Sunday, 17 April 2016

শান্ত মেয়ে

যাকে বলে শান্ত মেয়ে,আমার মা একেবারে তাই।বাবা আর আমার ওপর যেটুকু রাগারাগি।সেও খানিকের।কারণ আমরা দুজনেই খেয়ালি।যখন যেটা মাথায় চাপে তখন সেই নিয়ে লেগে থাকি।নাওয়া খাওয়া ভুলে।দুজন খ্যাপা কে নিয়ে সংসার করার হ্যাপা সামলাতে আমার শান্ত মা জেরবার।রান্নাবাননা শেষ।বাবা একগাদা কুচোমাছ এনেছেন ।সেইটুকু যা রাগ।বা আমি পড়াশোনা না করে ছবি আঁকছি।সেই শান্ত স্বভাবের রেশ শেষ সময়েও যায় নি।নার্সিংহোমে আচ্ছন্ন অবস্থাতেও যখন কানের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করছি "কষ্ট হচ্ছে? কি কষ্ট মা?"--ক্ষীণ উত্তর আসে-"আমার কোন কষ্ট হচ্ছে না।"ওদিকে ডাক্তার হিমশীতল কন্ঠে জবাব দিয়েছেন মাল্টিপল অরগান ফেইলিওর শুরু হয়ে গেছে।চেতনা লুপ্ত হয়ে আসছে ক্রমশ ।
তাই ভাবি এই এক প্রজন্ম ছিলেন।নিজেদের অসুবিধার কথা ভাবতে শেখেন নি।সদা সর্বদা বাবার শরীর নিয়ে তার চিন্তা ।বাবার ওষুধ ।বাবার ডাক্তার ।চিন্তা করতে করতে নিজের না আছে খাওয়ার ঠিক ,না আছে ঘুম।কাজেই শরীর ভাঙে।রক্তে শর্করা পল্লবিত ।ডাক্তার বলেন টেনশন করবেন না।বাবা চলে গেলেন বিপুল থরমবোসিসে।মা কি অসহায় ডিপরেশনে তলিয়ে যাচ্ছে ।সেই আমার মস্তিষ্কে আসছে মেয়েদের কথা।তাকে পোষাকি ভাষাতে নারীবাদ বলে।একা আমাকে নিয়ে দূরে কোথাও যেতে কি ভয় তার!সে ভয় কাটাতে অনেক সময় লেগেছে।চলো না মা যাই।ঠিক পারবো।এক হাতে শক্ত করে ধরা সেই শান্ত হাত।অন্য হাতে ঝোলাতে ইনসুলিন  আর চিনি।বাড়লে ইনসুলিন।কমলে চিনি।কম কি ঘুরে বেড়ালাম!
বাইরের কাজ বেড়ে চলে।শান্ত মানুষটি একা থাকেন অনেকটা সময়।শর্করা ছড়ায়।চোখের জোতি কমে।বই পড়া মানুষটি বিষন্ন ।অপারেশন হয়।ভীষন খুশী ।আবার বই পড়তে পারছেন!আমি ভাবি এমন অনেক অনেক মায়েদের কথা ।কত একা।অসহায়,উন্মুখ ।যদি বাইরের জগত টি এঁদের কাছে খোলা থাকত ,এত দুর্বলতা  হয়তো গ্রাস করত না।নিজের মত করে ভাবতে পারতেন।দিন ভাল যায় না।ডেমেনসিয়া আসে।সব তলিয়ে যাচছে বিস্মৃতিতে।চোখে বিহ্বল দৃষ্টি ।সংসার সামলাতে হিমশিম খাই।শান্ত মানুষটি খেয়াল রাখতেন সব যে!চাল লাগবে না তেল সেসব হিসেব মাথায় পড়ল হুড়মুড় করে।নাজেহালের একশেষ।শান্ত মা তখন অবোধ শিশু।
এতদিনে বুঝি পড়াশোনার মত সংসারের ও একটি হোম ওয়ার্ক আছে।মা হাতে ধরে স্কুলের হোম ওয়ার্ক করাতেন।ঠেকতে ঠেকতে সংসারের হোম ওয়ার্ক টা শিখে গেছি।কাল সকালে কি হবে আজ রাতেই ভাবি।চাই কি মেপে বের করে রেখে দেই চাল ডাল।আনাজপাতি র কম্বিনেশন ছক করে রাখি।
মা বলতেন-আগের দিন রাতে ই হোম ওয়ার্ক শেষ করা চাই।সকালে শুধু রিভিশন।
সেই ফর্মূলা দিব্যি চালাচ্ছি ।
মা'র চলে যাওয়া আজ সাত বছর হল।একেই বোধহয় বলে----দিন যায়।

No comments:

Post a Comment