Sunday, 17 April 2016

হস্টেলের গান

হস্টেল-৩।।গান তুমি হও মেঘলাদিনে।।
ডাইনিং হলে খাবার পরিবেশনের দায়িত্বে ছিল বিমলদা আর কমলদা।না,এরা দুই ভাই নয়।সহকর্মী।পরিবেশনে বিমলদা বেশ কিপ্টে ছিল।মাছের ঠিকঠাক টুকরো তার হাত থেকে পাওয়া খুব কঠিন।কমলদা সে তুলনায় ভাল।কখোনো কখোনো পেটিটা দিয়ে দেয় বা একটু বেশী আলুভাজা। বিমলদার কাছে চাইলে বলে।।নেই ,কখন ফুরিয়ে গেছে!!! একবার প্রেপ-লিভে দেরী করে খেতে গিয়ে দেখি মাছ নেই।কি খেয়াল হল আমার আর সোমার...।চল তো কিচেনে গিয়ে দেখি!!পেছনের দরজা দিয়ে কিচেনে গিয়ে দেখি ধামাচাপা দেওয়া খাদ্যবস্তু।।ইলিশ মাছের দশ বারোটি পেটি আলাদা করে রাখা,কাদের জন্য বলা বাহুল্য।আমি আর সোমা চুপচাপ দুটোবাটি নিয়ে খেতে বসলাম।স্নান করে এসে বিমলদার কি রাগ!!কেন তোমরা কিচেনে গেছিলে??? কি মুশকিল,ইলিশ মাছ খাবার সময় কেউ কথা বলে? তারপর থেকে ইচ্ছে করে দেরিতে খেতে যেতাম আর কিচেনে হানা দিতাম।
সেই হস্টেলবাসিণী হয়ে প্রথম বাজার করতে শেখা।প্রতিমাসে দুজন মেস ম্যানেজার।আগের রাতে মেট্রন শোভাদির কাছে গিয়ে মেনু ঠিক করা। শোভাদির ঘরটি বিশাল বড়।বিধবা।রোগা...।সাদা কাপড়।সুন্দর গুছিয়ে মেনু ঠিক করে দিতেন।ঘরে ভারি মিষ্টি একটা ধূপের গন্ধ পেতাম।পরিষ্কার,ঝকঝকে কিছু পিতলের বাসন উপুর করে রাখা থাকত। আমার খুব পছন্দ ছিল এই অ্যাম্বিয়েন্স। মেস-ম্যানেজার হয়ে আমরা কই-মাছ থেকে শুরু করে পাবদা-মাছ পর্যন্ত খাইয়ে ছিলাম।নতুন বাজার করতে শেখা!!! না,না,মাথায় করে বাজার করতে হত না। শুধু বাজারে গিয়ে দেখে-শুনে বলতে হত।কমলদারা সঙ্গে যেত। আমরা হিসেব রাখতাম আর তাতেই নিজেদের বেশ বড়-বড় মনে করতাম।দিনের শেষে শোভাদিকে হিসেব দিতে হত...একমাস করে  সবার এই দায়িত্ব পড়ত।
সোমা একটু দেরিতে হস্টেলে এসেছিল। ছিপছিপে লম্বা।। ফরসা।ছোটো করে কাটা চুল।আমার সঙ্গে প্রথমেই ভাব হয়ে গেল গানের দৌলতে। তারপর একসঙ্গে অতদিন...কত তর্ক, ভাব-অভাব। বস্তুত সোমা আমাকে বাঙ্গালীয়ানার বাইরে অনেকটা টেনে বার করেছে। বহু হিন্দি-উর্দু বন্দিশ শুনেছি ওর কাছে।।বাংলা-ইংরিজি গানের বাইরের গান হহু করে ভাসিয়ে নিয়ে যেত। আমি ওকে বাংলা গানের জায়গাটা দেখাতাম,সেটাতে ও দুর্বল ছিল। ও গাইত যত ভাল,তার চেয়ে ও ভাল সমঝদার ছিল গানের...এটা খুব দুর্লভ ব্যাপার। হস্টেলের ঘরের পেছনে একচিলতে জমিতে পাতাবাহার গাছে বৃষ্টির ফোঁটা ,সবুজ-হলুদ-সোঁদা গন্ধে মেশানো অনেক সন্ধে কেটে গেছে ।।ভূপিন্দরের গলা গম গম করছে স্টিরিওতে্‌, হ্যাঁ,আমরা বলে-কয়ে স্টিরিও এনেছিলাম হস্টেলে...জানে ইয়ে মুঝকো ক্যা হো রাহা হ্যায়! পাখার বাতাসে মৃদু আলস্য...দমকা রুম-ফ্রেশ্নারের হাওয়া...ঘরের এক কোনে হিটারে কফির জল গরম হচ্ছে।।কে বানাবে? তুই না আমি? কেন,রোজ কেন আমি/আজ তুই।সোমা কিছুতেইকাজ করবে না।বাড়িতে ওকে কেউ কাজ করতে বলে না। খুব রেগে গিয়ে আমি বল্লাম –এটা বাড়ি না,আর আমরা কেউ কাপূরথালার রাজকন্যে না। আজ তুই ই বানাবি।ব্যস ।মুখ গোমড়া।গান শেষ।। কথা নেই।  কাটল কিছুক্ষন...তারপর ডিনার।।সেও নির্বাক গেল...দাঁত মাজা হল...কমপ্লান ঘোটা হল.. বই নিয়ে বসলাম ।তারপর গুটিগুটি তিনি এসে দাঁড়ালেন...।।নীল ডায়মন্ডের রেকর্ডটা শুনবি?ব্যস...।তোলা থাকল কোলরিজের কাব্য...আবার সুর ভর করল ঘাড়ে। গান শুনতে শুনতে ঘুম। ঘুম ভাঙ্গল এক ঝাঁকুনিতে... আরেক রুম-মেটের মা এসেছেন। ঘরে তিন খানা মশারিতে তিনজন তখোনো নিদ্রামগ্ন। তিনি ভুল করে শর্মি ভেবে আমাকে হ্যাঁচকা টান মেরে উঠিয়ে বললেন... টিউটোরিয়ালে কত পেয়েছিস? আমি হতভম্ব...কিন্তু মনে পড়ল ...হ্যাঁ,টিউটোরিয়াল আছে তো! থ্যাঙ্কিউ মাসিমণি!!!

No comments:

Post a Comment