Thursday, 21 July 2016

হংসধবনি
হাঁসের ডাক কি ভালো? না।সব হাঁসের ডাক শ্রুতিমধুর তো নয় বটে।বনলক্ষীর চীনে হাঁস দের দেখলে তো রীতিমত ভয় করে।তারা লাল লাল চোখে কড়া করে তাকিয়ে বুঝিয়ে দেয়.... তফাত যাও ।হাঁস মাত্র মোটেই মিষ্টি নরমসরম হেলদুলুনি নয়।তারা রাগতে জানে।ঠোকরাতে জানে।চাই কি ভয় দেখাতেও জানে। হাঁস বললেই যে তারা অবন ঠাকুরের বই থেকে উঠে আসা শান্ত সুবচনী হাঁস হবে বা ভদ্র সভ্য খোঁড়া হাঁস হবে,মিষ্টি মিষ্টি ডাকাডাকি করবেএমন ভাবার কোনও দরকার নেই।চকা নিকোবর রাও রয়েছেন। সাতসকালে হাঁস নিয়ে পড়লাম কেন রে বাবা?আমি যেখানে থাকি তার ত্রিসীমানা য় তো হাঁস নেই!সে না থাকুক।হংসধবনি তো আছে। রাগ হংসধবনি ।তার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ মেঘে ঢাকা তারা ছবিতে।মনোমুগ্ধ।ছবি দেখে আর এ।টি।কাননের গানে ভিজে একেবারে বিমোহিত ।সখী লাগি লগন।কেমন নেশা ধরে গেল।তখন সদ্য ফার্স্ট ইয়ার ।  হাঁসের ডাক হোক না কর্কশ ।হংসধবনি যেন জলভরা মেঘের মত অবনতনেত্র মাধুর্য ।সে এমন নেশা হল যে যেখানে পাই হংসধবনি খুঁজে বেড়াই।আহা।ভীমসেন যোশী,বা কিশোরী আমোনকর।আমির খান।তখন তো ইউ টিউব ছিল না।তাই আঁতিপাতি করে খুঁজি।আমি কোথায় পাবো তারে।এই তো রশিদ খান গেয়েছেন।হৃদয় উল্লসিত ।পরে  কৌশিকী গাইলেন।এবং আরো অনেকে।
আজকে মেঘলা দিনে হংসধবনি আমাকে পেয়ে বসেছে।মাঝে মাঝেই পায়।বাড়িতে মিস্ত্রি রা কাজ করছেন।চলাফেরা সীমায়িত।জিনিস পত্র জায়গা বদল করেছেন।এরকম অদলবদল বাড়ির সব সদস্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে খাবি খাচ্ছেন ।প্রথম দিন আমিও কিছু ধন্দে পড়ি।পরের দিন থেকে একটা ছন্দ আনার চেষ্টা থাকে।রান্না ঘরের যাবতীয় এখন বসার ঘর,পড়ার ঘর,শোবার ঘরে ঠাঁই নিয়েছেন।তাদের একটু গুছিয়ে নিয়েছি যাতে হাত বাড়ালে সাঁড়াশি টা বা খুন্তি টা পাওয়া যায়।নইলে বড় ঝামেলা ।ছোট যখন ছিলাম বাড়ি রং করার সময় খুব মজা লাগত।খাটের ওপর টেবিল ।তার ওপর ফুলের টব।টেবিলের নিচে মোড়া।মাথার কাছে সার দেওয়া সুটকেস।তারওপর বই রেখে চলছে আমার পড়া।যেন একটা অন্য দুনিয়া ।খাট থেকে নামা বারন।কারণ হাতে পায়ে দরজার রং লেগেছে এরমধ্যেই।সে এক বিতিকিচছিরি অবস্থা ।তারপিন তেল দিয়ে ঘষে ঘষে রং তুলেএ মা খাটে উঠিয়ে দিয়েছেন ।মিস্ত্রি শিরীষ কাগজ দিয়ে দেওয়াল ঘষছে।বাবা গান চালিয়ে দিয়েছেন বেশ মৃদুস্বরে ।সব অগোছালো র মধ্যে সুর লাগছে।সাবান পাওয়া গেল না,বড়ির শিশি গেল কোথায়?বেলন চাকি খাটের নীচে রাখা হল।গেল কোথায়?ইসস।নীল ফুলদানী টা ভেঙ্গে গেল!!!জলের জাগটাই বা হাতের কাছে নেই কেন....এইসব হাজার তুচ্ছ বেরিয়ে সুর লাগছে।কখনো মারু বেহাগ।কখনো মালকোষ বা পূর্বী।এমন নয় যে ভীষণ বুঝে উল্টে দিচ্ছি।কিন্তু সুর জাল বুনছে চারদিকে ।সব বেনিয়ম কেমন মায়াবী আলোতে ভরে যাচছে।বেরিয়ে পড়ছে পুরোন বই।ছেঁড়া ছবি।পোস্ট কার্ড ।দিদুর চিঠি।ইতি আশীর্বাদিকা তোমার মা ... পোস্টকার্ড খুঁজে পেয়ে আনমনা   হয়ে যাচ্ছে মা ...গান চলেছে সুরের পথ ধরে ...মোরি নইহার ছুট যায়ে।নতুন রঙের গন্ধে সুর মিশে যাচছে ।
এখন আমার পায়ের ওপর পা তুলে খাটে বসে থাকার দিন নেই।মিস্ত্রি কাজ করলে কান খাড়া করে থাকি কখন কি হুকুম হবে।তাঁরা খুব সদাশয় ।নিজেদের মত করে কাজ করেন।আমি শুধু সুরটুকু ধরে রাখার চেষ্টা করি।হংসধবনি আজ তাতে সঙ্গ দিয়েছেন।মেঘলা আকাশ দেখছি সেলফোনে।তাতে হংসপাখা।পাখা কি খসে পড়ল?এই যে খবরের কাগজ।
এত রক্তপাতের  খবরে সুর তাল সবি কেটে যায়।সন্ত্রাস গিলে নিচ্ছে সব সুর।বিদেশ থেকে ছুটি কাটাতে আসা মেয়েটি হত হয়ে পড়ে থাকলেন।যেমন হত হলেন আরো অনেকে।রক্তাক্ত হচ্ছেন প্রতি দিন এত মানুষ ।কি ভয়ংকর!সন্ত্রাস আর নতুন খবর নয়!!!! নিরাপত্তাহীনতা কে সঙ্গী করে বেঁচে আছি, নরম হাঁসেরা, জীবনানন্দের হাঁসেরা  তাদের সব সুর নিয়ে কোথায় লুকালো! এ বুঝি সেই ঘন নিকষ মেঘ যার তল নেই।ঝরে যাওয়া নেই।আছে শুধু আগ্রাসন! বাঁশি হারিয়ে যাচ্ছে ।আমি কোন সুরে খুঁজি তোমারে? ????

No comments:

Post a Comment