Tuesday, 31 May 2016

রাত বিরেতে

রাত খুব প্রিয় আমার।একটা বই নিয়ে বসা বা গান নিয়ে বসা হোক,অথবা লেখালেখি, ছবি দেখা.... রাত হচ্ছে সবচেয়ে নিশ্চিন্ত আর নিরাপদ।কলিং বেল বাজবে না যখন তখন,ফোন বেজে উঠবে না।চোদ্দ বার উঠতে হবে না ....এই সবজিওয়ালা এল,পটল আর বেগুন নিতে হবে, এই ডিমওয়ালা ডিম দিতে এল,নয়ত কেউ দেখা করতে এলেন।ছাত্র ছাত্রী এল,  কেবল টিভির লোক বেল দিল.... সে সব যে আমার খুব খারাপ লাগে তা তো নয়।কিন্তু নিরিবিলি কাজ করার জন্য বা আলসেমি র জন্য রাত হল প্রশস্ত সময়।চাঁদ দেখার সৌভাগ্য হয় না ফ্ল্যাট বাড়ি তে।কিন্তু চাঁদ থাক আর না থাক, সখী রাত আমার ভালো লাগে ।বইয়ের আলমারি গোছানো বা জামাকাপড়ের আলমারি  ...রাত আমার শ্রেষ্ঠ সময়।আর গোছাতে গোছাতে যদি হারানো সোয়েটার বা পুরোনো বই খুঁজে পেয়ে যাই তবে আর দেখে কে।কি আনন্দের ঘুম যে আসে তখন!
রাতদুপুরে রান্নাঘর গোছানোর দুঃসাহসিক কাজটি করে থাকি আমি।দিনে সেখানে সন্ধ্যা মাসির রাজ্যপাট।আমি পাত্তা পাই না।আরশোলা নিধন বা মেথির কৌটো খুঁজে রাখা, নতুন চায়ের কাপ নামানো ইত্যাদি কাজ এইসময় ভাল হয়।এইসব সেরে পায়ের ওপর আলগোছে একটি পাতলা চাদর ফেলে বইটি হাতে নিয়ে বসা আর গান চালিয়ে দেওয়া হল পরম আদরের চরম বিলাসিতা ।গাছের পাতায় তখন আলোআঁধারি।সন্ধ্যা বেলা দেওয়া জলের দুএক ফোঁটা চিকচিক করছে।পাখিরা সবুজ হলুদ নীল বদরি পালক ফুলিয়ে ঘুমপি করছে।এরিকা পামের ছায়া   মাথা নাড়ে এদিক ওদিক ।মস্ত লম্বা পোড়া মাটির ঘোড়া ঘাড় বাঁকিয়ে ডান দিকে চেয়ে থাকে।
ঘর জুড়ে টেবিল আলোর নরম মায়া।খরগোশি পুশকিনের দস্যিপনা এখন ঠান্ডা ।ওদের নরম গায়ে হেলান দিলে যাকে বলে সগ্গসুখ।এর মধ্যে ফরিদা খানুম যখন গেয়ে ওঠেন আজ যানে কি জিদ না করো ....তখন সারাদিনের সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়।
রাত জাগার হাতে খড়ি হয়েছিল হসটেলে গিয়ে ।সেখানে ডিনারের পর একপ্রস্থ আড্ডা ।চুলবাঁধা।মুখ পালিশ।পা পালিশ।পেছনে লাগা,পরচর্চা ।তারপর বারোটা বাজলে যে যার টেবিলে পড়তে বসা।সেই পড়তে বসে সোমাতে আমাতে কত রাত গভীর আড্ডা য় কেটে গেছে।মেহেদী হাসান রনজিশি শাহি গেয়ে গেয়ে থেমে গেছেন,দেবব্রত বিশ্বাস তুমি রবে নীরবে গাইলেন,দুয়ার ঝড়ে ভাঙলো ...কনিকার বুলবুল কন্ঠে আজি যে রজনীর সুর ছড়িয়ে গেল করিডোরে।পাশের ঘর থেকে উর্মি পড়া ছেড়ে গান শুনে আরেক পর্ব গপপ করে গেল।পরভীন সুলতানা যখন সোনার ঝিলিক ছড়িয়ে মালকোষ আলাপ ধরলেন, আমরা আরেকবার হরলিকস খেয়ে শুতে যাই।বাড়ি গেলে রাত জাগার বহর দেখে মা বাবা টের পেলেন মেয়ে ভীষণ পড়ছে!আর গান শুনে পড়লে পড়া নাকি বডড  ভালো হয়!!!
