Thursday, 21 July 2016
ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে
কিছু হারিয়ে গেল গেল করাআমার স্বভাব বিরুদ্ধ কোনোরকম হাহাকার তেমন পোষায় না।বাবা বলতেন গেছে গেছে।বাঙাল ভাষায় গেসে গেসে।থোও।রাশি রাশি কলম হারানোর প্রেক্ষিতে এই উক্তি ।আসলে হারানোর গপপোটা কিছু বাকি থেকে গেছে।সেটি সেরে নিতে চাই ।
মেঘে ঢাকা তারা বা কোমল গান্ধার দেখার অনেক অনেক আগে,প্রায় জ্ঞান হতে হতেই ঠাকুমা,ছোট ঠাকুমা আর তাঁদের সমসাময়িকদের মধ্যে দেখেছি দেশ হারানোর বেদনা। সে যে কি হাহাকার তা অগুন্তি বাঙালি জানেন। অন্য দেশে এসে রিফিউজি হবার যন্ত্রণা ঢক করে গিলে ফেলা যায় না।সারাজীবন সেই শোকেতাপেই কাটিয়ে দিলেন, অন্য রকম করে কিছু ভাববার অবকাশ ই দিলেন না।এ নিয়ে অবশ্য ঘটিমহলে একটা চালু রসিকতা আছে .....বাঙালদের তো সবারই দেশে জমিদারি আসিল!!
না।সকলের জমিদারি ছিল না বটে। কিন্তু ভাল করে খেয়ে পড়ে থাকার মত জমিজমা, বাগান পুকুর গাছটা ফল পাকুড়টা ছিল। বর্ষা কালে পদ্মা র ইজারা নেওয়া হত গল্প শুনেছি।যত ইলিশ ধরা পড়ত সব বাড়িতে আসত।বাড়িতে মুরগি উঠত না।বাবার জন্য আলাদা করে উঠোনে উনুন করে মুরগি রান্না হত।বড় ছেলের স্পেশাল খাতির।সেসব হারানো দিনের কথা বাবা আমাকে একটি হাতে লেখা বই আকারে দিয়ে গেছেন।চশমা হারাই,চাবি হারাই।চশমার খাপ আরো বেশী হারাই,পেন ড্রাইভ হারাতে হারাতে জেরবার,পছন্দের শান্তিনিকেতনী রুমালটিও সেমিনারে র দিন কেমন করে হারিয়ে ফেললাম।তবে বাবার লেখা বইটি কিন্ত হারাই নি।তাতে দেশ হারানো ঘর হারানো একটি কিশোরের সুখ দুঃখ আজও ধরা আছে।সে গ্রামের স্কুলে পড়ত, নদীতে সাঁতার কাটত, দস্যিপনা করে বেড়াতো আপনমনে।তার দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন এক লেঠেল।তাঁর নাম মইজুদদিন ভাই।তিনি তাকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন।তিনি সামাল দিতেন ঐ কিশোরের সব দৌরাত্ম্য ।মাঝরাতে নৌকো থেকে ধরে আনা হোক বা গাছের ডাল থেকে নামিয়ে আনা।এমনকি লুকিয়ে কচ্ছপের মাংস খাওয়ার সঙ্গী ও তিনি। দেশভাগের সময় যখন এপারে আসার ভয়ংকর দিন এল,সেই মইজুদদিন ভাই ওই কিশোরকে হাফ প্যান্ট ছাড়িয়ে লুঙ্গি পরিয়ে কুখ্যাত সকরিগলি ঘাট পার করে দিয়েছিলেন।সেই অসময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব সুখদুঃখের সত্যি ঘটনা জড়িয়ে আছে।তাই আমার সাদাত মানতো বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হয়নি।হারিয়ে যাওয়া ঢাকা লাহোর মুম্বই কলকাতা চোখের সামনে ছবির মতো।কর্কশ রক্তাক্ত নিষ্ঠুর দিন। তার মাঝেই লালিত সুকুমার মন।সেসব হারিয়ে গিয়েও ফিরে এল বুঝি!দেশভাগের অভিঘাত বড় সুদূরপ্রসারী।কোথায় কোন কোণে ওত পেতে বসে আছে গোপন প্রতিহিংসা কে জানে।তাদের উদ্দাম হিংসা এখন মহামারী র রূপ নিয়েছে ।
