Tuesday, 31 May 2016

আঁধারময়ী

আবার আজকে ও?

গতকাল বলছিলাম রাত্রির নিভৃতির কথা।কিছু কথা বাকি ছিল ....তাই তাদের ভাগ করে নেওয়া বন্ধুদের সঙ্গে ।
রাত যদি মানুষ হত, তবে তার নাম দিতাম আঁধারময়ী ।খুব ছোট্ট বেলা থেকে তার সঙ্গে আমার আদান প্রদান ।বাবা ফিরতেন অনেক দেরী তে।যতক্ষণ বাবা না আসতেন , পড়াশোনা, গানের পাট সেরে একটা ছোট্ট মেয়ে কোলাপসেবল গেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকত।সেটা আমাদের বালিগঞ্জের বাড়ি।তখন কিন্তু সে রাত কে ভয় পেত।যদি বাবা হারিয়ে যায়!যেই বাবা দোড়গোড়ায়,ওমনি সব ভয় হাওয়া! তারপরও তাদের শুতে অনেক রাত হত।খাওয়ার পর বাবা তুলি হাতে ইজেলের সামনে।মেয়ে টা দেখতে পেতো একটু দূরে হাতে টানা রিকশা চালকরা জড়ো হয়েছে ।কোমরে বাঁধা পোটলা থেকে ছাতু বেরোচ্ছে ।বেরোচ্ছে লঙ্কা ।ছেদিলালের দোকান থেকে কেউ নিয়ে গেল একটি পলা সর্ষের তেল।ছাতু মাখা হত জম্পেশ করে।মেয়েটা ঘাড় উঁচু করে সেই খাবারের  গন্ধ নিতে চাইত।পেতো না।তারপর শুরু হত দেহাতী গানা।রাত গভীর হতে তারা গামছা বিছিয়ে রিকশার নীচেই ঘুমিয়ে যেত! তখন আর রাত্রি বেলাটা ভয়ের কিছু নয়!রাস্তার ওপর কয়েকজন মানুষ কি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে! গেটের এপাশ থেকে মেয়েটা অবাক হয়ে দেখত।আর একটু গলা বাড়ালে দেখা যেত রামকুমারের ইস্তিরি ঘর।রাশি রাশি জামাকাপড় দিনরাত ইস্তিরি হয়ে চলেছে।তার স্কুলের জামাও ওখানে ইস্তিরি হয়।এরপর মা এসে ওকে টেনে নিয়ে যেতে শোয়াতে।
বাসে করে যে রাত ভ্রমণের কথা বলেছিলাম, তাতে মেয়ে টা সবচে মজা পেত নদী নালার পাশে ছোটছোট ঘর দেখে।অন্ধকারে মিটমিট করতো আলো।কারা থাকে ওখানে?জলের পাশে জেলেরা থাকে?বাড়ি ফেরার সময়ে ছোট মাছ ধরে নিয়ে আসে?এইসব প্রশ্ন করতো বাবাকে ।ওদের তেল নেই।তাই মাছ পুড়িয়ে শুকনো লঙ্কা ডলে পান্তা খায়।সামান্য তেলটুকু কুপি তে জ্বলে। ও মনে মনে দেখতে পেতো কুপির টিমটিমে আলোতে বসে জেলে বউ,ছেলে,মেয়ে নিয়ে মাছপোড়া খাচ্ছে ।কি নিশ্চিন্তি ।
রাত কি তা বলে দুঃখ হয়ে আসে নি?বাবা যখন হঠাৎই চলে গেলেন,মায়ের হাতে হাত রেখে রাত কাটত।একরাততিরে খুব ঝড় হয়েছিলো ।ঘুলঘুলি দিয়ে জল এসে ভিজিয়ে দিয়েছিল ঘরদোর।সারারাত মা কে নিয়ে বসেছিল সে।মোমের আলোয় চেনা বাড়ি অচেনা।টানা লোডশেডিং।সেসব দুঃখরাত পার হয়ে অনেকদূর চলেছিল দুজনে।
তারপর যখন দূরপাল্লার বেড়ানোর নেশা ফের চাপলো মাথায়,মস্ত মস্ত রাত ভ্রমণ করেছে তারা।মুম্বাই থেকে গোয়া যাবার রাতের বাস ভারি ভালো ।আধশোওয়া হয়ে দিব্যি আরামে যাওয়া যায়।বাসে মার দাঙ্গা মার্কা হিন্দি ছবি চলে।তাও একরকম চলমান জীবনের ছবিই তো।সেরকম ভ্রমণ কালে রাতে ডিনার হয়তো হত কোনো পেট্রল পাম্পে ।মানে ট্রাভেল এজেন্সি সেইরকম একটা ব্যাবস্থা করেছেন।রাত এগারোটা র সময় পেট্রল পাম্পের পাঁচিলে বসে পা দোলাতে দোলাতে গলা খিচুড়ি আর আলুভাজা, বেগুনভাজা খাচ্ছি ।উফফ! এই না হলে বেড়ানো!বাসে সবাই তখন চেনা হয়ে যায়।প্রায় একটা পরিবার ঝগড়া ঝাটি বা বাদ কেন!!!!কিন্তু সব মিলিয়ে জমজমাট মজা।রাতের বাসে অন্তাক্ষরী খেলোনি?  করেছো কি?আমি তো পারলে এখোনো......।হঠাত পাতানো মাসি,মেসো,দিদি,দাদারা রাতকে পাহারা দিয়ে রাখেন।নো চিন্তা ।নো ভাবনা।
বেড়াতে গিয়ে নৈশাহারের পরে পায়ে হেঁটে ঘোরা আমার বাই।একটা জায়গা কে চিনতে গেলে তাকে সকালে দেখবো,দুপুরে দেখবো,রাতে দেখবো না?সে সব লিখতে গেলে মহাভারত হবে।এটুকু না লিখে পারছি না,রাতের পাহাড়ে হাঁটার মজাই আলাদা।শনশন হাওয়া ।কনকনে ঠান্ডা তে হাত পা জমে বরফ।আপাদমস্তক ঢেকে খাদের পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে দেখছি হিমালয়ের গলায় হীরের নেকলেস! !!বন্ধুদের সঙ্গে এ আনন্দ ভাগ না করে যাই কোথায়!সে এক অন্য কবিতা।আজএই পর্যন্ত! !!ভালো থেকো আঁধারময়ী!
আবার আজকে ও?

