মেয়েরা
আজ বিশ্ব বই দিবস।ইদানীং দিবস পালন গুলো এত
বেশি করে জানান দেয় যে কিছু হিসেব রাখা যায় না,সব গুলিয়ে যায়।বই পড়ার হিড়িক দেখি
বই মেলায় আর তিতি-মুগ্ধ হয়ে যাই। একটা মজা লাগে যে হৈচৈ করে জানান না দিলে যেন
কোনো কিছুই চলছে না।ভ্যালেন্টাইন-দিন তার উজ্বলতম নিদর্শন। বইও সেই পথেই আছে।তবে ঐ
যে।।যারা ভালবাসে............।।তারা নীরবে নিঃশব্দেই বাসে আর যারা বই পড়ে তারা
ওরকম নীরবে,নিঃশব্দেই বই পড়ে...।।
অ্যান্ড্রয়েড বা ট্যাব বা ই-বই, পেপারব্যাক বা হার্ড-বাউন্ড,সংস্করণ যাই হোক না বইয়ের আসল খোরাক তার বিষয়বস্তু। সেটুকু
মনের মতো হলেই দিলখুশ।
কাজের চাপে যেসব বই পড়তে হয়..তাদের চালচলন
গেরামভারি। কিন্তু ছুটির দিন দুপুরে বা কাজের শেষে সন্ধেবেলা হাল্কা আরামের কিছু
বই জীবনে অবশ্য-প্রয়োজনীয়। বেতের চেয়ারে পা মুড়ে বসে, পাশের তেপায়াতে চায়ের
ধুমায়িত পেয়ালা রেখে কেবলমাত্র মনের তাগিদে বই পড়ার সুখ কিছুতেই ছড়তে রাজি নই। এখন
মাথায় একসঙ্গে অনেক কিছু ঘুরছে। সামনে সেমিনার।।নাটক। মাথার ওপর শাকের আঁটি
পরীক্ষার খাতা। ছবির কাজ। মাথা বনবন...কান কটকট।গরম হাওয়া ,রোদের তাপ বর্ধমান।
সবমিলিয়ে বেশ আতান্তরে আছি। কলেজ-ফেরত অভ্যেস মত বইয়ের দোকানে ঢুকি।। আজ নিলাম আলো
বসুর ঝরাপাতা। আমি আগে আলো বসুর লেখা পড়িনি।
মৌজ করে বসলাম বইটি নিয়ে। সামনেই
সেমিনার।যেখান থেকে যা পাই সংগ্রহে রাখতে মন্দ কি? এই ভেবে শুরু করে ছিলাম।দেখতে
দেখতে বিকেল পার হয়ে সন্ধে..তারপর রাত হোলো
আর আমি অতি প্রাঞ্জল বাংলায় লেখা বইটির হাত ধরে চলে গেলাম এক অন্য জগতে।সে
পুরোনো কলকাতার দিনরাত্রি। এবং এক নারীর দৃষ্টি দিয়ে দেখা জগতখানি যেন পরতে-পরতে
মেলে ধরেছেন তিনি। না ।আলো বসু একালিনী নন।তিনি সেকালিনী। গভীর,নিবিড় ভাবে বলে গেছেন তাঁর জীবনকথা...
