বাঙ্গালী চিরকাল পুরী আর দারজিলিঙ বেড়াতে ভালবেসেছে।এ আর নতুন কথা কি?ইদানীং গ্লোবাল বাঙ্গালী না হয় জুলুক , রিষিখোলা , সিতং কিম্বা কেরল ব্যাক ওয়াটার , কিন্নর ঘোরাঘুরি করছে , তা বলে কি ঘরের কাছের শৈল শহর বাতিল করা যায়? কারশিযং ছাড়িয়ে গেলেই মন চনমন।ঘুম এলো বুঝি! মনের মধ্যে ছোট্ট একটা পাখি নাচে ।বুড়ো আংলা ঘুরঘুর করে ।টুং, সোনাদা , ঘুম! !!পাহাড়ি বাঁকে গাড়ি ঘুরলে ভেতর থেকে কে বলে ।।ও হিরিদয।হোলো কি?
কি যে হোলো!পুরোনো শহরের একটা আলাদা মজা আছে।আর সে যদি পাহাড়ের হয়, তবে তার কথাই আলাদা। শীত , গ্রীষ্ম বর্ষা, শরৎ ।।হরেক মৌসমে তার সঙ্গেআমার আষটেপিষটে
সম্পর্ক ।বছরে অন্তত দুবার বাবার পাহাড় ভ্রমণের নেশা।মা বললেন আগ্রা চলো।নয় হরিদ্বার ।বাবা বললেন যাব তো।একটু দারজিলিঙ হয়ে আসি!! সেই সুন্দরী পাহাড়ের কুয়াশা, ঝিরঝিরেবারিধারা , পাইন বনের ভিজে স্যাঁতস্যাতে মাটি , খসখসে পাতার শব্দ, মলে ঘোড়ার গায়ের গন্ধ,আপেল গাল নেপালি শিশু , সূর্যোদয়,সূর্যাস্ত , মায়ের গায়ের পশমী চাদরে নযাপথালিনের বাস , বাবার স্কেচ খাতা , রং-তুলির ঘ্রাণ, গরম থুপকার খোশবু সব মনের খাঁজে খোজে নিবিড় হয়ে মিশে আছে।বাবা চলে গেলেন।দার্জিলিঙে সঙ্গে সাময়িক বিচ্ছেদ হোল যেন।মা কে নিয়ে এপাহাড় সে পাহাড় যাই , কাশ্মীর, ডালহৌসি ঘুরে আসি , উটি মহাবালেশর।।কিন্নর ছুটি পুজোয় ।দারজিলিঙ আর যাই না ।যে মানুষ দার্জিলিঙে নামে একঝুরি বাড়তি মাছ কিনে বাড়ি ফিরতেন , তাঁকে ছেড়ে সেখানে যাই কি করে?তারচে অরুণাচল ঘুরে আসি।কিনতু যেখানেই যাই মনে হয় আমার চেনা পাহাড়ের ছবি! আমার হাতে খড়ি র পাহাড়! ! আস্তে আস্তে অভিমান গলে।একদিন বাবাকে ছাড়াই উঠে যাই হিলকার্ট রোড দিয়ে ।তারপর একদিন মাকে ছাড়া ।আভা আর্ট গ্যালারি পেরিয়ে গাড়ি ঘোরে, গলা ধরে , আসে যেন। সোয়েটার পসারিতে ভরে গেছে শৈলাবাস ।ডাইনে বামে দোকান। এমনকি বিগ বাজার!!পেনাঙ খুঁজে পাই।তেমনি আছে কেভেনটার। অবিকল কেকের দোকান। এমনকি তিব্বতী গয়না র দোকানগুলোও সব সেরকমই রযেছে।
ট সেই পুরোনো শহরের ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা ।কাঠের মেঝেতে ঠান্ডা কার্পেটের আস্তরণ, স্কাইলাইট দিয়ে মেয়েদের আনাগোনা, সকালের ঝকঝকে রোদ্দুরে মোড়া সোনার তবক দেওয়া কানচনজংঘার একগাল হাসি।।।।সবকিছু বড্ড নিজের।অল্পের জন্য সেখানে পাকাপাকি থাকা হল না।বাবা আমার মাধ্যমিকের পর দুম করে দারজিলিঙ বদলি নিয়ে নিলেন।যাওয়ার ব্যাবস্থা পাকা ।বাড়ি ঠিক হয়ে গেল ।তখন গোর্খা আন্দোলন তুঙগে।সব্বাই হা হা করতে লাগলো।যারা শুভাকাঙখী তাদের চোখে ভয়।সারাদিন আলোচনা সভা।দফায় দফায় চা।শেষমেষ বদলি বাতিল।সেই মনখারাপ দিস্তার সঙ্গে জড়িয়ে কত কত রঙ -বেরঙের ঝিলিমিলি।ইউনিভারসিটিতে পড়ার সময় হুজুগ উঠলো।।চলো একসকারশন! কোথায়?কোথায় আবার!বাঙ্গালীর দৌড় দারজিলিঙ!