Sunday, 17 April 2016

প্রথম পাঠ

আমি তোমার গান তো গাই নি...
প্রথম যখন হস্টেলে যাবার কথা হল তখন সদ্য আঠেরো ।বিশাল ক্যাম্পাস ।নতুন ক্লাসে নামী অধ্যাপক ।প্রথম বাবা মা কে ছেড়ে থাকার ধুকপুকানি ।হস্টেল পেতে চার পাঁচ মাস লেগে গেল।জেঠূর বাড়ি তে থেকে সদ্য স্বাবলম্বী হচ্ছি ।ছেড়ে যাওয়া শহর টিকে নতুন করে চিনছি।বাইরে অনেকে ভয় দেখাচ্ছে ।।ঐ হস্টেলে থাকবি?ওখানে মেয়েরা সিগারেট খায় ।তরল ও চলে।ভীষণ খারাপ।থাকতে পারবি না।র‍্যাগিং হবে সাংঘাতিক।মেয়েদের খারাপ হওয়ার সংজ্ঞা তো ওরকমই ।
নানা ভয় নিয়ে হসটেলে ঢুকে পাঁচটি বছর যাদের সংগে হেসে খেলে কাটিয়েছি তারা কেউ সিগারেট খেত না।তরল ও নয় ।আমার প্রথম রুম-মেট রত্নামালা রাও পদার্থ বিজ্ঞান এর ছাত্রী ।দারুণ ব্যাডমিনটন খেলোয়াড় । একদম নিরামিষাশী ।রীতা র সংগে পরিচয়ে জানলাম ওর বাবা আর আমার জ্যাঠতুতো দাদা ভারতীয়-বিমানবাহিনীতে একসাথে কাজ করেন।সকালে এক সংগে চা খাই ।পড়তে বসি।বাথরুমে লাইনে র ভয়ে সকালে স্নান।  ।স্নান ঘরে গান আমার হবি।পাশের স্নানঘর থেকে বিশেষ বিশেষ গানের ফরমাশ আসে।বিকেলে টিটি খেলা।সন্ধ্যা হলে আডডা।রুম সরগরম চুল বাঁধা,ক্রিম ঘষার সঙ্গে হিহিহাহা।পড়তে বসতে রাত দশটা ।একটা-দুটোয়,ঘুম।হস্টেল ও আর একটা বাড়ি হয়ে গেল । সে সময় টা বড় অনাবিল ছিল।গানে আর গল্পে ,পেছনে লাগায় জমজমাট ।মেহেদী হাসান।জগজিৎ-চিত্রা সিং এ ,রবীন্দ্রসঙ্গীতে,লতাজিআশাজীতে ভরপুর ।বাইরের লোক না জেনে যে কত বাজে বকে!হ্যাঁ,দুচারজন এদিক ওদিক তো ছিল বটেই,তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাতাম না।সব্বাই মিলে টিভি-রুমে চিত্রহার দেখার মজাই ছিল আলাদা।।মন্তব্য আর ফোড়নে সরস।বাড়ির জন্য মন কেমন? বন্ধুরা সব ভুলিয়ে দিত।হস্টেল নিয়ে প্রায় একটা বই লিখে ফেলা যায়।রত্নামালাকে একদিন না বলে মাংসের চপ খাইয়ে দেওয়া হয়েছিল।জানতে পেরে তার কি বমি!আমরাই ডাক্তারের কাছে ছুটি তখন। আমাদের সেই একতলার সারি সারি ঘরে এখন যারা থাকে তারাও বুঝি ওমনি মজা করে! সোমা গৌহাটির মেয়ে।উড়োজাহাজে আসত। সে আমার পরবর্তীর রুম-মেট।বস্তুত তার দৌলতেই আমার গজল প্রীতি তৈরী হল। কত সন্ধ্যে যে কেটে গেছে মেহেদী হাসান ,তালাত আজিজ,ফরিদা খানুম্‌, গুলাম আলি, পিনাজ মাসানি শুনে শুনে!সোমার পিসতুতো দিদি বিখ্যাত গায়িকা।তিনি তখন মুম্বাইতে ।জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ।‘সোমা,আমরা দেখবো। কি আবদার!! যেন গান নয়,দেখাটাই দরকারি!চলো দেখতে।সেই মৃদুভাষিনী ,সুকন্ঠী,গায়িকাকে দেখে আমরা মুগ্ধ! !একজন তো বলেই ফেললো ‘ইস দিদি!আপনি কি ভালো টানেন!’ গায়িকা চমতকৃত! ‘এ কি টুলে! তোমার বন্ধু কি বলছে? আমি কি গাঁজা সেবন করি?’বলেই মিষ্টি হাসি! সোমার সঙ্গে হস্টেল-জীবনের পাঁচ বছর তরতর করে কেটেছে...এক সঙ্গে বি।সি।এল।,ন্যাশনাল লাইব্রেরি,ইউসিজ...ফিল্ম,নাটক।।তখন বুঝিনি ওর অভিজাত মনের পেছনে কি ভয়ানক অসুখ দানা বাঁধছে!  হস্টেলের পাট সেরে চাকরিতে ঢুকে মাকে নিয়ে গৌহাটিতে গিয়ে খুঁজে পেতে তার বাড়ি আবিষ্কার করি...সোমা তখন স্কিজোফ্রিনিয়ায় আক্রান্ত...মারাত্মক মোটা হয়ে গেছে ওর ছিমছাম শরীর।মন সম্পূর্ণ ভার সাম্যহীণ। আমাকে দেখে কি হাসি!।।হাসি যে  কত বেদনার হয় তাও জানা হয়ে গেল। সোমার সেই দিদি।।আরতি মুখার্জি।।আজও তাঁর কন্ঠ শুনলে আরো অনেকগান মনের মধ্যে তোলপাড় করে।

6 comments: