Friday, 6 May 2016

পাহাড়ের গপপো

পাহাড়ের গপ্পো
একরাশ মেঘ পরতে পরতে নেমে আসছে মাথার ওপর।ছড়িয়ে পড়ছে এই পাহাড় থেকে ওই পাহাড়।ঘন সবুজ বন ঢেকে যাচ্ছে মেঘে আর কুয়াশাতে।নাকের ডগা কনকনে ঠান্ডা ।মাথায় টুপি,গায়ে সোয়েটার, হাতমোজা,পায় উলের মোজার ওপর ভোসকা কেডস,  চলেছি তো চলেইছি।পাক বেয়ে বেয়ে ছ'সাত জনের টগবগে দল গান গেয়ে, নেচে কুঁদে ক্লান্ত হয়ে পড়ল।রাস্তা যেন ফুরায় না!পাহাড়ের এই মজা।কাউকে জিজ্ঞেস করলে বলে,থোড়া দূর।সামনে হায়।কোথায় থোড়া দূর?হাঁটতে হাঁটতে পা খুলে এল তবু তাহার দেখা নাই।দুপাশে পাইন আর সেডারের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ।ঠান্ডা নামছে আরো জমিয়ে।সোয়েটার কোটে ঠান্ডা বাগ মানছে না আর!যেমন বুদ্ধি তোদের!গাইড না নিয়ে কেউ আসে নতুন রাস্তায়? তারপর আবার পাহাড়।প্রায় কাঁদো কাঁদো শাওন বলল আমাকে এখানেই রেখে যা।ঠান্ডায় জমে পাথর হয়ে থাকি।ওমনি দূরে দেখি মিটমিট করে আলো জ্বলছে! চল চল পা চালা! ওমা।ছোট্ট কাঠের বাড়ি টি।সারা গায়ে আইভি লতা জড়ানো ।কাঠগোলাপ   জড়িয়ে উঠেছে টিনের চালায়।কাঠের বারান্দায় ছোট টেবিলে সাদা ডোমের আলোতে ছবির মতো বাড়ি।এই বুঝি আইভি কটেজ! সৃজার ছোড়দাদুর পুরোনো বাড়ি! যার খোঁজ করে এতদূর আসা!এখন আইভি কটেজ রেঁসতরা হয়েছে।তাও ভেতরে ছোড়দাদুর ছবি আছে তো!আমরা গোল হয়ে বসি টেবিল ঘিরে ।লাল টুকটুকে  টেবিলঢাকা।সোনালি নুন-মরিচ দান।চারদিকে রংবেরংয়ের থাংকা।চমৎকার সব চিনেমাটির কারুকাজ করা বাসন।দেখেই খিদে পায়।পাশেই রান্না ঘর।বেজায় ভালো সুরুয়া র গন্ধ ছড়াচ্ছে ।কম্বলের কোট পরে রাঁধুনী বসে আছেন সামোভারের পাশে।মনে মনে তার নাম দিলাম মোং।শরদিন্দু বাবু জিন্দাবাদ ।খানা মিলবে?মোং বললেন মিলবে।তিনি আর তাঁর বছর পনেরোর নাতি এই আইভি কটেজের রাঁধুনি কাম কেয়ারটেকার।বাইরে শীতের দাপট বাড়ছে।তারপর শুরু হল টুপুর টুপুর বৃষ্টি ।  আমরা গুটিশুটি হয়ে বসি।কি খাওয়াবে?আইভির স্পেশ্যাল চিকেন মোমো।সুরুয়া ।আলুকা পরাঠা।শুখা চিকেন।শেষপাতে মূলোর চাটনি।কাজুর হালুয়া।বড় বড় কাঠের বাটিতে গরম সুরুয়া এলে হাপুস হাপুস করে খেয়ে বাঁচি।মাথার ওপর টিনের ছাদে পাহাড়ি বৃষ্টি র শব্দ ।মোং বলল বড়া সাহেবের পিরেত আশেপাশেই থাকে ।মাঝেমাঝে দরজাতে টোকা মেরে যায়।কেন ?টোকা মারেন কেন?মোং খুব সিরিয়াস ।জানান দিয়ে যান উনি আছেন।সৃজা, মিতুল ভয়ে কাঠ।কাঁচের জানালায় ড্রাগন ছাপ পর্দা ।তার ফাঁকে বিদুৎ চমকানি দেখা যায়।সবাই আরো ঘেঁষাঘেঁষি করে বসি।মোং চা দিয়েছে।বলেছে রাততিরে এখানেই থেকে যেতে।