Sunday, 17 April 2016

হস্টেল আর আডডা


টুপটাপ জল পড়ছে মাথার ওপর বিশাল গাছটা থেকে,দুটো ক্লাস অফ,বৃষ্টি ধরেছে কিন্তু টুপ্টুপানি থামেনি।সোমা আর অনুরাধা হস্টেলের রাস্তা দিয়ে ফিরছে...হঠাত সোমা বললো।।চল,বাবলুদা’র কাছে যাবি? তিনি আবার কিনি? সোমার বাড়ির অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে...।সোমার দিদি দোলাদি।।অসম্ভব সুন্দরী।সাধারণ বাঙ্গালী ঘরে অমন সুন্দরী দেখা যায় না।মোম পালিশ গাত্রবর্ণ।লম্বা ৫’৫,দেখেই সবাই ফ্ল্যাট।সমস্বরে  বললাম...তোর দিদির পাশে দাঁড়াব না,আমাদের কাজের লোক মনে হবে ।তাকে চিনি। আরতিদি এসেছেন মুম্বাই থেকে।তাঁকে গিয়ে বলে এসেছি...আপনি লতা-আশাকে চেনেন? দেখেছেন?আর মিছরির মতো ধমক খেয়েছি।।‘ছি ছি।।বলো লতাজি-আশাজি...ওঁরা কি তোমাদের ক্লাসমেট যে লতা-আশা বলছো?’ আরতিদির ঠিক পরের বোন এবং তাঁর বর মাঝে মাঝে হস্টেলে আসতেন ওঁদের গাড়ি নিয়ে আর আমাদের গুটি কয়েকজনকে নিয়ে বেড়াতে যেতেন,প্রভূত ভালো ভালো খাওয়াতেন মোকাম্বো,ওয়ার্লডর্ফ, জিমি’স কিচেন এমনকি গঙ্গার ধারে গে-তেও। দিদি আর দিলীপদাকে ও তো চিনি।বাবলুদাটি আবার কে?  সোমা হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল।কোথায় যাচ্ছিস? সোজা লিফটে নিয়ে তুলল আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের চারতলায়।।এইছ।ও।ডি।।সমরেশ মুখোপাধ্যায়...।সোমার বাবলুদা এবং আমদেরও। আড্ডা খুব জমে গেল কারন বাবলুদার মতো রসিক পণ্ডিত সংসারে বিরল,অরণ্যেও।
আডডা আমার মতে বেশ কয়েক প্রকার এক হোলো অলস আড্ডা। গান চলবে।শুনব কিন্তু শুনব না। কথা হবে কিন্তু হবে না,প্রচুর বাজে বকা হবে, অবান্তর আলাপ-প্রলাপ হবে..এ হল নার্ভ ঠান্ডা করার আড্ডা।  নার্ভ চাঙ্গা করার জন্য চাই বৈঠকি আড্ডা,তাকে মজলিশি আড্ডাও বলা যায়।।সেখানে মূল উপজীব্য হল গান।।।এছাড়া আছে ডেস্ট্রাকটিভ আড্ডা...চূড়ান্ত পি।এন পিসি,মানুষজনকে ছারখার করে দেওয়া আড্ডা।আছে আরো। তাকে কেউ কেউ ইন্টেলেকচুয়াল আড্ডা বলে বটে কিন্তু আমি বলি কন্সট্রাকটিভ আড্ডা।এটা হল প্রাণদায়িণী আড্ডা...কত নতুন নতুন চিন্তাভাবনা! এরও  পর আছে ডি-কন্সট্রাকটিভ আড্ডা। বাবলুদা আমাদের সেই আড্ডার অংশীদার হলেন...গান্ধী থেকে মার্ক্সবাদী,নারীবাদ থেকে সাম্যবাদ,সবক্ষেত্রে অবাধ বিচরণ।। আমরা সদ্য কামু-কাফকা-সার্ত্র-সিমোন পড়ুয়ারা তর্ক করার দুরন্ত প্ল্যাটফর্ম পেলাম। সাহিত্য,গান,নাচ,ফিলিম,নাটক...বাবলুদা,ছোটখাট মানুষটি বিধ্বংসী কথা বলে লড়িয়ে দিতেন। অচিরেই তাঁর বাড়িতে নেমন্তন্ন পেলাম।ভবানীপুরে ইন্দিরা সিনেমাহলের পাশের গলিতে ছোট্টো বাড়িতে   থাকতেন বাবলুদা আর সুমিতাবৌদি। সুমিতাবৌদি নীলতরতন সরকারের নাতনী,ঈশান স্কলার,পেশায় সার্জন, চমতকার গানের গলা। ইন্দিরা তে ছবি দেখা মানেই ওদের বাড়িতে আড্ডা আর ভোজন। বাবলুদা ইউনিভার্সিটিতে দুটো ক্লাস নিয়ে বাড়ি ফিরে পায়ের ওপর পা তুলে গপ্পো করছেন,আর সুমিতা বৌদি অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে রেশন তুলে,আমাদের জন্য ফুলকপির সিঙ্গারা ভাজছেন...।সঙ্গে চা,কফি।। তারপর টিকিট কেটে আমাদের হলে বসিয়ে আসাও তাঁর ই কাজ,বাবলুদার বক্তব্য ওরা ডিনার করে যাবে... বৌদি ফুলকপি দিয়ে পাব্দা মাছে ঝোল রেঁধে রেডি!সেই অতি ছোট বাড়িটির ,সত্যি একচিলতে বারান্দার মতো সরু ,সুসজ্জিত বসার ঘরটিতে কত গল্প আর গানের স্রোত বয়েছে! একবার তো কয়েকজন থেকেই গেলাম রাতে।ফোন করে বাড়িতে,হস্টেলে জানাবার দায়িত্ব ওঁদের।ঢালা বিছানা হল মাটিতে। সারা রাত গপ্পো।সকালে লুচি-কালোজিরে দেওয়া আলুর ছেঁচকি খাইয়ে বৌদি ছাড়লেন। ইদানীং যে সব বিষয় নিয়ে দেওয়াল লিখন,ভিডিও পাঠ হয়,আমরা সেসব নিয়ে তখনো আলোচনা করতাম।কোনো অসুবিধে হয়নি।শুধু মা শুনে ফোনে বলেছিলেন ‘তোরা পড়িস  কখন?’
বাবলুদা প্রবল প্যাট্রিয়ার্ক।।বাড়ির কোনো কাজ করেন না।আমরা সদ্য অর্থ,পরমা ,আঙ্কুশ দেখার দল বিস্তর ঝগড়া করি। বৌদি অসীম দক্ষতায় মেডিকাল কলেজ,রোগী, সংসার,ছেলে মেয়ে সামলান। বাবলুদা বেতের চেয়ারে বসে সব নস্যাৎ করেন। এরকম অনেক দিনের গপ্পো জমা হয়ে আছে...।ভবানীপুরের সেই ছোটো বাড়ির একচিলতে খাবার ঘরের।।
অনেকদিন পর, তখন মালদায় চাকরি করছি...সংসারটিতে বিচ্ছেদের খবর পেলাম।মন খারাপ না। অনেক ছবি যেন ফালা ফালা হয়ে ছিঁড়ে গেল। প্রখর, তীব্র কোনো তরবারি টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে নরম পালক...একটা ছবি রয়ে গেছে। বসার ঘরে প্রবল গল্প করছি আমরা। বৌদি মাঝে মাঝে খাদ্য সরবরাহ করে চলেছেন। ওঁদের মেয়ে ডোনা আসছে যাচ্ছে। ছেলে ঋজু অর্ধেক বইতে,অর্ধেক আমাদের গল্পে। সে তখোনো হাফ-প্যান্ট। আসার সময় হাত নাড়ছে সবাই... বাবলুদা,বৌদি,ডোনা,ঋজু...।বৌদি বলছেন ‘বাসে তুলে দেব?’
সেসব ছবি মোছে না কখোনো।
ভালো কথা...।ঋজুর ছবি ‘চতুষ্কোণ’ এবার জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছে।

No comments:

Post a Comment