কলকাতায় আমাদের ফ্লাটের সামনে একটা লম্বা টানা বারান্দা ছিল কোলাপসিবল গেট দেওয়া ।সেটা আমার ছোটবেলার খেলার মাঠ,পড়ার জায়গা,ছবি আঁকার কোণ।লোডশেডিং হলে বাবা আমি বসে ঐ বারান্দায় গলা ছেড়ে গান গাইতাম ।কোলাপসিবল এর ফোঁকর দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরতাম আর উল্টো দিকে ধোপাবাড়ির কাজ দেখতাম কিংবা ছেদীলালের দোকানের কেনাবেচা।রবিবার এলে আমাদের বারান্দা আনন্দে থৈথৈ করতো।বারান্দার দুই প্রান্তে দুটো বেতের চেয়ার ছিল।একটা বাবার একটা মার।একটা ছোটো চেয়ার আমার।রবিবার বাবা অনেকসময় ধরে কাগজ পড়তেন।আমাকে পড়ানো ও চলত তার মধ্যে ।আর অসংখ্য বারবার চা।বাবার নিজের হাতে তৈরি ফোলডিং টেবল ছিল বারান্দা তে ।তার গায়ে ছবি সেট করা।তলায় কাগজ রাখার জায়গা ।সেখানে আমাদের জলখাবার খাবারের পালা।লুচি আলুচচচড়ি ।বাবার ইজেল ঐ বারান্দার এককোণে।সারারাত ছবি আঁকার জন্য ওটি বড় ভাল জায়গা ছিল। রবিবার আমাকে বসিয়ে ছবি আঁকা।পোর্টেইট এর মাহাত্ম্য বুঝতাম না তখন।ছটফট করতাম।বাবার হাতে তুলি আর মুখে গল্প ।একমাত্র গল্পের লোভে বসে থাকতাম।ছবি আঁকা হয়ে গেলে কি আনন্দ কি আনন্দ! রবিবার এর দুপুর ঝলমল করতো ছবিতে গানে দুপুরবেলা গল্পের বই য়ে।মুসুরডালে গন্ধ লেবু, মৌরলামাছের চচ্চড়ি, কৈ মাছের সরষেপাতুড়ি।আমি অবশ্য তখন একেবারে মাছ ভক্ত ছিলাম না।জোর করে গেলানো হতো।
ঐ বারান্দা তে সারাদুপুর উপুর হয়ে আমার ছবি আঁকা আর বইপড়া।আলমারি খুলি আর বারান্দায় এসে বেতের চেয়ারে বসি।ভেতরে গান বাজে।রবিবার দুপুরে রেডিও চলে।হাতে টানা রিকশা চলে ঠুনঠুনি বাজিয়ে ।জয় নগরের মোয়া হেঁকে যায়।কালো বাক্সে কেক পেস্টরি ওয়ালা চলে।তার বাক্সে থাকে থাকে লোভনীয় খাদ্য বস্তু ।বিস্কুট জেঠু আসেন আড্ডা দিতে।লম্বা টানা বারান্দা যেন লিভিংরুম।হাসি গল্পে জমজমাট।বাবার হাতের কচ্ছপের মাংস।রবিবার আলোকিত।বাবা বই পড়ে শোনাচ্ছেন জোরে জোরে ।আরণ্যক ।নানারকম আলো ছিল বাবার নিজের হাতে বানানো ঐ বারান্দাতে।তারই একটি আলোতে আবছায়া ।যেন আলোআঁধারির অরণ্য সত্যি নেমে এসেছে বইয়ের পিতা থেকে ।ওরকম একটা রবিবার বাবার হাত ধরে দেখতে যাই ডেনমার্ক এর রাজপুত্রের জীবনছবি।কোজিনতসেভ।বাবা বলেন বাড়ি গিয়ে বইটি পড়ার চেষ্টা করবে।আমি তো কিশোর ভারতীতে অনুবাদ আগেই পড়ে ফেলেছি!
রবিবার আমার এখনো ঐ আলোতে রোদ্দুরে জমজমাট।সারাসকাল গান ভাসাভাসি করে।খবরের কাগজ লুটোপুটি খায় কফির গন্ধ মেখে।সন্ধা মাসির পছন্দ কচুশাক দিয়ে ইলিশ মাছের মাথা। মিস্ত্রি কাজ করছে খটমট শব্দে ।ভৌভৌ রা বকছে তাদের।মাসি তাদের চা জলখাবার দিতে দিতে বকবক করে।স্নানের দেরি হচ্ছে না!।আমার এখনকার বারান্দা অনেক ছোট।কটা টব রেখে ই ভরতি।
বাবা মা রা বেতের চেয়ার দুটো আজ ও আছে।খরগোশি পুশকিন তাতে বসে থাকে।ফাঁকা থাকে না কিছুই।শুধু ছোটো চেয়ার টি নেই। তার মালিক নেই যে!

No comments:
Post a Comment