অস্থিরতার কথা থাক।স্থিরতা র কথা বলি।কৈশোরে হারিয়ে ছিলাম কলকাতাকে।বাবা বদলী হয়ে গেলেন কুচবিহার।অস্থির শহরকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল শান্ত এক দীঘিময় মফস্বলে ।তখন মফস্বলের একটা নিজস্বতা ছিল।এখনকার মতো হাফ টিকিট না।সে ছিল রাজার শহর।ছোট ছোট একতলা বাড়ি ।সামনে বাগান।গাছপালা জড়ানো।কলকাতা, স্কুল, বন্ধু, পাড়া ,গানের স্কুল সব হারিয়ে আমি তখন বেজায় মনভারি ।হায়রে ।এখন অমন জায়গাতে থাকতে পারলে কি ভালো ই না হোতো।রাজার শহরে তখন হাতে গোণা দোতলা বাড়ি ।বেশী র ভাগ বাড়িতে টিনের চালের নীচে ছাউনি দেওয়া । সামনে পেছনে বাগান দেখে বাবা তো আত্মহারা ।পেছনের বাগানে নিজে মাটি ফেলে কপি ,কুমড়ো,টমেটো চাষ শুরু হল।টিনের চালের ওপর বৃষ্টি র শব্দ এখনো কানে আছে।হারায় নি।বারান্দা টি প্রশস্ত ।তাতে বাবা নিজে হাতে বাঁশের জাফরি বানিয়েছিলেন।চমৎকার লাগতো দেখতে।জাগরিত লতানো গাছ।খুব মায়াবী লাগতো টেবিল আলোতে।কিন্তু বারান্দা তে ব্যাং আসে।তাকে ধরতে আসে সাপ।মা আর আমি ভয়ে অস্থির ।ওখানকার লোক হাসে।দূর!ও তো হেলে সাপ।কাটে না।বাচ্চা রা হেলে সাপের লেজ ধরে ছুঁড়ে ফেলে।চেনা পৃথিবী এইভাবে পালটায়।নতুন স্কুল ।নতুন বন্ধু ।একেবারে আলাদা পরিবেশ।মানিয়ে নিতে সময় লাগে।বেশি গজগজ করলে মা বকুনি দেন।এখানেই ভাল রেজাল্ট করে দেখাও না!ফেলে আসা আজনমের শহর ,ফেলে আসা বেড়াল হাতছানি দেয়।তাকে অনেক চেষ্টা করেও আনা যায়নি।গাড়ি থেকে লাফ দিয়েছিল।পরে কত কেঁদে ফিরেছে ভেবে গলার কাছে ব্যথা করত। কিন্তু বাড়ির পিছনে মস্ত দীঘি ।তারপাশে একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ি।সেখানে এক মা থাকেন তার দুই মেয়ে নিয়ে ।ছোটজন রাতুল আমার বন্ধু । ওদের ছোট কাঠের বাড়ি দেখে আমি মুগ্ধ ।বারান্দা য় সারি সারি অর্কিড ঝুলছে।বসার ঘরে বেতের সোফা ঘেঁষে ও অর্কিড ।বারান্দা তে দাঁড়িয়ে একটু পা বাড়ালে দিঘীর জল হাত বুলিয়ে যায়।ঠিক যেন রূপকথা।তারা হারিয়ে যায়।নতুন বন্ধুরা তদদিনে প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে।তাদের সঙ্গে প্রাণের আড্ডা মাঝে অনেকদিন হারিয়ে গেছিল।ফেবু র কল্যাণে ফেরত এসেছে।ফেরত এসেছে আমার হারিয়ে যাওয়া কলকাতা আর পুরনো বন্ধু দের অপার ভালবাসা।হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ এই ফেবু তেই সম্ভব ।এত ফিরে পেয়ে ভাবি এই ঐশ্বর্য রাখব কোথায়?যা গেছে তা স্রোতে মিশে গেছে।যা আছে তা কম কি?ইটানগর বেড়াতে গিয়ে হারিয়েছিলাম খুব সুন্দর একটি flask. এত সুন্দর ছবি সচরাচর থাকে না।আঠারো ঘন্টা ভ্রমণ করে গাড়ি তে ফেলে এলাম ।মন খারাপ?না না! থাকলো না হয় আমার একটি ছোট জিনিস আমার দেশের এক কোণে কোন অচেনা বাড়িতে ।ঐ ভাবে ভাবলেই কিছু হারায় না।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment