Shared privately
Sep 26, 2015
একসময় ইচ্ছে গুলো আকাশে মেঘ হয়ে ভাসতো।মাঝে মাঝে ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি হত ইচ্ছে পূরণের।টইটম্বুর ভিজে আমরা হোস্টেল বালিকারা রংবেরং এর ফুল হয়ে ফুটতাম।সারা মাঠে আমাদের সবুজ দৌড়াদৌড়ি ।সারা সন্ধা ভিজে রাতে তুমুল জ্বর এল স্বাগতার।আমরা জলপটি দেই।থারমোমিটার লাগাই ।জ্বর কথা শোনে না।খুব ভয় করে আমাদের।আমরা দৌড়ে যাই সুপারের ঘরে। "দিদি দিদি স্বাগতার খুব জ্বর। কি সব বলছে জ্বরের ঘোরে।ওষুধ দিয়েছি।কমছে না। সুপার দুটি কন্যার জননী।তিনি তাদের নিয়ে ডিনারে বসেছেন সাজিয়ে গুছিয়ে।মাছের কাঁটা চুষতে চুষতে বললেন "তো আমি কি করব?লোকাল গার্জেন ফোন করো"
আমরা হতবাক।এঁরই অফিসিয়াল দায়িত্বে মা বাবা রেখে গেছেন সদ্য তরুণীদের দলকে।
বুঝলাম এখানে আমাদের কোনও অভিভাবক নেই।আমরা সবাই একা একা।বর্ষা যদি জ্বর হয়ে আসে ,আমরা নিজেরাই হয়ে যাব নিজেদের ছাতা।হোক পলকা।হোক ফুটো।ডাঁটি উলটে যাক।তবু তো মাথা বাঁচবে।তাই বর্ষা মাথায় করে চললাম ডাক্তারের খোঁজে।ভাগ্যিস এখানে কড়াকড়ি কম।সে নিয়ে নিন্দা করার শুভাকাঙখীদেরো অভাব নেই।তবে ঠেকা বেঠেকায় নিয়ম আলগা না হলে যে বিপদে পড়তে হয় তাও সেই হোসটেল-পাঠ।ডাকতারবাবু ওষুধ লিখে দিলেন।আসবেন পরেরদিন সকালে।ওষুধ নিয়ে ফিরি।পালা করে রাত জাগা চলে।জ্বরের ঘোরে স্বাগতা ,কম্পিউটার সায়েন্স প্রলাপ বকছে"দিদি,আমাকে জেঠুর বাড়ি পাঠাবেন না প্লীজ । ওরা বিরক্ত হবে।"আমরা কেউ কেউ চমকে উঠি।ভাবি তাও আবার হয় নাকি?মনের গভীর কোণে কেউ আমাকে পাতা বুলিয়ে দেয়।সদ্য কৈশোর পার হওয়া মেয়েরা তখন জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকা মেয়েটির দিদি বোন মা হয়ে ওঠে সহজেই।মাঝরাতে ঘরের কোণে হিটারে জল গরম হয়। সুপ্রিয়া পড়ছে।রীতা আর সুমিতা স্বাগতার বিছানায় ওর মাথার কাছে পায়ের কাছে।জলপটি চলছে।রাত জাগুনিদের জন্যে কফি হবে। জ্বর একটু কমলো? এই বার রিতা শুতে যা।রুমা উঠে গেছে।হোস্টেল ঘরের নিষ্প্রভ ফ্যাকাশে দেয়াল,রাশিরাশি জামাকাপড় চড়ানো আলনা,বইপত্র ভর্তি বিছানা টেবিল, ঘড়ির টিকটিক ।রাত বাড়ে।মৃদু গপ্প হয়।রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়তা বাইরে এক গভীরতর আত্মীয়তা জন্ম হয়।তার নাম বন্ধুত্ব ।
মনের কথা আদানপ্রদান চলে।একটু আধটু পি এন পি সি।তার মধ্যে বন্ধু কে ধরে টয়লেটে নিয়ে যাওয়া।থারমোমিটার।এই একটু কমেছে।হালকা করে হরলিকস খাবি?ভোর হল বুঝি! স্বাগতা ঘুমাল।টেপে খুব আস্তে গান চালিয়ে দেয় সোমা।আমির খান।পরদা ওড়ে পাখার বাতাসে।ভোরের নরম আলোতে হোসটলের বিষন্ন ঘরটি কেমন মায়াময় হয়ে ওঠে।অলৌকিক ভালবাসারা জন্ম নেয়। আমির গানের বিষন্ন ভারি কন্ঠে আলাপ ঘরের মধ্যে বাতাসের সঙ্গে ঘুরপাক খায়।বন্ধুর জ্বরো কপালে আদরের হাত রাখে।
