ভোজের আমি ভোজের তুমি ভোজ দিয়ে যায় চেনা।হতে পারে আর সবাই বাঁচার জন্য খায়,বাঙালি কিন্তু খাওয়ার জন্য বাঁচে।জন্মদিন, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধ, বিয়ে,প্রমোশন, পূজো,বিসর্জন, প্রেম দিবস,অপ্রেম দিবস ,খেলাতে জেতা হোক বা হারা,ইদানীং এর জি টি জি হোক বা ব্রেক আপ জয়ন্তী, বাঙালির মনের মণিকোঠা জুড়ে ভোজন রসনা।সপ্তাহানতে রজতেন্দ্র মুখুজ্জে র লেখা পড়ে ভাবি ভোজন শিল্প কে কোন স্বর্গীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছেন ভদ্রলোক ।সে এক পদের ভিনডি আছে।তাতে পোসতবাটা পুর দিয়ে খেলে নাকি মনে হয় নীল আকাশে এক ঝাঁক টিয়া পাখি উড়ে যাচ্ছে ।আহা!
ট্রেন ভ্রমণের সময় দেখি অবাঙ্গালী বহেনজি দিব্বি স্টিলের ডিববা খুলে দুটো শুখা পরোটা আলুভাজি আর আচার দিয়ে খেয়ে শুয়ে গেলেন।তার দাদিজি খেলেন রোটি আর দহি।তাতে একটু চানাচুর ছেটানো।অল্প বয়সিনী নেহা জি শুধু সেব আর শষা খেয়ে কাটিয়ে দিলেন। তাঁর ভাইয়াজি র দেখলাম ঠান্ডা পানীয় র নেশা।সহযোগে চিপস ।গুজরাতি বহুরাণী বাড়ির সককলের জন্যে ভাকরা আর আচার এনেছেন।লানচ ডিনার ঐ দিয়েই সারা। সরদার জি খেলেন কড়ি-রাইস।আর বাঙালি বাবু বিবির দল এসব খাওয়া দেখে এবাবা ছিঃ মা গো কি করে এই খেয়ে থাকে বলে নাক সিঁটকে রেলের ভাত,ডাল,তরকারি, মাছের ঝোল সাপটে খেলেন।তারপর রেলের খাবারের গুষটির তুষ্টি করে বাড়ি থেকে বয়ে আনা শুকনো মাংস,রসগোল্লা, কালোজাম খেয়ে মুখশুদধি করে পরের স্টেশনে কি খাবেন সে নিয়ে জল্পনা করতে লাগলেন! এই না হলে জিনদেগি!
যা হোক নববর্ষ গেল।খাওয়া দাওয়ার কথা না ভাবলে বাঙালিয়ানা থাকে? এসব কদাপি পুরোনো হয় না।
ছোটবেলায় দেখতাম নতুন বছর মানে বাবার বন্ধুরা কেউ সপরিবারে আসবেন।মাসি আসবেন ভাইকে নিয়ে ।মেশো চেম্বার সেরে দুপুর বেলা।নতুন বছরে চিরকাল টিপিক্যাল বাঙালি জলখাবার ।ধবধবে সাদা লুচি।কালোজিরে ফোড়ন দেওয়া সাদা আলুর তরকারি, কুমড়ো র ছক্কা, মিষ্টি ।যতই টিপিক্যাল বলো,এ খাবার আমার কাছে পুরোনো হয় না।এমনকি ডমিনোজ পিৎজার থেকে ঢের ভালো । অত দিস্তে দিস্তে লুচি মা কাকিমা রা গপ্পো করতে করতে দিব্যি বেলে ভেজে ফেলতেন ঘেমে নেয়ে।এটা সব বাঙালি বাড়ির কমন দৃশ্য ।তবে মাসি কোনদিন রান্না তে হাত লাগাতেন না।এটা কর ওটা কর বলে গাল গপপে চালিয়ে দিতেন।ছোটরা আমরা রাস্তায় ব্যডমিনটনে মগ্ন ।কালো ফেদার পাল্টে সাদা ফেদার পেলে জীবন ধন্য ।তখন বৈশাখ মাস এতো নিষ্ঠুর ছিল না।
বাবা একরকম মাছে খুশি হতেন না এইসব দিনে।সরপুঁটি ভাজা ।মসুর ডালের সঙ্গে মৌরলা মাছের চচ্চড়ি ।মিহি করে কাটা বেগুন আলু দিয়ে ।একদম জল থাকবে না।তাতে হাল্কা করে গন্ধরাজ লেবু চিপতে হবে। দই মাছ ভেজে হবে না কাঁচা? একটা তর্ক সভা বসে গেল।সে যাই হোক মেশো আসার সময় যে ইলিশ এনেছেন সেটা কিন্তু সর্ষে বাটাই চাই।নামানোর সময় একটু কাঁচা সর্ষে তেল ছড়াতে হবে।গোটা কাঁচালঙ্কা চিরে দিতে হবে।শেষপাতে গাঙুরামের দই।মিষ্টি ।আমাদের তিনজনের ছোট্ট খাবার টেবিলে সেদিন কুলোতো না।নববর্ষ মানে টেবিল চেয়ার সরিয়ে শতরনচি পেতে ঝকঝকে কাঁসার থালাতে সবাই মিলে খাওয়া ।বাণীকাকীমা কই মাছ করে এনেছেন সাত সকালে উঠে।ধনেপাতা দিয়ে বড়ি দিয়ে ।আমাদের ছোটদের পেটে অত জায়গা নেই।বড়রা ও হাঁসফাঁস ।ওটা রাতের জন্য থাক বরং।বাবা আর কাকুদের তুমুল আডডাতে চা ছাড়া কিছু চাই না।মা কাকিমা দের খাটে শোওয়া সুখ-দুঃখের আডডা।মায়ের ছোটমামা আমাদের ছোট দাদুভাই।তিনি সেদিন থাকলে আমরা আহ্লাদে আটখানা।উদ্ভট গপপে র ঝুড়ি।তাঁদের চার ভাই য়ের ডাকনাম মাখন,ছানা,ননী,পনীর।আমরা হেসে আকুল।পনীর থেকে তিনি পনু। বিকেলে আমরা সেই ছোটখাটো ধুতিপানজাবি পরা মানুষটির হেফাজতে ।বাদামভাজা,আইসক্রিম আর বুড়ির চুলে বেজায় খুশি সেই বিকেলবেলা এখনও মনের মধ্যে অমলিন।
রাততিরে বাবার শখের রান্না ।মুরগি র কিমা কষিয়ে আলাদা করে রান্না যারাহল। বড় মুরগি র পেট কেটে কিমা ভরে রোসট হল।সবাই খেয়ে আহা আহা করছে।শুধু বাণীকাকীমা বেজার।কই মাছটা কি হবে?অতএব মুরগি রোস্ট খেয়ে কই মাছ খাও!!!
পুডিং কেউ ছুঁল ই না।কাজলাদিদি রেগে আগুন। আবার দাদাবাবু রান্না ঘরে ঢুকেছিল! এত বাসন দেখেই বুঝেছি!
যাবার সময় আমরা ছোটরা ঘুমিয়ে যেতাম।কে কখন যেতো জানি না।
সেই ঘুমে ।এতদিন বাদে জেগে দেখছি অনেকেই চোখের বাইরে চলে গেছেন।যারা আছেন তাদের দিকে ভালবাসার হাত প্রসারিত থাকলো।
তবে কিনা এতে ও কিনতু আছে।সন্ধ্যা মাসি রাঁধে ভালো।আমার কাছে আসার আগে কোনো এক ডাক্তারের বাড়িতে কাজ করতো।মাসি রান্না বাড়ি করার পর ডাক্তার গিন্নী নূনটুকু নিজে দিতেন।তিনি কুলীন মানুষ। জাতপাত মানেন কিনা।বামুন ছাড়া কেউ রান্না তে নূন দিলে রান্না অশুদ্ধ হয়ে যাবে!! !!সেই নূন দেওয়া র ঠেলায় কেউ খেতেই পারতো না।মাসির মন খারাপ ।আচ্ছা বলো তো।রান্না তো আমি ই করলাম।নূন টা দিলেই অশুদ্ধ হবে?বলি,ওসব মনে রেখো না।শুদ্ধ অশুদ্ধ বলে কিছু নেই।আমার ঠাকুমা চিরকাল গোপালের ভোগ নিজে রাঁধতেন।বামুন মানুষরা কিছু বললে বলতেন যেদিন গোপাল আইসা কইবে যে তর হাতের ভোগ খামু না সেইদিন দেখা যাইব।অহন চুপ রও।
ভোগ রেঁধে,খেয়ে,এমনকি রোজ তিনচারখানি মিষ্টি খেয়ে ,জিরো ফিগার রেখে নব্বুই বছর বেঁচে সগগে গেছেন।দুঃখ কিসের?

No comments:
Post a Comment