Friday, 6 May 2016

হস্টেল

হস্টেল -২
 ‘শোন,তোর হলুদ চুড়িদার সেট টা আজ আমি পড়ছি,তুই আমার ব্লু শার্ট টা পড়বি?’
জনা বারো সদ্য উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করা মেয়ে একইসঙ্গে দু-দশ দিনের তফাতে সেই হস্টেলে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে কারো বাড়ি দুর্গাপুর,কেউ এসেছে দিল্লি থেকে,কারু বা বাড়ি গৌহাটি,কেউ জামশেদপুরের ,আবার কেউ মালদা থেকে গেছে তো কেউ গেছে নাগপুর থেকে। কেউ কাউকে চেনে না,সব্বাই মা-বাবাকে ছেড়ে একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়চত্বরে ঢুকে পড়েছে...। ঠাঁই হয়েছে মেয়ে হস্টেলের একতলার ঘরগুলোতে।প্রত্যেকের বরাদ্দ একটি করে তক্তপোষ,একটি চেয়ার,দেরাজয়ালা টেবিল,একটি দেওয়াল আলমারি,আর টেবল-ল্যাম্প। তক্তপোষের নীচে স্যুটকেস-ব্যাগের অধিষ্ঠান। কিন্তু হপ্তা-খানেকের মধ্যেই দেখা গেল সুমিতার সাদা ওড়না রুমার গায়ে,পর্ণার সবুজ কুর্তা মৌরির এত পছন্দ যে সাত দিন ও ওটা পড়েই ক্লাসে গেল আর পর্ণা পরল রীতার চেক শার্ট। একা একা বড় হয়েছি।হস্টেলে গিয়ে নিমেষে সব নিজের হয়ে গেল। তক্তপোষে নতুন তোষকের ওপর নতুন চাদর,ঝকঝকে টেবল-ক্লথ,তার ওপর ফুলদানি,পাশে নতুন বইয়ের ভীড়।।দেওয়ালে সুন্দর পোস্টার ।ছবি,জানলায় হরলিক্স।কমপ্ল্যান। মাগে সাবান,টুথপেস্ট,ব্রাশ... আলনায় তিনজনের পোষাক-আশাক, মেয়েহসটেলের রূপ খুলে যায় বাসিন্দাদের গুণে।  সামনে করিডোরে সবেধন নীলমণি কালো টেলিফোন...।।যার ফোন আসে সেই ভাগ্যবানের নাম ধরে চিৎকার করার জন্য একজন অ্যাটেডেণ্ট আছেন...।রুম নাম্বার তেইশ...অদিতি ঘোষ।।ফোন আছে...।অদিতি দুরদুর করে দৌড়ে এল।।বাবা-মা ফোন করে নিশ্চিন্তি...মেয়ে ভাল আছে। তা বলে কি বাবা-মা-মাসি-পিসি ছাড়া ইস্পেশাল ফোন আসতনা কারু কারু? এতো মোবাইল ফোন না যে তথ্য গোপনীয় থাকবে! ল্যান্ডফোনে সবই ওপনীয়!!! ছ –নম্বর ঘরে সান্ধ্যকালীন আড্ডা হচ্ছে। সুমিতা ক্লাস শেষে কেলান্ত,পায়ের ওপর চাদর ফেলে শুয়ে।ওর পায়ের কাছে হেলান দিয়ে পাঞ্চালী যাকে পাঁচ বছর পাঁচু বলেই ডাকলাম,কাকলির সেমেস্টার সামনে।।ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে।। তাও আড্ডার গন্ধে চলে এসেছে বোর্ডে ফার্স্ট হওয়া মেয়ে।। সায়ন্তনীর লম্বা চুল আঁচড়াচ্ছে রূপা। টেপে পঙ্কজ উদাস মন  উ্দাস করা গান গাইছেন।। রত্নামালা র্যা কেট বাজিয়ে তাল দিচ্ছে।। মৈত্রেয়ী বকবক করতে করতে স্যুটকেস গোছাছছে...।বাইরে ঘোষণা হল ।।রুম নাম্বার নীপা চ্যাটার্জি...।ফোন!
আমরা চুপ হয়ে গেলাম।সবাই জানি এ ফোন যে সে ফোন নয়...বিশেষ ফোন।নীপা আমাদের সিনিয়ার।ইকনমিক্স পড়ে।মিলিটারি ব্যাকগ্রাউন্ড। প্রচন্ড স্পীডে,জোরে কথা বলে।।ওর প্রেমটাও খোলামেলা। রোজ চেঁচামেচি করে ঘন্টাখানেক বিএফ এর সঙ্গে ফোনালাপ করে..।।তারপর একহয় পড়তে বসে নাহয় ঘুরতে যায়।  মিলিটারি স্মার্ট মেয়ে। আমরা সতর্ক ।ফোনে কথা হইতেছে...আমরা শুধু এপারের কথা শুনিতেছি।
নীপাঃ‘আজ আর যাচ্ছি না’
এই ঘর থেকে পাঁচু জোরে জোরে বলল ‘কাল ঠিক যাবো’
নীপা ফোনেঃ হাউ সুইট!!!কি মিষ্টি!!!
রুমা আওয়াজ তুললো-  দুলালের তালমিছরি!  ভীমনাগের সন্দেশ, গাঙ্গুরামের রসগুল্লা...
নীপা ফোনেঃ ডোন্ট বি সিলি!
সুমিতা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে  চেঁচালো,বললোঃ  সিলি, ইডিয়ট,রাস্কাল,জোকার,ডাইনোসোরাস...
এত জোরে যে ফোনের অইপ্রান্তেও বোধহয় শোনা গেল... প্রেমিকযুগল এবার বিরক্ত হয়ে ক্ষান্ত দিল,আমরা ডিনার বেল পড়েছে।।খেতে চ...। বলে  নাচতে নাচতে ডাইনিং হলে  চল্লাম! সেখানে আর এক প্রস্থ কিছু হবে!সেইসব সুগন্ধ একদিনের জন্যও একলা হতে দেয়নি,দেয়ও না।
 সেই এক বিঘত জমি যা তারার মত জ্বলে...।পাখির পালক হয়ে সারাজীবন  উষ্ণতায় মুড়ে রাখে।

2 comments: