Thursday, 21 July 2016

যা হারিয়ে যায়
জীবনের দৌলতে জানতে পারছি মানুষ বড়ো অভিমানী হয়ে যাচ্ছে ।একা একা বোধ করছে আর কষ্ট পাচ্ছে ।বোধহয় কিছু হারিয়ে ফেলছে বলে ভয় পেয়ে ঠোঁট ফোলাচছে প্রতি নিয়ত ।কত ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দুঃখ পেয়ে পোষ্ট দিচ্ছে হারানো বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে।আহা।তারা হোয়াট স আপ খুলে দেখেন হারানো বন্ধু কিছু লিখলো কিনা।না পেয়ে মন ভারী করে ফেবু তে বিরহের বা বিদ্বেষের রাগী পোষ্ট জারি করেন।সে সব জ্বালাময় লিখন স্রোতের মত ফেবুতে ভাসে।কেউ  মনে রাখে না।হারিয়ে যাবার খেলা না বুঝতে পারলে জীবনে বিস্তর দুঃখু ।
এই তো যেমন পুরনো আজন্ম  চেনা পাড়াতে ঢুকতে গিয়ে চমকে গেলাম।গড়িয়াহাটের বাম হাতি গলিতে পাও চেন চীনে রেঁসতরা কে বাঁয়ে রেখে সোজা তাকালে দেখতাম একটা  মস্ত  লম্বা বাড়ি।সাদা।তার দুদিক থেকে  উঠে গেছে লম্বা ক্রিপার।ওপরে গিয়ে চূড়া বেঁধেছে।ও বাড়ি দেখে ছোটবেলা তে জেঠুর বাড়ির রাস্তা চিনতাম ।তার ডাইনে গেলে আচার্য সুনীতি কুমারের বাড়ি সুধর্মা যা কিনা   বেশ কয়েকটি বছর ধরে  fab India হয়েছে।লম্বা অভিজাত চেহারার সাদা বাড়িটা যার জানলা দরজা খোলা দেখিনি কখোনো ইদানিং একটি  take away food joint এর সাইন বোর্ড ঝুলিয়েছিল বটে।সেকি তার আভিজাত্য হারাচছিল না অর্থ কৌলীন্য? নিশ্চয়ই দরকার পড়েছে।তাই ভেঙে পড়েছে বাড়ি।কাটা পড়েছে নীচ থেকে উঠে যাওয়া দুধারে দুটি লতানো গাছ।হারিয়ে গেল আমার ছোটবেলার  পথচেনার স্মারক গৃহটি।  অবশ্য এখন পথচেনার জন্য আমার তাকে দরকার হত না।অভ্যস্ত চোখে তাকাতাম।সেই তাকানোর মধ্যে  একটু মেদুরতা থাকতো।হারিয়ে গেল।আবার এই চেহারা চেনা হয়ে  যাবে কিছুদিনে।কিন্তু পুরোনো বাড়িটি বুকের মধ্যে ডানা ঝাপটাবে চিরকাল।
দক্ষিণাপণে ঢুকে দেখি ওমা।উঠে গেছে একদম সামনে গানের আর ছায়াছবি র সিডির চেনা দোকানখানা।কত সিডি কিনেছি সেখান থেকে! ক্লান্ত শরীরে এসে গানের কাছে আশ্রয় খুঁজেছি।পাশ্চাত্য ধ্রুপদী বাজনার ভাল সংগ্রহ ছিল ওঁদের।হারিয়ে গেল।দেখলাম সেখানে বাচ্চা দের পোষাকের দোকান হয়েছে।ওই গানের স্টলের কর্মচারীরা গেলেন কোথা?যেন নতুন কাজকর্মে ভাল থাকেন।
এই হারানো আর খুঁজে পাওয়া র খেলা তে কত পুরোনো বন্ধু দের ফিরে পেলাম! কখনো ভাবিনি এদের আবার ফিরে পাবো!আর যা ফিরে পাওয়া যাবে না কোনমতে? স্টেশনে আমি এখন দেরী করে ঢুকি।ট্রেন ছাড়ার সামান্য আগে।বেশ কয়েকটি বছর আগে এক মা তাঁর মেয়েটিকে নিয়ে স্টেশনে আসতেন ট্রেন ছাড়ার অন্তত দু ঘন্টা আগে।খুব টেনশন হত তাঁর।যদি ট্রেন ছেড়ে যায়? অনেক বুঝিয়ে ও পারা যেত না।আগে গিয়ে বসে থাকো।সে চেন্নাই যাও বা চাঁদিপুর।মায়ের শরীর তেমন ভাল না।তাই তাঁর কথাই ধার্য ।স্টেশনে এসে বসে থাকো।লোক দেখো।পত্রিকা পড়ো।সেইসব অনন্ত বসে থাকার দিন আর নেই।হারিয়ে গেছে মায়ের জন্য চিন্তা, তাকে নিয়ে ধরে ধরে ট্রেনে তোলা,কুলিকে হেঁকে বলা আস্তে চলো ভাই!মাজী ধীরে সে যায়েঙগে।হারিয়ে গেছে মনে করে সবার আগে ইনসুলিন আর ওষুধ গোছানোর  তোড়জোর।শেষবার তিনি কলকাতা গেছিলেন হুইল চেয়ারে ।এবার স্টেশনে অমনি এক হুইল চেয়ার আরোহিণী কে দেখলাম।অমনি ঘাড় এলিয়ে বসে আছেন।পরনে ঢিলে পোষাক।রোগা শরীর।মনে হল এই তো আছেন!
 মোটের ওপর দেখি হারিয়ে যাওয়ার খেলাটা অতি স্বাভাবিক ।তার জন্যে দুঃখ আসাও স্বাভাবিক ।কেন তাকে অকারণে সরিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা?  সবটাই মনের মত হবে আর চিদানন্দ হয়ে চিরানন্দে থাকবো, এমন ভাবলেই যত গন্ডগোল ।থাক না চিনচিনে দুঃখের বর্ষণ ।হারিয়ে যাওয়া র কষ্ট না থাকলে ফিরে পাবার আনন্দ নেই।আর যেসব হারিয়ে যাওয়া ফেরে না,তাদের ধরে রাখতে নেই।তারা আলো হয়ে,বাতাস হয়ে, ধূলিকণা হয়ে আমাদের সঙ্গেই থাকে।শুধু খুঁজে নিতে জানতে হয়।

No comments:

Post a Comment