গতকাল বলছিলাম রাত্রির নিভৃতির কথা।কিছু কথা বাকি ছিল ....তাই তাদের ভাগ করে নেওয়া বন্ধুদের সঙ্গে ।
রাত যদি মানুষ হত, তবে তার নাম দিতাম আঁধারময়ী ।খুব ছোট্ট বেলা থেকে তার সঙ্গে আমার আদান প্রদান ।বাবা ফিরতেন অনেক দেরী তে।যতক্ষণ বাবা না আসতেন , পড়াশোনা, গানের পাট সেরে একটা ছোট্ট মেয়ে কোলাপসেবল গেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকত।সেটা আমাদের বালিগঞ্জের বাড়ি।তখন কিন্তু সে রাত কে ভয় পেত।যদি বাবা হারিয়ে যায়!যেই বাবা দোড়গোড়ায়,ওমনি সব ভয় হাওয়া! তারপরও তাদের শুতে অনেক রাত হত।খাওয়ার পর বাবা তুলি হাতে ইজেলের সামনে।মেয়ে টা দেখতে পেতো একটু দূরে হাতে টানা রিকশা চালকরা জড়ো হয়েছে ।কোমরে বাঁধা পোটলা থেকে ছাতু বেরোচ্ছে ।বেরোচ্ছে লঙ্কা ।ছেদিলালের দোকান থেকে কেউ নিয়ে গেল একটি পলা সর্ষের তেল।ছাতু মাখা হত জম্পেশ করে।মেয়েটা ঘাড় উঁচু করে সেই খাবারের  গন্ধ নিতে চাইত।পেতো না।তারপর শুরু হত দেহাতী গানা।রাত গভীর হতে তারা গামছা বিছিয়ে রিকশার নীচেই ঘুমিয়ে যেত! তখন আর রাত্রি বেলাটা ভয়ের কিছু নয়!রাস্তার ওপর কয়েকজন মানুষ কি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে! গেটের এপাশ থেকে মেয়েটা অবাক হয়ে দেখত।আর একটু গলা বাড়ালে দেখা যেত রামকুমারের ইস্তিরি ঘর।রাশি রাশি জামাকাপড় দিনরাত ইস্তিরি হয়ে চলেছে।তার স্কুলের জামাও ওখানে ইস্তিরি হয়।এরপর মা এসে ওকে টেনে নিয়ে যেতে শোয়াতে।
বাসে করে যে রাত ভ্রমণের কথা বলেছিলাম, তাতে মেয়ে টা সবচে মজা পেত নদী নালার পাশে ছোটছোট ঘর দেখে।অন্ধকারে মিটমিট করতো আলো।কারা থাকে ওখানে?জলের পাশে জেলেরা থাকে?বাড়ি ফেরার সময়ে ছোট মাছ ধরে নিয়ে আসে?এইসব প্রশ্ন করতো বাবাকে ।ওদের তেল নেই।তাই মাছ পুড়িয়ে শুকনো লঙ্কা ডলে পান্তা খায়।সামান্য তেলটুকু কুপি তে জ্বলে। ও মনে মনে দেখতে পেতো কুপির টিমটিমে আলোতে বসে জেলে বউ,ছেলে,মেয়ে নিয়ে মাছপোড়া খাচ্ছে ।কি নিশ্চিন্তি ।
রাত কি তা বলে দুঃখ হয়ে আসে নি?বাবা যখন হঠাৎই চলে গেলেন,মায়ের হাতে হাত রেখে রাত কাটত।একরাততিরে খুব ঝড় হয়েছিলো ।ঘুলঘুলি দিয়ে জল এসে ভিজিয়ে দিয়েছিল ঘরদোর।সারারাত মা কে নিয়ে বসেছিল সে।মোমের আলোয় চেনা বাড়ি অচেনা।টানা লোডশেডিং।সেসব দুঃখরাত পার হয়ে অনেকদূর চলেছিল দুজনে।
তারপর যখন দূরপাল্লার বেড়ানোর নেশা ফের চাপলো মাথায়,মস্ত মস্ত রাত ভ্রমণ করেছে তারা।মুম্বাই থেকে গোয়া যাবার রাতের বাস ভারি ভালো ।আধশোওয়া হয়ে দিব্যি আরামে যাওয়া যায়।বাসে মার দাঙ্গা মার্কা হিন্দি ছবি চলে।তাও একরকম চলমান জীবনের ছবিই তো।সেরকম ভ্রমণ কালে রাতে ডিনার হয়তো হত কোনো পেট্রল পাম্পে ।মানে ট্রাভেল এজেন্সি সেইরকম একটা ব্যাবস্থা করেছেন।রাত এগারোটা র সময় পেট্রল পাম্পের পাঁচিলে বসে পা দোলাতে দোলাতে গলা খিচুড়ি আর আলুভাজা, বেগুনভাজা খাচ্ছি ।উফফ! এই না হলে বেড়ানো!বাসে সবাই তখন চেনা হয়ে যায়।প্রায় একটা পরিবার ঝগড়া ঝাটি বা বাদ কেন!!!!কিন্তু সব মিলিয়ে জমজমাট মজা।রাতের বাসে অন্তাক্ষরী খেলোনি?  করেছো কি?আমি তো পারলে এখোনো......।হঠাত পাতানো মাসি,মেসো,দিদি,দাদারা রাতকে পাহারা দিয়ে রাখেন।নো চিন্তা ।নো ভাবনা।
বেড়াতে গিয়ে নৈশাহারের পরে পায়ে হেঁটে ঘোরা আমার বাই।একটা জায়গা কে চিনতে গেলে তাকে সকালে দেখবো,দুপুরে দেখবো,রাতে দেখবো না?সে সব লিখতে গেলে মহাভারত হবে।এটুকু না লিখে পারছি না,রাতের পাহাড়ে হাঁটার মজাই আলাদা।শনশন হাওয়া ।কনকনে ঠান্ডা তে হাত পা জমে বরফ।আপাদমস্তক ঢেকে খাদের পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে দেখছি হিমালয়ের গলায় হীরের নেকলেস! !!বন্ধুদের সঙ্গে এ আনন্দ ভাগ না করে যাই কোথায়!সে এক অন্য কবিতা।আজএই পর্যন্ত! !!ভালো থেকো আঁধারময়ী!

