগ উঠলো।।চলো একসকারশন! কোথায়?কোথায় আবার!বাঙ্গালীর দৌড় দারজিলিঙ!মলে নেমে পিঠে তল্পি তলপা নিয়ে চললাম জলাপাহারে ইউথহসটেলে ।কনকনে ঠান্ডা । ভয়ানক লোডশেডিং।ঠান্ডা ঘুম ব্যাগে শীত কাটে না।পরদিনই সোমা আর আমি দৌড়ালাম সোনালি বাড়িতে কম্বল সোয়েটার আনতে।যা এনেছি তা অত ঠান্ডায় কিছুই না।সোনালী র মা লোরেটোকলেজে পড়াতেন ।ভারি চমৎকার ওর বাবার সেন্ট পলসের আবাসন।বসার ঘরের পাশের দরজা খুলে দেখি ছোট্ট রোদে মোড়া টিলা , তাতে কমলালেবু গাছ ।ডিনারে ভাজা ভাত আর কষা মাংস খেয়ে নির্জন অন্ধকার পাহাড়ি পথ বেয়ে সোমা আমি ইউথহসটেলে ফিরলাম ।সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা ।সেই হাড় হিম করা শৈত্য প্রবাহ ,নির্জন জনমানুষহীন পথ আর আমরা দুই লিকপিকে সিং।ফিরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি ।আবার বেরোই গরম মোমের খোঁজে! অতটা রাস্তা আর টেনশনে ভাজা ভাত কখন হজম হয়ে গেছে! !!বাড়িতে জানানোর পর বাবা মা রেগে কাঁই। এবার যখন ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে একসকারশন গেলাম সেই আদি অকৃত্রিম ড্যাং শহরেই , হাঁটতে বের হলাম সেই রাস্তাটা ধরে, দেখি রাস্তার দু’পাশে সারি সারি বাড়ি, ভয় পাওয়ার কোনও অবকাশই নেই।শুধু বাড়ির ফাঁকে দূরে পাহাড়ের অন্ধকারে আলোকমালারা সেই একই রকম দীপাবলী সাজিয়ে চলেছে।সময় তাতে একটুও থাবা বসায় নি।পাহাড়ের ঢেউ একই রকম দাঁড়িয়ে আছে ।ঐ দিকে গ্যাংটকে , ঐ দিকে মংপু।লোকাল গাইড এইরকম বলে আসছে কত বছর ধরে।বলি তিনচুলে যাব।উধার কিঁউ যায়েঙগা?কুছ ভি তো নহি হ্যায় । কি করে বলি তিনচূলের পথে র দু’ধারে অজস্র জায়ান্ট ফারণ।পাহাড়ের রাস্তায় বাঁ দিক ধরে চললে সুবিধে হয় , বাবা বলতেন।পথচপথচলতি ছোট্ট দোকান থেকে পাহাড়ি বিস্কুট, ছুরপি , লজেন্স কিনে পকেট ভরাই।সত্যি বলতে কি মনও ভরে যায়।বাবা বলতেন বড় গরিব এখানকার লোক।কোনোমতে ভাত আর রাইশাক , যা কিনা পথেঘাটে হয় , তাই খেয়ে দিন গুজরান আম আদমীর ।বেশীর ভাগ লোক টিভি রোগে ভোগে ঐ প্রচন্ড ঠান্ডায়, হাড়ভাঙ্গা খাটনিতে।এখন ইকো-ভিলেজ আর হোম পর্যটনের দৌলতে একটু হাল ফিরেছে বটে , কিন্তু দারিদ্রের চেহারা একই ।
