সারাদিন ঠান্ডা আর
ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে মালদা যেন কেমন পাহাড় পাহাড় হয়ে আছে।ঐ রকম স্যাঁতস্যাঁতে, কুয়াশা
কুয়াশা। হরেক ঋতুতে পাহাড়ে বেড়িয়ে অভ্যেস আমার ।সেটা হয়েছে আমার বাবার দৌলতে।বাবার
ছিল সাংঘাতিক পাহাড় –প্রীতি।আর কোথাও না হোক ,বছরে চার বার হয় দার্জিলিং,নয় ক্যালিম্পং,নয়
গ্যাংটক ।মা মাঝে মাঝে খুব রেগে যেতেন,আর কি কোথাও যাবার নেই? অবশ্য রেগে যাওয়ার
কারণও ছিল বইকি!!পাহাড়ে গিয়েই চা জলখাবার খেয়ে বাবা তাঁর ইজেল রং তুলি নিয়ে বেরিয়ে
যেতেন সারাদিনের জন্য।সারাদিন ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকতেন। হোটেলের ঘরে মা আর আমি,তখন
ছোট,সারাদিন গল্পের বই মুখে। মা বেচারী বিরক্ত হয়ে যেতেন,একা বেরনোর অভ্যেস তাঁর
ছিল না। একটু বড় হয়ে আমিও বাবার সঙ্গ নিয়েছি।অনেক পাহাড়ি গ্রামে ঘুরেছি
তখন,বৃষ্টিতে,শীতে...বসন্তে।মা গভীর ধৈর্যে আমাদের সেই অবাধ বিচরণকে প্রশ্রয়
দিতেন,মাঝে মধ্যে রাগ টাগ গুলো যা অনিবার্য।
বাবা চমতকার নেপালী
জানতেন।।অনেক পাহাড়ি ছাত্র ছিল তাঁর, এখন হোমস্টে তে থাকার সময় সেই বাড়ি গুলো মনে
পড়ে।কি অনায়াস আতিথেয়তা ছিল তাঁদের!বাবার আরেক শখ ছিল রান্না,বিশেষ করে
মাংস।খাওয়াতে ভালবাসতেন খুব।এমনো হয়েছে দিন পনেরোর জন্য পাহাড়ি শহরে কোনো ঘর ভাড়া
নিয়ে থাকা হোলো।বাবা অসাধারণ কসা মাংস রাঁধছেন সন্ধ্যের পর,বাইরে প্রবল বৃষ্টি,
লেপের তলায় আমি...মা বাবার হেল্পার...ঘরে রংএর গন্ধ আর মাংসের গন্ধ মিলে-মিশে বেশ
একটা মৌজ তৈরী হোতো। মা খুব শান্ত মানুষ ।তাও একেকদিন বলে ফেলতেন...সব যে ঘুরে-বেড়িয়ে টাকা পয়সা শেষ করছো,মেয়ের জন্য
তো কিছু রাখবে? আমার বাবা খুব নির্বিকার ভাবে উত্তর দিতেন।।আমার মেয়ে কে এমন করে
মানুষ করছি যে ও নিজেরটা নিজেই করে নিতে পারবে।
বাবার আঁকা অ্যাডিউ
ক্যালিম্পং বলে ছবিটি দীর্ঘদিন অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে পিছনের গ্যালারিতে ছিল। লেডী রাণু মুখার্জি
চেয়ে নিয়েছিলেন।আর এখন সদলে হোক বা একা...শিলিগুড়ি গেলেই পাহাড় আমাকে হাতছানি
দেয়,আর আমি টুক করে একটু পাইনবনে ঘুরে আসি। উত্তরাধিকারসূত্রে বাবা আমাকে পার্থিব
সম্পদের চেয়ে অনেক বেশী কিছু দিয়ে গেছেন...তা হোলো একটা গোটা হিমালয়।পাহাড়ে গেলে
আমার মনে হয় যেন আরেকটা বাড়ি আমার...সেখানে কোথাও ঝরণার পাশে ইজেলের সামনে রং-তুলি
হাতে ছবি আঁকছেন সেই মানুষটি...।আমার বাবা।

No comments:
Post a Comment