রাতের কথা

আবার আজকে ও?

গতকাল বলছিলাম রাত্রির নিভৃতির কথা।কিছু কথা বাকি ছিল ....তাই তাদের ভাগ করে নেওয়া বন্ধুদের সঙ্গে ।
রাত যদি মানুষ হত, তবে তার নাম দিতাম আঁধারময়ী ।খুব ছোট্ট বেলা থেকে তার সঙ্গে আমার আদান প্রদান ।বাবা ফিরতেন অনেক দেরী তে।যতক্ষণ বাবা না আসতেন , পড়াশোনা, গানের পাট সেরে একটা ছোট্ট মেয়ে কোলাপসেবল গেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকত।সেটা আমাদের বালিগঞ্জের বাড়ি।তখন কিন্তু সে রাত কে ভয় পেত।যদি বাবা হারিয়ে যায়!যেই বাবা দোড়গোড়ায়,ওমনি সব ভয় হাওয়া! তারপরও তাদের শুতে অনেক রাত হত।খাওয়ার পর বাবা তুলি হাতে ইজেলের সামনে।মেয়ে টা দেখতে পেতো একটু দূরে হাতে টানা রিকশা চালকরা জড়ো হয়েছে ।কোমরে বাঁধা পোটলা থেকে ছাতু বেরোচ্ছে ।বেরোচ্ছে লঙ্কা ।ছেদিলালের দোকান থেকে কেউ নিয়ে গেল একটি পলা সর্ষের তেল।ছাতু মাখা হত জম্পেশ করে।মেয়েটা ঘাড় উঁচু করে সেই খাবারের  গন্ধ নিতে চাইত।পেতো না।তারপর শুরু হত দেহাতী গানা।রাত গভীর হতে তারা গামছা বিছিয়ে রিকশার নীচেই ঘুমিয়ে যেত! তখন আর রাত্রি বেলাটা ভয়ের কিছু নয়!রাস্তার ওপর কয়েকজন মানুষ কি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে! গেটের এপাশ থেকে মেয়েটা অবাক হয়ে দেখত।আর একটু গলা বাড়ালে দেখা যেত রামকুমারের ইস্তিরি ঘর।রাশি রাশি জামাকাপড় দিনরাত ইস্তিরি হয়ে চলেছে।তার স্কুলের জামাও ওখানে ইস্তিরি হয়।এরপর মা এসে ওকে টেনে নিয়ে যেতে শোয়াতে।
বাসে করে যে রাত ভ্রমণের কথা বলেছিলাম, তাতে মেয়ে টা সবচে মজা পেত নদী নালার পাশে ছোটছোট ঘর দেখে।অন্ধকারে মিটমিট করতো আলো।কারা থাকে ওখানে?জলের পাশে জেলেরা থাকে?বাড়ি ফেরার সময়ে ছোট মাছ ধরে নিয়ে আসে?এইসব প্রশ্ন করতো বাবাকে ।ওদের তেল নেই।তাই মাছ পুড়িয়ে শুকনো লঙ্কা ডলে পান্তা খায়।সামান্য তেলটুকু কুপি তে জ্বলে। ও মনে মনে দেখতে পেতো কুপির টিমটিমে আলোতে বসে জেলে বউ,ছেলে,মেয়ে নিয়ে মাছপোড়া খাচ্ছে ।কি নিশ্চিন্তি ।
রাত কি তা বলে দুঃখ হয়ে আসে নি?বাবা যখন হঠাৎই চলে গেলেন,মায়ের হাতে হাত রেখে রাত কাটত।একরাততিরে খুব ঝড় হয়েছিলো ।ঘুলঘুলি দিয়ে জল এসে ভিজিয়ে দিয়েছিল ঘরদোর।সারারাত মা কে নিয়ে বসেছিল সে।মোমের আলোয় চেনা বাড়ি অচেনা।টানা লোডশেডিং।সেসব দুঃখরাত পার হয়ে অনেকদূর চলেছিল দুজনে।
তারপর যখন দূরপাল্লার বেড়ানোর নেশা ফের চাপলো মাথায়,মস্ত মস্ত রাত ভ্রমণ করেছে তারা।মুম্বাই থেকে গোয়া যাবার রাতের বাস ভারি ভালো ।আধশোওয়া হয়ে দিব্যি আরামে যাওয়া যায়।বাসে মার দাঙ্গা মার্কা হিন্দি ছবি চলে।তাও একরকম চলমান জীবনের ছবিই তো।সেরকম ভ্রমণ কালে রাতে ডিনার হয়তো হত কোনো পেট্রল পাম্পে ।মানে ট্রাভেল এজেন্সি সেইরকম একটা ব্যাবস্থা করেছেন।রাত এগারোটা র সময় পেট্রল পাম্পের পাঁচিলে বসে পা দোলাতে দোলাতে গলা খিচুড়ি আর আলুভাজা, বেগুনভাজা খাচ্ছি ।উফফ! এই না হলে বেড়ানো!বাসে সবাই তখন চেনা হয়ে যায়।প্রায় একটা পরিবার ঝগড়া ঝাটি বা বাদ কেন!!!!কিন্তু সব মিলিয়ে জমজমাট মজা।রাতের বাসে অন্তাক্ষরী খেলোনি?  করেছো কি?আমি তো পারলে এখোনো......।হঠাত পাতানো মাসি,মেসো,দিদি,দাদারা রাতকে পাহারা দিয়ে রাখেন।নো চিন্তা ।নো ভাবনা।
বেড়াতে গিয়ে নৈশাহারের পরে পায়ে হেঁটে ঘোরা আমার বাই।একটা জায়গা কে চিনতে গেলে তাকে সকালে দেখবো,দুপুরে দেখবো,রাতে দেখবো না?সে সব লিখতে গেলে মহাভারত হবে।এটুকু না লিখে পারছি না,রাতের পাহাড়ে হাঁটার মজাই আলাদা।শনশন হাওয়া ।কনকনে ঠান্ডা তে হাত পা জমে বরফ।আপাদমস্তক ঢেকে খাদের পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে দেখছি হিমালয়ের গলায় হীরের নেকলেস! !!বন্ধুদের সঙ্গে এ আনন্দ ভাগ না করে যাই কোথায়!সে এক অন্য কবিতা।আজএই পর্যন্ত! !!ভালো থেকো আঁধারময়ী!