সেই ঝলমলে লাডেন লা রোডের চাকচিক্য মানুষের দুর্ভোগ ঢাকে , দূর করে না।নেপালি মেয়ে পুরুষ মলের ধারে , বাতাসা লুপে সোয়েটার, বাহারি চটি, টুপি , ব্যাগ বিক্রিকরে। মলে ভুট্টা, ফুচকা , সব মেলে।এ জিনিস আগে ছিল না।বাঙালির জিভ আঞ্চলিক খাবারের জোর দখল নিয়েছে।অবশ্য মোমোর জনপ্রিয়তা সার্বজনীন ।সবুজ পাহাড়ের নিচে দীর্ঘ মহীরুহর ছায়াতে ছোট মোমের দোকানে মোমো , ওয়াই ওয়াই দিয়ে খাওয়া সেরে আরো দুর পাহাড়ি পথে হেঁটে যাবার স্বপ্ন যতদিন মনের মধ্যে বেঁচে থাকবে , ততদিন হাতছানি দেবে নীল শৈল শ্রেণীতে আঁকাবাঁকা পথ আর হিমেল হাওয়া ।জীবনের সকল রসের ধারা।সমুদ্রের ঢেউ না , অরণ্যের রোমাঞ্চ না , তার প্রতি টি বাঁকে সেই অমোঘ আশ্বাস, যার খোঁজে মানুষ ঘুরে মরে।তার নাম উষ্ণতা

Thursday, 23 April 2015

আলোর বই



মেয়েরা
আজ বিশ্ব বই দিবস।ইদানীং দিবস পালন গুলো এত বেশি করে জানান দেয় যে কিছু হিসেব রাখা যায় না,সব গুলিয়ে যায়।বই পড়ার হিড়িক দেখি বই মেলায় আর তিতি-মুগ্ধ হয়ে যাই। একটা মজা লাগে যে হৈচৈ করে জানান না দিলে যেন কোনো কিছুই চলছে না।ভ্যালেন্টাইন-দিন তার উজ্বলতম নিদর্শন। বইও সেই পথেই আছে।তবে ঐ যে।।যারা ভালবাসে............।।তারা নীরবে নিঃশব্দেই বাসে আর যারা বই পড়ে তারা ওরকম নীরবে,নিঃশব্দেই বই পড়ে...।।  অ্যান্ড্রয়েড বা ট্যাব বা ই-বই, পেপারব্যাক বা হার্ড-বাউন্ড,সংস্করণ যাই   হোক না বইয়ের আসল খোরাক তার বিষয়বস্তু। সেটুকু মনের মতো হলেই দিলখুশ।
কাজের চাপে যেসব বই পড়তে হয়..তাদের চালচলন গেরামভারি। কিন্তু ছুটির দিন দুপুরে বা কাজের শেষে সন্ধেবেলা হাল্কা আরামের কিছু বই জীবনে অবশ্য-প্রয়োজনীয়। বেতের চেয়ারে পা মুড়ে বসে, পাশের তেপায়াতে চায়ের ধুমায়িত পেয়ালা রেখে কেবলমাত্র মনের তাগিদে বই পড়ার সুখ কিছুতেই ছড়তে রাজি নই। এখন মাথায় একসঙ্গে অনেক কিছু ঘুরছে। সামনে সেমিনার।।নাটক। মাথার ওপর শাকের আঁটি পরীক্ষার খাতা। ছবির কাজ। মাথা বনবন...কান কটকট।গরম হাওয়া ,রোদের তাপ বর্ধমান। সবমিলিয়ে বেশ আতান্তরে আছি। কলেজ-ফেরত অভ্যেস মত বইয়ের দোকানে ঢুকি।। আজ নিলাম আলো বসুর ঝরাপাতা। আমি আগে আলো বসুর লেখা পড়িনি।
মৌজ করে বসলাম বইটি নিয়ে। সামনেই সেমিনার।যেখান থেকে যা পাই সংগ্রহে রাখতে মন্দ কি? এই ভেবে শুরু করে ছিলাম।দেখতে দেখতে বিকেল পার হয়ে সন্ধে..তারপর রাত হোলো  আর আমি অতি প্রাঞ্জল বাংলায় লেখা বইটির হাত ধরে চলে গেলাম এক অন্য জগতে।সে পুরোনো কলকাতার দিনরাত্রি। এবং এক নারীর দৃষ্টি দিয়ে দেখা জগতখানি যেন পরতে-পরতে মেলে ধরেছেন তিনি। না ।আলো বসু একালিনী নন।তিনি সেকালিনী।  গভীর,নিবিড় ভাবে বলে গেছেন তাঁর জীবনকথা... যেখানে পিতৃ-বিয়োগের যন্ত্রনা।মায়ের রোগশয্যা,হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা।চাষনালার কোলিয়ারি।