আরো একটু আলো ফুটলে সিনিয়র দিদির এসে খোঁজ নেয়।।।।।"ইস!!!রাতে বলিস নি কেন?ডাকতে পারতিস!"এই সেই সিনিয়র না,যে রয়াগিং করার সময় ভীষন আওয়াজ দিয়েছিল?সেই রাগি দিদি ,যার চোখ আশ্চর্য রকম সুন্দর, সে কতবার এসে খোঁজ নিয়ে গেল।রূপাদি ,যাকে দেখতাম মত টিপ আর কানে ঝুমকো,ব্লক প্রিন্ট ঝলমল করে ক্লাসে যাচ্ছে, সে স্পনজ করে দিচ্ছে আমাদের অসুস্থ বন্ধুকে ।"তোরা রেস্ট নে।ক্লাসে যা।"রূপাদি একদম মায়ের মত ভালো ।সিগারেট ফোঁকা ঢুলুঢুলু চোখ রুমি, যাকে প্রথম প্রথম ভয় পেতাম খুব,সেও তো এসে দিব্যি খোঁজখবর করে গেল,স্বাগতা আর ভুল বকছে না।
আস্তে আস্তে সম্পর্ক গুলো দানা বাঁধে, বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়।নাদুশনুদুশ সুপার খেয়ে দেয়ে পান চিবিয়ে দুলকি চালে ঘরে আসেন "কেমন আছে?এখনও লোকাল গার্জেন কে খবর দেওয়া হয়নি?"
আমরা অন্য দিকে তাকাই।অগ্রাহ্য করার বিদ্যে রপ্ত হচ্ছে তখন।দুপুরবেলা সুমি থেকে যায় ক্লাস বাদ দিয়ে।রেফারেন্স লিখছে বন্ধুর পায়ের কাছে বসে।দরকার মত এগিয়ে দিচ্ছে জল,ওষুধ খাইয়ে দিচ্ছে ।কোনো বিরক্তি নেই।
সে মেয়ে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠে।সেরে ওঠার আনন্দে ঘরে আড্ডার আসর আবার দানা বাঁধে।হোসটেলের সকাল খুব নিজস্ব। কেউ প্রগাঢ় ঘুম,কেউ বই মুখে।সময় নেই কারো।সন্ধা বেলা হালকা আডডা।জমজমাট আড্ডা বসে ডিনারের পর।অদিতি,রুমা,উর্মি, রত্না কেশ চর্চা করছে।একশ স্ট্রোক গুণে গুণে।মৈত্রী, পাঁচু, সোমা মুখে ক্রিম ঘষছে।শর্মিলা মাস্ক লাগিয়ে টানটান।স্বাগতার পিঠে দুটো বালিশ দিয়ে বসিয়ে দেই।ওর বাড়ি থেকে ফোন এলে বলি "চিন্তা কোরো না কাকিমা।একটু জ্বর ।"গানে গপপে ইয়ারকি ফাজলামি তে ঘর ঝলমল করে।শর্মিলা চোখ খুলছে না।মাস্ক নষ্ট হবে। তার মাথার চুলে কাগের বাসা ।রোজ পাফ করে চুল আঁচড়ায়।জামাকাপড় কাচে না।ঘেমো জামায় পারফিউমের গন্ধ ।তার আবার বয়ফ্রেন্ড আছে।উঁহু ।প্রেমিক নয়।প্রেম তো করে দেখাচ্ছে শুভা।সুমিদি।কমিটেড প্রেমিক প্রেমিকা ।চোখে হারাচ্ছে এ ওকে।বন্ধু দের হুকুম ।এপ্রিল লিস্টে ছড়া লিখি "সৌম্যলোকে সুমি তুমি নারায়ণের নারায়ণী/কেঁদো না পড়ুয়া মাগো বড়ুয়া হবেই তুমি।"সৌম্যদা গুড বয়।সৌম্যনারায়ণ বড়ুয়া।এদের নিয়ে চিন্তা নেই।এরা সিরিয়াস জোড়ি।শর্মিলা কে নিয়ে আমাদের ভীষণ চিন্তা ।সে দুর্ধর্ষ খেলোয়াড়।ফি সপ্তাহে বয়ফ্রেন্ড পাল্টাচ্ছে।আমরা চিন্তায় মরি।তার কথা পরে হবে।বন্ধুর জ্বর কিন্তু অনাবিল আনন্দের কাছে হেরে উধাও!!সেই সুগন্ধ আজও অমলিন ।