রাত বিরেতে

রাত খুব প্রিয় আমার।একটা বই নিয়ে বসা বা গান নিয়ে বসা হোক,অথবা লেখালেখি, ছবি দেখা.... রাত হচ্ছে সবচেয়ে নিশ্চিন্ত আর নিরাপদ।কলিং বেল বাজবে না যখন তখন,ফোন বেজে উঠবে না।চোদ্দ বার উঠতে হবে না ....এই সবজিওয়ালা এল,পটল আর বেগুন নিতে হবে, এই ডিমওয়ালা ডিম দিতে এল,নয়ত কেউ দেখা করতে এলেন।ছাত্র ছাত্রী এল,  কেবল টিভির লোক বেল দিল.... সে সব যে আমার খুব খারাপ লাগে তা তো নয়।কিন্তু নিরিবিলি কাজ করার জন্য বা আলসেমি র জন্য রাত হল প্রশস্ত সময়।চাঁদ দেখার সৌভাগ্য হয় না ফ্ল্যাট বাড়ি তে।কিন্তু চাঁদ থাক আর না থাক, সখী রাত আমার ভালো লাগে ।বইয়ের আলমারি গোছানো বা জামাকাপড়ের আলমারি  ...রাত আমার শ্রেষ্ঠ সময়।আর গোছাতে গোছাতে যদি হারানো সোয়েটার বা পুরোনো বই খুঁজে পেয়ে যাই তবে আর দেখে কে।কি আনন্দের ঘুম যে আসে তখন!
রাতদুপুরে রান্নাঘর গোছানোর দুঃসাহসিক কাজটি করে থাকি আমি।দিনে সেখানে সন্ধ্যা মাসির রাজ্যপাট।আমি পাত্তা পাই না।আরশোলা নিধন বা মেথির কৌটো খুঁজে রাখা, নতুন চায়ের কাপ নামানো ইত্যাদি কাজ এইসময় ভাল হয়।এইসব সেরে পায়ের ওপর আলগোছে একটি পাতলা চাদর ফেলে বইটি হাতে নিয়ে বসা আর গান চালিয়ে দেওয়া হল পরম আদরের চরম বিলাসিতা ।গাছের পাতায় তখন আলোআঁধারি।সন্ধ্যা বেলা দেওয়া জলের দুএক ফোঁটা চিকচিক করছে।পাখিরা সবুজ হলুদ নীল বদরি পালক ফুলিয়ে ঘুমপি করছে।এরিকা পামের ছায়া   মাথা নাড়ে এদিক ওদিক ।মস্ত লম্বা পোড়া মাটির ঘোড়া ঘাড় বাঁকিয়ে ডান দিকে চেয়ে থাকে।
ঘর জুড়ে টেবিল আলোর নরম মায়া।খরগোশি পুশকিনের দস্যিপনা এখন ঠান্ডা ।ওদের নরম গায়ে হেলান দিলে যাকে বলে সগ্গসুখ।এর মধ্যে ফরিদা খানুম যখন গেয়ে ওঠেন আজ যানে কি জিদ না করো ....তখন সারাদিনের সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়।
রাত জাগার হাতে খড়ি হয়েছিল হসটেলে গিয়ে ।সেখানে ডিনারের পর একপ্রস্থ আড্ডা ।চুলবাঁধা।মুখ পালিশ।পা পালিশ।পেছনে লাগা,পরচর্চা ।তারপর বারোটা বাজলে যে যার টেবিলে পড়তে বসা।সেই পড়তে বসে সোমাতে আমাতে কত রাত গভীর আড্ডা য় কেটে গেছে।মেহেদী হাসান রনজিশি শাহি গেয়ে গেয়ে থেমে গেছেন,দেবব্রত বিশ্বাস তুমি রবে নীরবে গাইলেন,দুয়ার ঝড়ে ভাঙলো ...কনিকার বুলবুল কন্ঠে আজি যে রজনীর সুর ছড়িয়ে গেল করিডোরে।পাশের ঘর থেকে উর্মি পড়া ছেড়ে গান শুনে আরেক পর্ব গপপ করে গেল।পরভীন সুলতানা যখন সোনার ঝিলিক ছড়িয়ে মালকোষ আলাপ ধরলেন, আমরা আরেকবার হরলিকস খেয়ে শুতে যাই।বাড়ি গেলে রাত জাগার বহর দেখে মা বাবা টের পেলেন মেয়ে ভীষণ পড়ছে!আর গান শুনে পড়লে পড়া নাকি বডড  ভালো হয়!!!
একসময়ে রাতে বাস জার্নি করতাম খুব।বিশেষ করে কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ বা উল্টোটাও।চৌরঙগী তে বাস থামতো।তিনজনের সিটে মা বাবা আর আমি।তখন এমন বয়স যে মা বাবা সঙ্গে থাকা মানে গোটা পৃথিবী হাতের মুঠোয়।বাসের সিটের নিচে সুটকেস ছোটোটা।বইটা বাসের মাথাতে।পাশে ঝুড়িতে নানারকম খাবার।মানের বানিয়ে নিতেন।পুডিং অবশ্যই থাকত।রুটি,আলুর দম,মাংস।যাতে রাস্তার খাবার খেতে না হয়।কৃষ্ণনগর এলে কিন্তু সরপুরিয়া আর সরভাজা কেনা হবেই।নিজেদের জন্য ।পাড়া প্রতিবেশী দের জন্য ও।মাঝ রাতে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ত।চা সিগারেটের দোকানে ভীড়।দেখতাম হোটেলে খুব লোক সমাগম ।সবাই হুড়াহুড়ি করে খাচ্ছে ।তখন ভোজনবিলাসী ছিলাম না মোটে।তাও লোভ হতো ঐ হোটেলে হুসহাস করে ডাল দিয়ে ভাত আর আলুভাজা খাবার।কিন্তু উপায় ছিল না। আলুচচচড়ি তো মা করেই এনেছে!গভীর রাতে অন্ধকার ভেদ করে বাস চলেছে।দুপাশে ছায়া ছায়া গাছ।সে যে কি রোমাঞ্চ! কল্পনা র আবছায়া গতিশীল রাস্তা তে ভূত,ডাকাত কতকিছু ভয়!!!তখন থেকে বুঝেছি মানুষ ভয় পেতে ভালবাসে!আর বাবা মার মাঝখানে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মাঝে আমি।আকাশে চাঁদ এই আছে এই নেই।দুপাশে ছুটছে আঁধারময় নদীনালা আর মাঠঘাট ।হাওয়া আসছে বলে মা রুমাল বেঁধে দিচ্ছে মাথায়।    নিকষ কালো গাছেরা  ছবি তৈরি করছে প্রান্তরে! !!
আমি এখন আর রাততিরের বাসে চলাচল করিনা।এখন ট্রেনে ।আর তাতে উঠলেই মনে পড়ে কিশোর ভারতীতে পড়া ডিটটেকটিভ উপন্যাসের কথা।যদ্দূর মনে আছে ডিটেকটিভের নাম ইন্দ্রজিৎ রায়।আর ভিলেনের শাগরেদ হল কানা বলরাম।খোদ ভিলেনের নামটি কিছুতে মনে পড়ছে না।কিন্তু সেই  ভিলেন মশাই একবার পুরী যেতে গিয়ে রাতের ট্রেনে আবৃত্তি করছিলেন .....এ প্রাণ রাতের রেলগাড়ি ।দিল পাড়ি.....ইসসস।কেউ দেখেছে এমনটি!!! তবে আমার প্রাণ রেলগাড়ি হয় মাঝেমাঝেই।কোথাও যেতে না পারলে হাঁসফাঁস ।আর গন্তব্যের চেয়ে রাস্তা টি আমার বেশি আহ্লাদে র।সে যদি রাতের রাস্তা হয় তার মেজাজ ই আলাদা।মাঝরাততিরে স্টেশনে নেমে চা খেয়ে ফুরফুরে হয়ে ভূতের গপপ করে ট্রেনে রাখা বাকি যাত্রী দের জাগিয়ে রাখার মজা কি চাট্টিখানি? আমরা তাও করি।আর রাত বলেই কিনা এতখানি টানা সময় পেলাম মনের কথা লেখার।কাজেই নাইট সদা সর্বদা গুড! !!!