দুটো ঘরে দিব্যি হয়ে যাবে।এই ঝড়জলের রাতে হোটেলে ফেরার গপ্পো ই নেই কোনো।তা বলে এই পিরেতের বাড়ি থুরি রেঁসতরা তে? কিন্তু উপায় নেই।কাজেই আমরা গোলগোল চোখে এদিক ওদিক দেখি।এখানে রুম হিটার নেই।মোং কাংড়ি জ্বেলে দেয়।বৃষ্টি কি বাড়লো?রূপা একা বাথরুমে যাবে না।আমি আর  নয়না দাঁড়িয়ে থাকি কাঠের বারান্দায়।বারান্দা র চারদিকে ছোট ছোট রঙিন বাটিতে সাদা হলুদ অর্কিড ।যেমন বৃষ্টি তেমন হাওয়া ।আধবোজা চোখে মোং বলে বড়া সাহেবের পিরেত বৃষ্টির রাতে সুরুয়া খেতে আসে।বলে দরজা খুলে একগামলা চিকেন সুরুয়া বারান্দা তে রেখে আসে।    তাতে বড় বড় চিকেনের টুকরো।আমরা কাঠ।সত্যি পিরেত আসবে?মোং নির্বিকার ।বড়াসাহেব সুরুয়া খেতে বহুত ভালোবাসতেন।আইভির সুরুয়া কত নাম করা।দূর দূর থেকে লোক আসে এখানে খেতে।সৃজার ছোড়দাদু মোং য়ের বড়াসাহেব পেশায় ডাক্তার বাবু ছিলেন।আর ছিলেন রান্না র শৌকিন ।যদদিন বেঁচে ছিলেন এই বাড়িতেই কাটিয়েছেন।এইরকম বৃষ্টির রাতে রোগী দেখতে গিয়ে তাঁর গাড়ি খাদে পড়ে যায়।
হঠাৎই দরজায় শব্দ হল।টুকটুক ।আমরা চমকে উঠি।কে?মোং মাথা নাড়ে ।ওই এলেন সাব।আমরা চোখ ঢাকি।অত ঠান্ডায় ঘেমে কুলকুল।রাতটা কাটলে হয়।কাংড়ি নিভে এল ।যে এসেছিল সে কে?সে কি গেল?কনকনে বিছানা ।পাশ ফিরতে ভয় হয়।নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকি।পিরেত যেন শুনতে না পায়।
সকাল হল জানলার ফাঁক দিয়ে ।একরাশ আলো বিছানা জুড়ে।হালকা রোদে গা মুড়মুড়ি দিচ্ছে মিঠে কুয়াশা।মোং য়ের নাতি চা করে এনেছে সাদার ওপর নীল ছবি আঁকা কাপে।একে কাল দেখিনি ।ঘুমাচ্ছিল বোধহয়।বৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই।আকাশ পরিষ্কার ।তুমুল নীল।সবুজ পাহাড় চারদিকে ।মিষ্টি ঠান্ডা ।লতা আর ফুলে ঢাকা ভারি মায়াবী কটেজটি।এতক্ষণে তাকে চোখ ভরে দেখি।মস আর ফারণে ঢাকা সবুজ গালিচা জেরেনিয়াম আর গাঁদায় ভরা বারানদা।মাথার ওপর রঙিন পতাকার সারি।হাওয়া য় দুলছে।পাশেই ছোট ঝোরা।তাতে বেশ নাদুসনুদুস এক পাহাড়ি মা ভৌভৌ দুটি গোলগাল ছানাপানা নিয়ে জল খাচ্ছে ।দেখে মনে হল আইভির সুরুয়া খেয়ে ই এত গোলগাল ।বৃষ্টির রাতে দরজা খুটখুট করবে না তো কি করবে?ভয় কোথায় পালিয়ে গেল।
মোং য়ের নাতি গরম রুটি ভেজে দিল। আলুর ছোকা দিয়ে খেতে যেন অমৃত।এবার ফিরবো।মোং কোথায়?তাকে দেখছি ন?
নাতিবাবু একগাল হেসে বললে দাদুর তো কবে ই ইনতেকাল হয়ে গেছে।তবে কিনা মাঝেমধ্যে ঝড়জলের রাতে এসে রান্না করে যায়।রাঁধতে বড় ভালবাসতো কিনা!

No comments:

Post a Comment