রবীন্দ্রনাথের গানের পাশাপাশি আছে অন্দর-মহলের নিপুণ বিবরণ।।এমণকি রন্ধন প্রনালী। রান্নার বই হিসেবেও এ বই দিব্যি চলে যাবে। তাই ভা্বছিলাম ।একটা সময়ে মেয়েরা রান্নাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন।তাঁদের লেখাতেও সেই ছোঁওয়া। আদাবাটা হিং নুন লঙ্কা মৌরি গুঁড়োর গন্ধ...আলো বসু লিখেছেন বড়ি দের বিয়ের কথা।। বড়িদের মাথায় দুব্বো, পোস্ত মাখানো বড়ি। পুরুষের মেইণস্ট্রীম সাহিত্যে এমন লেখাকে মেয়েলি লেখা বলা হোতো এক সময়ে। আশাপূর্ণা দেবী পর্যন্ত ছাড় পান নি। “মেয়েরা রাজনীতির কথা লেখেন না,বোঝেন না।। তত্ত্ব কথায় মেয়েরা কাঁচা...।তাদের লেখায় সেই রান্নাঘরের গপ্পো।
পড়ি আর ভাবি... রান্নাঘর এত অবজ্ঞার কেন?সমস্ত রাজনীতি,অর্থনীতি,কূট নীতি র শেষ  ও শুরু কি রান্না ঘরেই নয়? সুষ্ঠুভাবে রান্নাঘর চলবে...এই তো সমস্ত রাজনীতির প্রার্থিত লক্ষ্য? তাহলে আর কৃষক কে গলায় দড়ি দিতে হয় না। রান্নাঘরে শ্রী থাকলে সংসারে,দেশে ...কোথাও অশান্তি নেই!!!বড্ড বেশি ইউটোপিয়ান হয়ে যাচ্ছে হয়তো।তবু বলি পামুকের মাই নেম ইস রেড পড়ে পুলকিত হওয়ার অনেক কারনের মধ্যে একটি ছিল পামুকের কাহিনীর কেন্দ্রে শেকুরের রান্নাঘর। হ্যাঁ, সুখী,সুন্দর গার্হস্থর প্রতীক রান্নাঘর।আলো বসু চচ্চড়িতে দুধ,ময়দা,সরষের তেল দেবার গপ্পোও বলেছেন... যেমন বলেছেন তাঁদের বাড়িতে গাঁধিজির আসার কথা। তিনি তখন ছোট। গাঁধিজি নিজের গলার মালা খুলে ছোট্টো আলোকে পরিয়ে তাঁর দাদুকে বলেছিলেন- আপনার পোতির সঙ্গে হামার শাদি হয়ে গেল!!!
দই-বেগুন।ভজা মাছের চপের সঙ্গে আছে নিপুন গৃহ-সজ্জার গপ্পো,কলকাতার ফেরিওয়ালার ডাক—চীণেম্যান গুটেম্যান আর জয়নগরের মোয়া।পুজোয় নৈবেদ্যসাজানোর বিবরনের পাশে পিতলের পরাতে তর কারি কেটে রাখার কায়দা। লীলা মজুমদার ও এনিয়ে চমতকার লিখে গেছেন!! থোর-বড়ি-খাড়াতেও আছে বটে!বনেদিয়ানার ছোঁয়াতে আলো বসুর লেখা ভারাক্রান্ত হয় নি,মধুর হয়েছে।
মেয়েদের লেখাকে মেয়েলি বলে প্রান্তিক করে রেখেছেন যাঁরা , তাঁদের নতুন করে ভাববার সময় এখন। পুতুল খেলার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই। মেয়েরা এভাবেও নিজেদের স্বকীয়তাকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারেন।হালের খুবসুরতে একটি সংলাপ বেশ লাগল।। ফিজিও-থেরাপিস্ট নায়িকা বলছেন কেন তাঁর বয়ফ্রেন্ড নেই—সিম্পল,মেন ক্যান নট হ্যান্ডল মাই স্পন্টেনিয়াস পার্সোনালিটি!!!তার মধ্যে রান্না থেকে ঘোড়ায় চড়া্‌ সবি গ্রাহ্য!
ঐ জন্যেই আলো বসুরা মেইন্সট্রীমের আলো পান না!  নারীর স্বতস্ফূর্ত ব্যক্তিত্ব সামলানো কি চাট্টীখানি কথা?আমার প্রথম  বইটি বিষয় নারী(বেস্ট বুক্স,কলকাতা) নতুন করে লিখতে ইছছে হচ্ছে। বই দিবসে এটাই পাওনা।

Monday, 13 April 2015

বাবা



সারাদিন ঠান্ডা আর ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে মালদা যেন কেমন পাহাড় পাহাড় হয়ে আছে।ঐ রকম স্যাঁতস্যাঁতে, কুয়াশা কুয়াশা। হরেক ঋতুতে পাহাড়ে বেড়িয়ে অভ্যেস আমার ।সেটা হয়েছে আমার বাবার দৌলতে।বাবার ছিল সাংঘাতিক পাহাড় –প্রীতি।আর কোথাও না হোক ,বছরে চার বার হয় দার্জিলিং,নয় ক্যালিম্পং,নয় গ্যাংটক ।মা মাঝে মাঝে খুব রেগে যেতেন,আর কি কোথাও যাবার নেই? অবশ্য রেগে যাওয়ার কারণও ছিল বইকি!!পাহাড়ে গিয়েই চা জলখাবার খেয়ে বাবা তাঁর ইজেল রং তুলি নিয়ে বেরিয়ে যেতেন সারাদিনের জন্য।সারাদিন ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকতেন। হোটেলের ঘরে মা আর আমি,তখন ছোট,সারাদিন গল্পের বই মুখে। মা বেচারী বিরক্ত হয়ে যেতেন,একা বেরনোর অভ্যেস তাঁর ছিল না। একটু বড় হয়ে আমিও বাবার সঙ্গ নিয়েছি।অনেক পাহাড়ি গ্রামে ঘুরেছি‌ তখন,বৃষ্টিতে,শীতে...বসন্তে।মা গভীর ধৈর্যে আমাদের সেই অবাধ বিচরণকে প্রশ্রয় দিতেন,মাঝে মধ্যে রাগ টাগ গুলো যা অনিবার্য
বাবা চমতকার নেপালী জানতেন।।অনেক পাহাড়ি ছাত্র ছিল তাঁর, এখন হোমস্টে তে থাকার সময় সেই বাড়ি গুলো মনে পড়ে।কি অনায়াস আতিথেয়তা ছিল তাঁদের!বাবার আরেক শখ ছিল রান্না,বিশেষ করে মাংস।খাওয়াতে ভালবাসতেন খুব।এমনো হয়েছে দিন পনেরোর জন্য পাহাড়ি শহরে কোনো ঘর ভাড়া নিয়ে থাকা হোলো।বাবা অসাধারণ কসা মাংস রাঁধছেন সন্ধ্যের পর,বাইরে প্রবল বৃষ্টি, লেপের তলায় আমি...মা বাবার হেল্পার...ঘরে রংএর গন্ধ আর মাংসের গন্ধ মিলে-মিশে বেশ একটা মৌজ তৈরী হোতো। মা খুব শান্ত মানুষ ।তাও একেকদিন বলে ফেলতেন...সব  যে ঘুরে-বেড়িয়ে টাকা পয়সা শেষ করছো,মেয়ের জন্য তো কিছু রাখবে? আমার বাবা খুব নির্বিকার ভাবে উত্তর দিতেন।।আমার মেয়ে কে এমন করে মানুষ করছি যে ও নিজেরটা নিজেই করে নিতে পারবে।
বাবার আঁকা অ্যাডিউ ক্যালিম্পং বলে ছবিটি দীর্ঘদিন অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে  পিছনের গ্যালারিতে ছিল। লেডী রাণু মুখার্জি চেয়ে নিয়েছিলেন।আর এখন সদলে হোক বা একা...শিলিগুড়ি গেলেই পাহাড় আমাকে হাতছানি দেয়,আর আমি টুক করে একটু পাইনবনে ঘুরে আসি। উত্তরাধিকারসূত্রে বাবা আমাকে পার্থিব সম্পদের চেয়ে অনেক বেশী কিছু দিয়ে গেছেন...তা হোলো একটা গোটা হিমালয়।পাহাড়ে গেলে আমার মনে হয় যেন আরেকটা বাড়ি আমার...সেখানে কোথাও ঝরণার পাশে ইজেলের সামনে রং-তুলি হাতে ছবি আঁকছেন সেই মানুষটি...।আমার বাবা।

সন্ধ্যা মাসি



সন্ধ্যামাসি বেজায় জাঁদরেল মহিলা...একটু পিটপিটে ও আছে,সেটা অবশ্য মন্দ নয়... মাঝে মাঝে আমাকেও বকুনি দিয়ে থাকে,আমার নেহাত অসুবিধে হয় না।প্রথমদিন এ বাড়িতে এসে মাসি চারদিক দেখেশুনে বেশ পুলকিত হয়েছিল ,চার দিকে এত দেবদেবীর মূর্তি,পট ইত্যাদি দেখে মাসি খুব খুশী,ভাবলো আমি ভীষণ পূজো-আর্চা করি।সন্ধ্যেবেলা দেখি সে মহাভক্তি ভরে ওড়িশার পট ,তাঞ্জোরের শিব,মাদুরাই এর গণেশর সামনে ধূপধুনো দিচ্ছে।আমি হা হা করে বলি-ও মাসি,কি কছছো,ঠাকুরের আসনে ধুপ দাওগে...এসব মূর্তি শুধু সাজিয়ে রাখার জন্য তো।মাসির চোখ কপালে।এ আবার কেমন তরো কথা!! তুমি বলে কলেজে পড়াও? ঠাকুর দেবতাকে উপোসী রাখতে আছে? ভয় পেলাম এবার না আমার টেরাকোটার দুগগা,নৃত্যরত গণেশের সামনে বাতাসা-জল আসে! সকালেই মাসির সঙ্গে একপ্রস্থ হয়ে গেছে...।জিজ্ঞেস করলো।।তুমি দীক্ষা নাও নি? মাসি নিজে ঘোর বৈষ্ণব ...স্নান করে ফোঁটা কেটে তবে কাজকম্মে হাত দেয়।।বল্লাম।।না।।আর নেবও না।মাসি রেগে আগুন ।জানো দীক্ষা না নিলে দেহ শুদ্ধ হয় না? দীক্ষা নিলে মরার পর দেহ ফুল বাগান হয়? জীবনে অনেককিছুর মতো এটাও জানতাম না। মাসি আমার অজ্ঞতা আর অনাচার দেখে খুবই অসন্তুষ্ট...তাই দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথের বাল্মীকিসাজা ছবি দেখিয়ে বলি...অই যে ছবি দেখছো।।ওঁর কাছে দীক্ষা নেওয়া আছে,তুমি ভেবো না। মাসি ছোড়নেয়ালি না।। এই যে বললে দীক্ষা নাও নি? ভুলে গেছিলাম মাসি... মাসি আমার হয়ে রবি ঠাকুর কে ও ধূপ দেখিয়ে দেয়।
তারপর আবার বকুনি।।এটা কি বানিয়েছো? ফাঁকিবাজি রান্না করতে ভালোবাসি,সয়া আর চিলি সস দিয়ে ম্যারিনেট করে ,পেঁয়াজ-লঙ্কা ভেজে চিংড়ি মাছ কষিয়ে রান্না করেছি।। মাসি মুখে দিয়ে বললো।।এ আবার খাওয়া যায়!!টক! বলে আমাকে সরিয়ে নারকেল কুরোতে বসে।। মালাইকারি করবে। সুক্তো রাঁধবে তরিবৎ করে।কাজেই কিছছু না বলে পালাই...।মনে পড়ে ছোটবেলায় সরজূমাসির কথা... বাবা রান্নাঘরে ঢুকলেই সে চেঁচাত।।দাদাবাবু তুমি আর এঁদো নি গো! এঁদোনি! বাবার এক্সপেরিমেন্টাল রন্ধন তার সহ্য হতো না!
মাসির সান্ধ্যকালীন পূজো-আর্চায় আমি অন্তরায় হই না...।।শিল্পকর্মরা একটু ধুপ-ধুনো পেলই না হয়!