Monday, 16 May 2016

বাবাকে আমি কোনোদিন পূজো দিতে,অঞ্জলি দিতে দেখিনি।।কিন্তু মা যখন পূজো করতেন ,তাতে বাবার বেশ উৎসাহ দেখতাম।জিজ্ঞাসা করলে বলতেন পূজোর মাধ্যমে বাড়িতে একটি সুন্দর শ্রী আসে আর তার যেমনএকটি নান্দনিক দিক আছে,তেমনি শৃংখলার দিকটিও আছে।মনঃসংযোগ হয়। কাজেই মা-তে আমাতে মিলে খুব জোড়তোড় করে সরস্বতীপূজো করতাম। তাতে একটা বড় জায়গা ছিল ঠাকুর সাজানোর।
সাদা মূর্তি পছন্দ হোতো।দুজনেরি।অনেকসময় মূর্তি পছন্দ না হলে,মা বলতেন।।তুই এঁকে দে না।আমিও কাগজ-কলম রং নিয়ে বসে পড়তাম।দেবীর মুখ নিয়ে মা’র খুব খঁতখুতুনি ছিল। দেবী ভাব থাকা চাই। তারপর তাকে শোলা দিয়ে সাজানো।  মা আমাকে চমকে দেবার জন্য কলকাতার ফ্ল্যাট-বাড়ীতে মাটি দিয়ে একবার ছোট্টো পুকুর বানিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে আবার পদ্মফুল ভাসানো হোলো,বাবা সাদা কাগজ দিয়ে হাঁস বানিয়ে দিলেন... আমি রঙ্গীন কাগজ কেটে ফুল,পাতা বানাতাম।আমাদের ব্যাল্কনির টবের গাছেরা সে দুদিন মূর্তির চারপাশে শোভা পেত। মূর্তির মাথার ওপর দিয়ে আমরা টাঙ্গাতাম জরির ঝিলমিল। তারপর প্রতি বছরই আমার পুকুরের আবদার রাখতে হত।
আনন্দের দিন বড় তাড়াতাড়ি চলে যায়।২০০৮এর সরস্বতী পূজোর পরপর মা’র চলে যাওয়া। তারপর সাজানোর তোড়জোর নেই অত। অন্যদিকে মন দেই...।মনঃসংযোগের নানা উপায় আছে ।তারা সময় নিয়ে নেয়। ঠাকুর দেখার দিন নেই আর।
তবু কোথোও সুন্দর করে সাজিয়ে পূজো হচ্ছে দেখলে মনটা ভারী স্নিগ্ধ হয়।