যেখানে পিতৃ-বিয়োগের যন্ত্রনা।মায়ের রোগশয্যা,হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা।চাষনালার
কোলিয়ারি।রবীন্দ্রনাথের গানের পাশাপাশি আছে অন্দর-মহলের নিপুণ বিবরণ।।এমণকি রন্ধন
প্রনালী। রান্নার বই হিসেবেও এ বই দিব্যি চলে যাবে। তাই ভা্বছিলাম ।একটা সময়ে
মেয়েরা রান্নাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন।তাঁদের লেখাতেও সেই ছোঁওয়া। আদাবাটা
হিং নুন লঙ্কা মৌরি গুঁড়োর গন্ধ...আলো বসু লিখেছেন বড়ি দের বিয়ের কথা।। বড়িদের
মাথায় দুব্বো, পোস্ত মাখানো বড়ি। পুরুষের মেইণস্ট্রীম সাহিত্যে এমন লেখাকে মেয়েলি
লেখা বলা হোতো এক সময়ে। আশাপূর্ণা দেবী পর্যন্ত ছাড় পান নি। “মেয়েরা রাজনীতির কথা
লেখেন না,বোঝেন না।। তত্ত্ব কথায় মেয়েরা কাঁচা...।তাদের লেখায় সেই রান্নাঘরের
গপ্পো।
পড়ি আর ভাবি... রান্নাঘর এত অবজ্ঞার
কেন?সমস্ত রাজনীতি,অর্থনীতি,কূট নীতি র শেষ
ও শুরু কি রান্না ঘরেই নয়? সুষ্ঠুভাবে রান্নাঘর চলবে...এই তো সমস্ত
রাজনীতির প্রার্থিত লক্ষ্য? তাহলে আর কৃষক কে গলায় দড়ি দিতে হয় না। রান্নাঘরে শ্রী
থাকলে সংসারে,দেশে ...কোথাও অশান্তি নেই!!!বড্ড বেশি ইউটোপিয়ান হয়ে যাচ্ছে
হয়তো।তবু বলি পামুকের মাই নেম ইস রেড পড়ে পুলকিত হওয়ার অনেক কারনের মধ্যে একটি ছিল
পামুকের কাহিনীর কেন্দ্রে শেকুরের রান্নাঘর। হ্যাঁ, সুখী,সুন্দর গার্হস্থর প্রতীক
রান্নাঘর।আলো বসু চচ্চড়িতে দুধ,ময়দা,সরষের তেল দেবার গপ্পোও বলেছেন... যেমন বলেছেন
তাঁদের বাড়িতে গাঁধিজির আসার কথা। তিনি তখন ছোট। গাঁধিজি নিজের গলার মালা খুলে
ছোট্টো আলোকে পরিয়ে তাঁর দাদুকে বলেছিলেন- আপনার পোতির সঙ্গে হামার শাদি হয়ে
গেল!!!
দই-বেগুন।ভজা মাছের চপের সঙ্গে আছে নিপুন
গৃহ-সজ্জার গপ্পো,কলকাতার ফেরিওয়ালার ডাক—চীণেম্যান গুটেম্যান আর জয়নগরের
মোয়া।পুজোয় নৈবেদ্যসাজানোর বিবরনের পাশে পিতলের পরাতে তর কারি কেটে রাখার কায়দা।
লীলা মজুমদার ও এনিয়ে চমতকার লিখে গেছেন!! থোর-বড়ি-খাড়াতেও আছে বটে!বনেদিয়ানার
ছোঁয়াতে আলো বসুর লেখা ভারাক্রান্ত হয় নি,মধুর হয়েছে।
মেয়েদের লেখাকে মেয়েলি বলে প্রান্তিক করে
রেখেছেন যাঁরা , তাঁদের নতুন করে ভাববার সময় এখন। পুতুল খেলার মধ্যে লজ্জার কিছু
নেই। মেয়েরা এভাবেও নিজেদের স্বকীয়তাকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারেন।হালের খুবসুরতে একটি
সংলাপ বেশ লাগল।। ফিজিও-থেরাপিস্ট নায়িকা বলছেন কেন তাঁর বয়ফ্রেন্ড নেই—সিম্পল,মেন
ক্যান নট হ্যান্ডল মাই স্পন্টেনিয়াস পার্সোনালিটি!!!তার মধ্যে রান্না থেকে ঘোড়ায়
চড়া্ সবি গ্রাহ্য!
ঐ জন্যেই আলো বসুরা মেইন্সট্রীমের আলো পান
না! নারীর স্বতস্ফূর্ত ব্যক্তিত্ব সামলানো
কি চাট্টীখানি কথা?আমার প্রথম বইটি বিষয়
নারী(বেস্ট বুক্স,কলকাতা) নতুন করে লিখতে ইছছে হচ্ছে। বই দিবসে এটাই পাওনা।