একসময়ে রাতে বাস জার্নি করতাম খুব।বিশেষ করে কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ বা উল্টোটাও।চৌরঙগী তে বাস থামতো।তিনজনের সিটে মা বাবা আর আমি।তখন এমন বয়স যে মা বাবা সঙ্গে থাকা মানে গোটা পৃথিবী হাতের মুঠোয়।বাসের সিটের নিচে সুটকেস ছোটোটা।বইটা বাসের মাথাতে।পাশে ঝুড়িতে নানারকম খাবার।মানের বানিয়ে নিতেন।পুডিং অবশ্যই থাকত।রুটি,আলুর দম,মাংস।যাতে রাস্তার খাবার খেতে না হয়।কৃষ্ণনগর এলে কিন্তু সরপুরিয়া আর সরভাজা কেনা হবেই।নিজেদের জন্য ।পাড়া প্রতিবেশী দের জন্য ও।মাঝ রাতে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ত।চা সিগারেটের দোকানে ভীড়।দেখতাম হোটেলে খুব লোক সমাগম ।সবাই হুড়াহুড়ি করে খাচ্ছে ।তখন ভোজনবিলাসী ছিলাম না মোটে।তাও লোভ হতো ঐ হোটেলে হুসহাস করে ডাল দিয়ে ভাত আর আলুভাজা খাবার।কিন্তু উপায় ছিল না। আলুচচচড়ি তো মা করেই এনেছে!গভীর রাতে অন্ধকার ভেদ করে বাস চলেছে।দুপাশে ছায়া ছায়া গাছ।সে যে কি রোমাঞ্চ! কল্পনা র আবছায়া গতিশীল রাস্তা তে ভূত,ডাকাত কতকিছু ভয়!!!তখন থেকে বুঝেছি মানুষ ভয় পেতে ভালবাসে!আর বাবা মার মাঝখানে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মাঝে আমি।আকাশে চাঁদ এই আছে এই নেই।দুপাশে ছুটছে আঁধারময় নদীনালা আর মাঠঘাট ।হাওয়া আসছে বলে মা রুমাল বেঁধে দিচ্ছে মাথায়।    নিকষ কালো গাছেরা  ছবি তৈরি করছে প্রান্তরে! !!
আমি এখন আর রাততিরের বাসে চলাচল করিনা।এখন ট্রেনে ।আর তাতে উঠলেই মনে পড়ে কিশোর ভারতীতে পড়া ডিটটেকটিভ উপন্যাসের কথা।যদ্দূর মনে আছে ডিটেকটিভের নাম ইন্দ্রজিৎ রায়।আর ভিলেনের শাগরেদ হল কানা বলরাম।খোদ ভিলেনের নামটি কিছুতে মনে পড়ছে না।কিন্তু সেই  ভিলেন মশাই একবার পুরী যেতে গিয়ে রাতের ট্রেনে আবৃত্তি করছিলেন .....এ প্রাণ রাতের রেলগাড়ি ।দিল পাড়ি.....ইসসস।কেউ দেখেছে এমনটি!!! তবে আমার প্রাণ রেলগাড়ি হয় মাঝেমাঝেই।কোথাও যেতে না পারলে হাঁসফাঁস ।আর গন্তব্যের চেয়ে রাস্তা টি আমার বেশি আহ্লাদে র।সে যদি রাতের রাস্তা হয় তার মেজাজ ই আলাদা।মাঝরাততিরে স্টেশনে নেমে চা খেয়ে ফুরফুরে হয়ে ভূতের গপপ করে ট্রেনে রাখা বাকি যাত্রী দের জাগিয়ে রাখার মজা কি চাট্টিখানি? আমরা তাও করি।আর রাত বলেই কিনা এতখানি টানা সময় পেলাম মনের কথা লেখার।কাজেই নাইট সদা সর্বদা গুড! !!!

No comments:

Post a Comment