Sunday, 15 May 2016

সফর

ট্রেনযাত্রার অনেক মজার অভিজ্ঞতার একটির গপ্পো রইলো...।আমি আছি এক নীচের আসনে...। সামনের সাইড-লোয়ারে এক দম্পপ্তি,সঙ্গে  মাস-ছয়েকের শিশু-পুত্র।ভদ্রলোক প্রবল গপ্পে...।তৎসহ পত্নি-সেবাতে অতি-তৎপর ।বেশ লাগছিলো।বুঝতে পারলাম তরুণী বধূটি প্রথম ট্রেনে চড়েছে।গায়ে দামী সিল্কের শাড়ি,সোয়েটার,চাদর,তদুপরি তার পতিদেবটি তাকে কম্বলে মুড়ে রেখেছেন।‘বোঝলেন কিনা,জীবনে সাক্সেস পাইসি,বউরে সিড়িয়াখানা দ্যাখাইয়া লইয়া আসি...’ ।যত্ন করে বউকে রুটি তরকারী খাওয়ালেন,নিজেই ব্যাগপ্ত্র গোছালেন,কে বলে ছেলেরা গৃহকাজ করে না! ‘হাত ধুমু কই?’ প্রশ্ন করে মেয়েটি—‘অইনে তাকাও।।বেসিন আসে’,বধূটি মুগ্ধ।‘বাথরুম-ও আসে”।।মেয়েটি কিংকর্তব্য-বিমূড়!”তাই!!! কিন্তু সাহস করে সে বেসিন বা বাথরুম কোথাও-ই যায় না। কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে।
এরপর শিশুর প্রবল কান্না।।তিনপ্রস্থ টুপি সোয়েটার সহ তাকে কম্বল চাপা দিচ্ছে তার বাবা। মা ঘোর নিদ্রা মগ্ন। বাধ্য হয়ে বলি,টুপি গুলো খুলে দিন না।
পিতাটি অতঃপর তাকে কোলে নিয়ে পায়চারি করেন।দার্জ্জিলিং মেল ছুটছে নিজের গতিতে। বই থেকে মুখ তুলে দেখি সামনে শিশু কোলে পিতা...একগাল হেসে বললেন...। “আমার ছেলেটা না,বোঝলেন দারুণ ইন্টেলিজেন্ট!’ ‘তাই বুঝি?’
বিগলিত পিতা আরো গদগদ ‘হ্যাঁ...।জানেন  ,এ্যাতো ইন্টলিজেন্ট কি কমু..।।অয় না ... বকা দিলে্ ‌ভ্যাঁ কইরা কান্দে!”
 আমার  ট্রেনযাত্রা সার্থক! জয়তু অপত্য স্নেহ!

এবার ট্রেনভ্রমণের আরেক গপ্পো।সেবার জম্মু থেকে মা আর আমি ফিরছি কলকাতা। দীর্ঘ যাত্রা ।দিব্যি আলসেমি করে ,বই পড়ে সময় কাটছে।  দিল্লি থেকে সহযাত্রী হলেন ...হ্যাঁ।।এবার ও ওই শিশু সহ দম্পতি।এঁরা বেজায় খাদ্যরসিক।সঙ্গে প্রচুর খাদ্যসম্ভার, তদুপরি স্টেশন এলে প্রবল বেগে খাদ্য সংগ্রহ করছেন।পরোটা,আলুর দম, কেক,সিংগারা,কেলা,আপেল,ঝালমুড়ি,চাট...মুখ আর থামে না।ক্ষতি নেই,কিন্ত্যবছর দেড়েকের শিশুটিকেও তাঁরা বিরামহীন খাইয়ে চললেন। সে ও দিব্যি বাপ-মা-কা বেটা। খেয়েই চলল। এবং তারপর যা হবার তাই হল।।অবিশ্রান্ত বমি আর পটি। অকুতোভয় পিতা-মাতা বললেন।।‘কুছ নহি,ঠিক হো জায়েগা!’অতএব আহার বন্ধ হল না  । অক্লান্ত আপেল সিংগারা র সঙ্গে চলল অক্লান্ত বমি ইত্যাদি। ট্রেনের কামরার মধ্যেই।
বহুক্ষণ সহ্য করে বলি।।‘বহেনজি,ইসে থোড়া বাহার লে যাকে ,টয়লেট লে যাকে ধুলাইয়ে না!
আশ্চর্য হয়ে তাকান তার মা-জননী,এবং নিষ্কম্প উত্তর...। “ইয়ে মেরা রাজা বেটা হ্যায়।
এবং যা চলছিল চলতে থাকে!
সত্য সেলুকাস!

Friday, 6 May 2016

হস্টেল

হস্টেল -২
 ‘শোন,তোর হলুদ চুড়িদার সেট টা আজ আমি পড়ছি,তুই আমার ব্লু শার্ট টা পড়বি?’
জনা বারো সদ্য উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করা মেয়ে একইসঙ্গে দু-দশ দিনের তফাতে সেই হস্টেলে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে কারো বাড়ি দুর্গাপুর,কেউ এসেছে দিল্লি থেকে,কারু বা বাড়ি গৌহাটি,কেউ জামশেদপুরের ,আবার কেউ মালদা থেকে গেছে তো কেউ গেছে নাগপুর থেকে। কেউ কাউকে চেনে না,সব্বাই মা-বাবাকে ছেড়ে একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়চত্বরে ঢুকে পড়েছে...। ঠাঁই হয়েছে মেয়ে হস্টেলের একতলার ঘরগুলোতে।প্রত্যেকের বরাদ্দ একটি করে তক্তপোষ,একটি চেয়ার,দেরাজয়ালা টেবিল,একটি দেওয়াল আলমারি,আর টেবল-ল্যাম্প। তক্তপোষের নীচে স্যুটকেস-ব্যাগের অধিষ্ঠান। কিন্তু হপ্তা-খানেকের মধ্যেই দেখা গেল সুমিতার সাদা ওড়না রুমার গায়ে,পর্ণার সবুজ কুর্তা মৌরির এত পছন্দ যে সাত দিন ও ওটা পড়েই ক্লাসে গেল আর পর্ণা পরল রীতার চেক শার্ট। একা একা বড় হয়েছি।হস্টেলে গিয়ে নিমেষে সব নিজের হয়ে গেল। তক্তপোষে নতুন তোষকের ওপর নতুন চাদর,ঝকঝকে টেবল-ক্লথ,তার ওপর ফুলদানি,পাশে নতুন বইয়ের ভীড়।।দেওয়ালে সুন্দর পোস্টার ।ছবি,জানলায় হরলিক্স।কমপ্ল্যান। মাগে সাবান,টুথপেস্ট,ব্রাশ... আলনায় তিনজনের পোষাক-আশাক, মেয়েহসটেলের রূপ খুলে যায় বাসিন্দাদের গুণে।  সামনে করিডোরে সবেধন নীলমণি কালো টেলিফোন...।।যার ফোন আসে সেই ভাগ্যবানের নাম ধরে চিৎকার করার জন্য একজন অ্যাটেডেণ্ট আছেন...।রুম নাম্বার তেইশ...অদিতি ঘোষ।।ফোন আছে...।অদিতি দুরদুর করে দৌড়ে এল।।বাবা-মা ফোন করে নিশ্চিন্তি...মেয়ে ভাল আছে। তা বলে কি বাবা-মা-মাসি-পিসি ছাড়া ইস্পেশাল ফোন আসতনা কারু কারু? এতো মোবাইল ফোন না যে তথ্য গোপনীয় থাকবে! ল্যান্ডফোনে সবই ওপনীয়!!! ছ –নম্বর ঘরে সান্ধ্যকালীন আড্ডা হচ্ছে। সুমিতা ক্লাস শেষে কেলান্ত,পায়ের ওপর চাদর ফেলে শুয়ে।ওর পায়ের কাছে হেলান দিয়ে পাঞ্চালী যাকে পাঁচ বছর পাঁচু বলেই ডাকলাম,কাকলির সেমেস্টার সামনে।।ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে।। তাও আড্ডার গন্ধে চলে এসেছে বোর্ডে ফার্স্ট হওয়া মেয়ে।। সায়ন্তনীর লম্বা চুল আঁচড়াচ্ছে রূপা। টেপে পঙ্কজ উদাস মন  উ্দাস করা গান গাইছেন।। রত্নামালা র্যা কেট বাজিয়ে তাল দিচ্ছে।। মৈত্রেয়ী বকবক করতে করতে স্যুটকেস গোছাছছে...।বাইরে ঘোষণা হল ।।রুম নাম্বার নীপা চ্যাটার্জি...।ফোন!
আমরা চুপ হয়ে গেলাম।সবাই জানি এ ফোন যে সে ফোন নয়...বিশেষ ফোন।নীপা আমাদের সিনিয়ার।ইকনমিক্স পড়ে।মিলিটারি ব্যাকগ্রাউন্ড। প্রচন্ড স্পীডে,জোরে কথা বলে।।ওর প্রেমটাও খোলামেলা। রোজ চেঁচামেচি করে ঘন্টাখানেক বিএফ এর সঙ্গে ফোনালাপ করে..।।তারপর একহয় পড়তে বসে নাহয় ঘুরতে যায়।  মিলিটারি স্মার্ট মেয়ে। আমরা সতর্ক ।ফোনে কথা হইতেছে...আমরা শুধু এপারের কথা শুনিতেছি।
নীপাঃ‘আজ আর যাচ্ছি না’
এই ঘর থেকে পাঁচু জোরে জোরে বলল ‘কাল ঠিক যাবো’
নীপা ফোনেঃ হাউ সুইট!!!কি মিষ্টি!!!
রুমা আওয়াজ তুললো-  দুলালের তালমিছরি!  ভীমনাগের সন্দেশ, গাঙ্গুরামের রসগুল্লা...
নীপা ফোনেঃ ডোন্ট বি সিলি!
সুমিতা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে  চেঁচালো,বললোঃ  সিলি, ইডিয়ট,রাস্কাল,জোকার,ডাইনোসোরাস...
এত জোরে যে ফোনের অইপ্রান্তেও বোধহয় শোনা গেল... প্রেমিকযুগল এবার বিরক্ত হয়ে ক্ষান্ত দিল,আমরা ডিনার বেল পড়েছে।।খেতে চ...। বলে  নাচতে নাচতে ডাইনিং হলে  চল্লাম! সেখানে আর এক প্রস্থ কিছু হবে!সেইসব সুগন্ধ একদিনের জন্যও একলা হতে দেয়নি,দেয়ও না।
 সেই এক বিঘত জমি যা তারার মত জ্বলে...।পাখির পালক হয়ে সারাজীবন  উষ্ণতায় মুড়ে রাখে।

পাহাড়ের গপপো

পাহাড়ের গপ্পো
একরাশ মেঘ পরতে পরতে নেমে আসছে মাথার ওপর।ছড়িয়ে পড়ছে এই পাহাড় থেকে ওই পাহাড়।ঘন সবুজ বন ঢেকে যাচ্ছে মেঘে আর কুয়াশাতে।নাকের ডগা কনকনে ঠান্ডা ।মাথায় টুপি,গায়ে সোয়েটার, হাতমোজা,পায় উলের মোজার ওপর ভোসকা কেডস,  চলেছি তো চলেইছি।পাক বেয়ে বেয়ে ছ'সাত জনের টগবগে দল গান গেয়ে, নেচে কুঁদে ক্লান্ত হয়ে পড়ল।রাস্তা যেন ফুরায় না!পাহাড়ের এই মজা।কাউকে জিজ্ঞেস করলে বলে,থোড়া দূর।সামনে হায়।কোথায় থোড়া দূর?হাঁটতে হাঁটতে পা খুলে এল তবু তাহার দেখা নাই।দুপাশে পাইন আর সেডারের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ।ঠান্ডা নামছে আরো জমিয়ে।সোয়েটার কোটে ঠান্ডা বাগ মানছে না আর!যেমন বুদ্ধি তোদের!গাইড না নিয়ে কেউ আসে নতুন রাস্তায়? তারপর আবার পাহাড়।প্রায় কাঁদো কাঁদো শাওন বলল আমাকে এখানেই রেখে যা।ঠান্ডায় জমে পাথর হয়ে থাকি।ওমনি দূরে দেখি মিটমিট করে আলো জ্বলছে! চল চল পা চালা! ওমা।ছোট্ট কাঠের বাড়ি টি।সারা গায়ে আইভি লতা জড়ানো ।কাঠগোলাপ   জড়িয়ে উঠেছে টিনের চালায়।কাঠের বারান্দায় ছোট টেবিলে সাদা ডোমের আলোতে ছবির মতো বাড়ি।এই বুঝি আইভি কটেজ! সৃজার ছোড়দাদুর পুরোনো বাড়ি! যার খোঁজ করে এতদূর আসা!এখন আইভি কটেজ রেঁসতরা হয়েছে।তাও ভেতরে ছোড়দাদুর ছবি আছে তো!আমরা গোল হয়ে বসি টেবিল ঘিরে ।লাল টুকটুকে  টেবিলঢাকা।সোনালি নুন-মরিচ দান।চারদিকে রংবেরংয়ের থাংকা।চমৎকার সব চিনেমাটির কারুকাজ করা বাসন।দেখেই খিদে পায়।পাশেই রান্না ঘর।বেজায় ভালো সুরুয়া র গন্ধ ছড়াচ্ছে ।কম্বলের কোট পরে রাঁধুনী বসে আছেন সামোভারের পাশে।মনে মনে তার নাম দিলাম মোং।শরদিন্দু বাবু জিন্দাবাদ ।খানা মিলবে?মোং বললেন মিলবে।তিনি আর তাঁর বছর পনেরোর নাতি এই আইভি কটেজের রাঁধুনি কাম কেয়ারটেকার।বাইরে শীতের দাপট বাড়ছে।তারপর শুরু হল টুপুর টুপুর বৃষ্টি ।  আমরা গুটিশুটি হয়ে বসি।কি খাওয়াবে?আইভির স্পেশ্যাল চিকেন মোমো।সুরুয়া ।আলুকা পরাঠা।শুখা চিকেন।শেষপাতে মূলোর চাটনি।কাজুর হালুয়া।বড় বড় কাঠের বাটিতে গরম সুরুয়া এলে হাপুস হাপুস করে খেয়ে বাঁচি।মাথার ওপর টিনের ছাদে পাহাড়ি বৃষ্টি র শব্দ ।মোং বলল বড়া সাহেবের পিরেত আশেপাশেই থাকে ।মাঝেমাঝে দরজাতে টোকা মেরে যায়।কেন ?টোকা মারেন কেন?মোং খুব সিরিয়াস ।জানান দিয়ে যান উনি আছেন।সৃজা, মিতুল ভয়ে কাঠ।কাঁচের জানালায় ড্রাগন ছাপ পর্দা ।তার ফাঁকে বিদুৎ চমকানি দেখা যায়।সবাই আরো ঘেঁষাঘেঁষি করে বসি।মোং চা দিয়েছে।বলেছে রাততিরে এখানেই থেকে যেতে।দুটো ঘরে দিব্যি হয়ে যাবে।এই ঝড়জলের রাতে হোটেলে ফেরার গপ্পো ই নেই কোনো।তা বলে এই পিরেতের বাড়ি থুরি রেঁসতরা তে? কিন্তু উপায় নেই।কাজেই আমরা গোলগোল চোখে এদিক ওদিক দেখি।এখানে রুম হিটার নেই।মোং কাংড়ি জ্বেলে দেয়।বৃষ্টি কি বাড়লো?রূপা একা বাথরুমে যাবে না।আমি আর  নয়না দাঁড়িয়ে থাকি কাঠের বারান্দায়।বারান্দা র চারদিকে ছোট ছোট রঙিন বাটিতে সাদা হলুদ অর্কিড ।যেমন বৃষ্টি তেমন হাওয়া ।আধবোজা চোখে মোং বলে বড়া সাহেবের পিরেত বৃষ্টির রাতে সুরুয়া খেতে আসে।বলে দরজা খুলে একগামলা চিকেন সুরুয়া বারান্দা তে রেখে আসে।    তাতে বড় বড় চিকেনের টুকরো।আমরা কাঠ।সত্যি পিরেত আসবে?মোং নির্বিকার ।বড়াসাহেব সুরুয়া খেতে বহুত ভালোবাসতেন।আইভির সুরুয়া কত নাম করা।দূর দূর থেকে লোক আসে এখানে খেতে।সৃজার ছোড়দাদু মোং য়ের বড়াসাহেব পেশায় ডাক্তার বাবু ছিলেন।আর ছিলেন রান্না র শৌকিন ।যদদিন বেঁচে ছিলেন এই বাড়িতেই কাটিয়েছেন।এইরকম বৃষ্টির রাতে রোগী দেখতে গিয়ে তাঁর গাড়ি খাদে পড়ে যায়।
হঠাৎই দরজায় শব্দ হল।টুকটুক ।আমরা চমকে উঠি।কে?মোং মাথা নাড়ে ।ওই এলেন সাব।আমরা চোখ ঢাকি।অত ঠান্ডায় ঘেমে কুলকুল।রাতটা কাটলে হয়।কাংড়ি নিভে এল ।যে এসেছিল সে কে?সে কি গেল?কনকনে বিছানা ।পাশ ফিরতে ভয় হয়।নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকি।পিরেত যেন শুনতে না পায়।
সকাল হল জানলার ফাঁক দিয়ে ।একরাশ আলো বিছানা জুড়ে।হালকা রোদে গা মুড়মুড়ি দিচ্ছে মিঠে কুয়াশা।মোং য়ের নাতি চা করে এনেছে সাদার ওপর নীল ছবি আঁকা কাপে।একে কাল দেখিনি ।ঘুমাচ্ছিল বোধহয়।বৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই।আকাশ পরিষ্কার ।তুমুল নীল।সবুজ পাহাড় চারদিকে ।মিষ্টি ঠান্ডা ।লতা আর ফুলে ঢাকা ভারি মায়াবী কটেজটি।এতক্ষণে তাকে চোখ ভরে দেখি।মস আর ফারণে ঢাকা সবুজ গালিচা জেরেনিয়াম আর গাঁদায় ভরা বারানদা।মাথার ওপর রঙিন পতাকার সারি।হাওয়া য় দুলছে।পাশেই ছোট ঝোরা।তাতে বেশ নাদুসনুদুস এক পাহাড়ি মা ভৌভৌ দুটি গোলগাল ছানাপানা নিয়ে জল খাচ্ছে ।দেখে মনে হল আইভির সুরুয়া খেয়ে ই এত গোলগাল ।বৃষ্টির রাতে দরজা খুটখুট করবে না তো কি করবে?ভয় কোথায় পালিয়ে গেল।
মোং য়ের নাতি গরম রুটি ভেজে দিল। আলুর ছোকা দিয়ে খেতে যেন অমৃত।এবার ফিরবো।মোং কোথায়?তাকে দেখছি ন?
নাতিবাবু একগাল হেসে বললে দাদুর তো কবে ই ইনতেকাল হয়ে গেছে।তবে কিনা মাঝেমধ্যে ঝড়জলের রাতে এসে রান্না করে যায়।রাঁধতে বড় ভালবাসতো কিনা!