মলে নেমে পিঠে তল্পি তলপা নিয়ে চললাম জলাপাহারে ইউথহসটেলে ।কনকনে ঠান্ডা । ভয়ানক লোডশেডিং।ঠান্ডা ঘুম ব্যাগে শীত কাটে না।পরদিনই সোমা আর আমি দৌড়ালাম সোনালি বাড়িতে কম্বল সোয়েটার আনতে।যা এনেছি তা অত ঠান্ডায় কিছুই না।সোনালী র মা লোরেটোকলেজে পড়াতেন ।ভারি চমৎকার ওর বাবার সেন্ট পলসের আবাসন।বসার ঘরের পাশের দরজা খুলে দেখি ছোট্ট রোদে মোড়া টিলা , তাতে কমলালেবু গাছ ।ডিনারে ভাজা ভাত আর কষা মাংস খেয়ে নির্জন অন্ধকার পাহাড়ি পথ বেয়ে সোমা আমি ইউথহসটেলে ফিরলাম ।সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা ।সেই হাড় হিম করা শৈত্য প্রবাহ ,নির্জন জনমানুষহীন পথ আর আমরা দুই লিকপিকে সিং।ফিরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি ।আবার বেরোই গরম মোমের খোঁজে! অতটা রাস্তা আর টেনশনে ভাজা ভাত কখন হজম হয়ে গেছে! !!বাড়িতে জানানোর পর বাবা মা রেগে কাঁই। এবার যখন ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে একসকারশন গেলাম সেই আদি অকৃত্রিম ড্যাং শহরেই , হাঁটতে বের হলাম সেই রাস্তাটা ধরে, দেখি রাস্তার দু’পাশে সারি সারি বাড়ি, ভয় পাওয়ার কোনও অবকাশই নেই।শুধু বাড়ির ফাঁকে দূরে পাহাড়ের অন্ধকারে আলোকমালারা সেই একই রকম দীপাবলী সাজিয়ে চলেছে।সময় তাতে একটুও থাবা বসায় নি।পাহাড়ের ঢেউ একই রকম দাঁড়িয়ে আছে ।ঐ দিকে গ্যাংটকে , ঐ দিকে মংপু।লোকাল গাইড এইরকম বলে আসছে কত বছর ধরে।বলি তিনচুলে যাব।উধার কিঁউ যায়েঙগা?কুছ ভি তো নহি হ্যায় । কি করে বলি তিনচূলের পথে র দু’ধারে অজস্র জায়ান্ট ফারণ।পাহাড়ের রাস্তায় বাঁ দিক ধরে চললে সুবিধে হয় , বাবা বলতেন।পথচপথচলতি ছোট্ট দোকান থেকে পাহাড়ি বিস্কুট, ছুরপি , লজেন্স কিনে পকেট ভরাই।সত্যি বলতে কি মনও ভরে যায়।বাবা বলতেন বড় গরিব এখানকার লোক।কোনোমতে ভাত আর রাইশাক , যা কিনা পথেঘাটে হয় , তাই খেয়ে দিন গুজরান আম আদমীর ।বেশীর ভাগ লোক টিভি রোগে ভোগে ঐ প্রচন্ড ঠান্ডায়, হাড়ভাঙ্গা খাটনিতে।এখন ইকো-ভিলেজ আর হোম পর্যটনের দৌলতে একটু হাল ফিরেছে বটে , কিন্তু দারিদ্রের চেহারা একই ।
সেই ঝলমলে লাডেন লা রোডের চাকচিক্য মানুষের দুর্ভোগ ঢাকে , দূর করে না।নেপালি মেয়ে পুরুষ মলের ধারে , বাতাসা লুপে সোয়েটার, বাহারি চটি, টুপি , ব্যাগ বিক্রিকরে। মলে ভুট্টা, ফুচকা , সব মেলে।এ জিনিস আগে ছিল না।বাঙালির জিভ আঞ্চলিক খাবারের জোর দখল নিয়েছে।অবশ্য মোমোর জনপ্রিয়তা সার্বজনীন ।সবুজ পাহাড়ের নিচে দীর্ঘ মহীরুহর ছায়াতে ছোট মোমের দোকানে মোমো , ওয়াই ওয়াই দিয়ে খাওয়া সেরে আরো দুর পাহাড়ি পথে হেঁটে যাবার স্বপ্ন যতদিন মনের মধ্যে বেঁচে থাকবে , ততদিন হাতছানি দেবে নীল শৈল শ্রেণীতে আঁকাবাঁকা পথ আর হিমেল হাওয়া ।জীবনের সকল রসের ধারা।সমুদ্রের ঢেউ না , অরণ্যের রোমাঞ্চ না , তার প্রতি টি বাঁকে সেই অমোঘ আশ্বাস, যার খোঁজে মানুষ ঘুরে মরে।তার নাম উষ্ণতা







