Sunday, 17 April 2016

আমার তর্পণ


বাবাকে আমি কখোনো কাপে চা খেতে দেখিনি।বাবা চা খেতেন গ্লাসে।এবং সারাদিনে কতবার চা খেতেন তারো হিসেব নেই,রাতে ঘুমনোর আগেও চা পেলে আপত্তি নেই।ভোরের চা টা বাবা নিজেই বানাতেন,মা বা আমি তখন ঘুমিয়ে।হাল্কা লিকর,চা য়ের সুবাসে আমার অনেকদিন ঘুম ভাঙ্গত,সে এক দারুণ আমেজ।বাবা বলতেন।।‘খাবি?”
পাহাড়ে গেলে কিন্তু দুধ-চা।মশলা সহযোগে।তাতে নাকি হাঁটার এনার্জি পাওয়া যায়। দেখতাম সত্যি তাই। বাবা আর আমি সকাল-দুপুর হেঁটে হেঁটে পার করতাম।অত হাঁটতে পারবেন না বলে মা হোটেলে ই থাকতেন। আমরা মুখে ছুরপি নিয়ে এলাচ খেতের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ি গ্রামে ঘুরaতাম। তাতে গলা শুকাতো না।বাবার জীবনের প্রথম চাকরি ক্যালিম্পং শহরে। সেখানে যে বাড়িটিতে তিনি থাকতেন তার নাম চিত্রভানু।দোতলায় থাকতেন প্রতিমা দেবি,রথী ঠাকুরের স্ত্রী।বাবাকে খুব স্নেহ করতেন।এখোনো বাবার আঁকা তাঁর প্রতিকৃতি বাড়িতে রয়েছে। বাবা সে বাড়ির একতলায় থাকতেন।গল্প শুনতাম,বাইরে যাবার সময় কদাপি বাড়িতে তালা দিতে হোতো না,পাউরুটিওয়ালা এসে পাউরুটি,দুধওয়ালা এসে দুধ,সব্জিওয়ালা সব্জি রেখে যেত বাবার ছোট্টো মিটসেফে।কিচ্ছুটি বাড়ী থেকে খোওয়া যেত না। তখন বাবা তাঁর ইকমিক কুকারে রান্না করতেন।মা তখনো তাঁর জীবনে আসেন নি। আমার ভারি অবাক লাগত।।তাহলে পাহাড়ে তালা চাবি লাগে না? এইভাবে পাহাড় আমার স্বপ্নরাজ্য হয়ে ওঠে…তারপর যখন হিমালয়ের সঙ্গে পরিচয় গভীর হল,দেখলাম সে এক আশ্চর্য স্বপ্ন।রাত্তিরে স্কাইলাইট খুলে দিলে ঘরে ঢূকে আসে মেঘ,জানলার কাচে নাক ঠেকিয়ে মুগ্ধ আমি দেখি পাহাড়ে,দূরে আলোর মালা,রোজ ই দিপাবলী যেন।আস্তে আস্তে আলো গুলো নিভে যায়…কি নিঃঝুম চারদিক!অই দিকে তাকিয়ে আমি বুঝি ধ্যানগম্ভীর মানে কি,আর অভিধান প্রয়োজন হয়না। টেবিল-ল্যাম্পের আলোতে বাবা পড়ে শোনান ‘আরণ্যক”।। এটি আমাদের খুব প্রিয় ছিল।।তিনজনই কিছু না কিছু পড়ে শোনাতাম।। সকালে উঠে দেখি খুদে খুদে টবে পাহাড়ি ফুলেদের গায়ে ভর্তি শিশির!রাতে জানলায় যে ছোট্টো বাটিতে দুধে চিনি গুলে রেখে দিয়েছিলাম,তা ঠিকঠাক না হলেও আমার তৈরি প্রথম আইস্ক্রীম!
বাবা চলে যাবার পর ,মাকে নিয়ে অনেক-অনেক পাহাড়ে ঘুরেছি।অরুণাচলের তাওয়াং হোক,বরফঢাকা ডালহৌসি বা পাশে অপ্রতিরোধ্য শতদ্রু কে নিয়ে অপরূপ কিন্নর…এ সব পাহাড়ে বাবার আসা হয়নি।।তিনি আমাকে পাহাড়ের রূপটি চিনিয়ে দিয়ে চলে গেছেন।তাই এখন যখন গাড়িটা হঠাৎ সমতল থেকে পাহাড়ী বাঁকে উঠে যায়…হাওয়া ঠান্ডা হয়ে আসে,কাঠের বাড়ীগুলো উঁকি দেয়… ছোট চায়ের দোকান থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ পাই…।তখন মনে মনে বলি…‘দ্যাখো বাবা,দ্যাখো,তুমি আমার চোখ দিয়ে দ্যাখো।দেখে খুশী হও…।এইভাবে প্রতিটি পাহাড়-যাত্রা আমার পিতৃ-তর্পণ হয়,মানুষের মধ্যে মানুষ বেঁচে থাকে…সেই চায়ের সুবাস আমার তর্পণের আবরণ,বাবার জন্য অন্য কোনো মন্ত্রপাঠ আমি করি না…পাহাড়ি হাওয়া ফিসফিস করে বলে…প্রযান্তি লোকায় সুখায় তদ্বত…।।আমি পূর্ণতর হই।

No comments:

Post a Comment